॥ এম এ খালেক ॥
সম্প্রতি ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন-২০২৬ এর অধীনে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা), বাংলাদেশ ইকোনমিক অথরিটি (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ অথরিটিকে (পিপিপিএ) একীভুত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি সংস্থ্ াগঠন করা হয়েছে। সম্ভাব্য স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের সহজে বিনিয়োগ সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এ নতুন সংস্থা গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ সংস্থাটি পরিচালিত হবে। নতুন এ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ সহায়তা প্রদান, নীতি সমন্বয় এবং সরকারি-বেসরকারি সক্ষমতাকে এক প্রতিষ্ঠানের অধীনে নিয়ে আসবে। এটা কার্যত ওয়ান স্টপ সার্ভিস হিসেবে কাজ করবে। বিনিয়োগকারীগণ অনেক দিন ধরেই এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিলেন। এ প্রতিষ্ঠানের কাজ হবে সকল বিনিয়োগ সেবাকে একই ছাদের নিচে নিয়ে আসবে। এর আগে সরকার ১৯৮৯ সালে বিনিয়োগ বোর্ড গঠন করেছিল। এটি ছিল বাংলাদেশে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রথম সমন্বিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগকারীদের লাইসেন্সপ্রাপ্তিতে বিলম্ব, প্রাইভেটাইজেশন কমিশন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাবে বিনিয়োগ বোর্ড কাক্সিক্ষত সুফল দিতে পারেনি। এর প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে বিনিয়োগ বোর্ড এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে একীভূত করে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি(বিডা) গঠন করা হয়। কিন্তু বিডার নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বিডা বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করলেও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ আলাদা কর্তৃপক্ষের আওতায় পরিচালিত হতো। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছিল।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের দেশে নীতির ধারাবাহিকতা নেই। এক সরকার বদল হলেই আগের সরকার আমলে গঠিত সংস্থাগুলোকে পরিবর্তন বা বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। যেমন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) গঠন করেন। ইপিজেড বাংলাদেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা) গঠন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। প্রথম পর্যায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই ৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে দু’বছরের মধ্যে ১৩৩টি নতুন শিল্প-কারখানা নির্মাণের জন্য ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আহরণ ও ২ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনের কার্যক্রম খুব একটা সন্তোষজনক নয়। অত্যন্ত ধীর গতিতে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলছে। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্দেশ্য প্রায় এক এবং অভিন্ন। তাহলে একই নেচারের দু’টি কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোন প্রয়োজন ছিল কি? আর একবার যদি কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় তাহলে পরবর্তীতে অন্য রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও তা বাতিল বা বন্ধ করে দেয়া উচিৎ নয়। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়।
দেশে বিনিয়োগ করার জন্য একজন উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই নানাভাবে উদ্যোক্তাদের হয়রানি করা হয়। একজন উদ্যোক্তার অবস্থা দেখলে মনে হয়, বিনিয়োগ করতে গিয়ে তিনি যেন মস্তবড় অপরাধ করে ফেলেছেন। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন অথচ কোন কর্তৃপক্ষকেই উৎকোচ প্রদান করেননি বা কোন অনৈতিক সুবিধা দেননি এমন ঘটনা বিরল। আমি ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালে দেখেছি, ঋণ গ্রহণের জন্য আসা উদ্যোক্তাগণ কতটা অসহায়। সাধারণ নিম্ন পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাও তাদের নানাভাবে হয়রানি করে ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায় করে নেন। ব্যাংকিং ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে পারছে না। অর্থনীতির লাইফ লাইন ব্যাংকিং সেক্টর এখন যেন ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাগণ তাদের প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য প্রধানত ব্যাংকিং সেক্টরের উপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু ব্যাংক তাদের প্রত্যাশা মতো ঋণ সহায়তা দিতে পারছে না। কিছু কিছু ব্যাংকারের মধ্যে এমন মনোভাব লক্ষ্য করা যায় তারা যেন উদ্যোক্তাদের দয়া করে ঋণ দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ঋণ প্রাপ্তি কোন করুণা নয়। ঋণপ্রাপ্তি একজন উদ্যোক্তার আইনি অধিকার। কারণ তিনি ঋণ নিয়ে নির্ধারিত সময়ে সুদসমেত তা ফেরৎ দিয়ে থাকেন। উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণের জন্য উদ্যোক্তাগণ সাধারণত ব্যাংকমুখো হন না। তারা পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়ে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে নেন। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে না। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর সুদসমেত ঋণের পুরো কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। প্রকল্প বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করুক আর না করুক তাদের ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই হবে। প্রায়শই দেখা যায়, একটি প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হবার আগেই ঋণের কিস্তি পূর্ণ কিস্তি প্রদান শুরু হয়ে যায়। এতে ঋণ গ্রহীতা সমস্যায় পড়েন। কিন্তু পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করলে প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে লাভজনকতা অর্জন না করা পর্যন্ত শেয়ার হোল্ডারদের কোন ডিভিডেন্ড দিতে হয় না।
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠিত হয়েছে ভালো কথা কিন্তু তারা হয়তো প্রকল্প অনুমোদনকালীন জটিলতা কিছুটা সমাধান করতে পারবে। কিন্তু অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ সংস্থার ভূমিকা কী হবে? প্রকল্প অনুমোদন ও স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে একজন উদ্যোক্তা যখন অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যাবেন তখন কি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা পাবেন? ব্যাংক তার নিজস্ব আইনে পরিচালিত হয়। তারা কিন্তু অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সুপারিশে কাজ করে না। বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ পেতে হলে আর্থিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। প্রচ-রকম রাজনৈতিক প্রভাব নেই অথবা অবৈধ অর্থ ব্যয় করবেন না এমন আবেদনকারির জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া খুবই কঠিন। অথচ অবৈধ অর্থ ব্যয় করা গেলে সম্ভাবনাবিহীন প্রকল্পের অনুকূলে বৃহৎ অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করানো কোন ব্যাপার না। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ প্রচ-রকম রাজনৈতিক চাপে না পড়লে বিনা লাভে ঋণ মঞ্জুর করতে চান না। আর উপরের কর্মকর্তাদের যদি ‘খুশি করা’ যায় তাহলে সম্ভাবনাবিহীন প্রকল্পের অনুকূলে ঋণ মঞ্জুর করানো কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু যদি কোন কারণে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ঋণ আবেদনকারীর প্রতি অখুশি হন তাহলে তার প্রকল্প যত সম্ভাবনাময় হোক না কেন ঋণ পাবেন না।
অনুপযোগী প্রকল্পের অনুকূলে ঋণ মঞ্জুরের একটি কৌশল হচ্ছে বন্ধকীযোগ্য সম্পদের ‘ওভার ভ্যালুয়েশন’ করা। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ১ঃ ১২৫ শতাংশ অথবা ১ঃ ১৫০ শতাংশ মূল্যের সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধক দিতে হয়। অর্থাৎ কেউ যদি ১০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করতে চান তাকে অন্তত ১২৫ টাকা অথবা ক্ষেত্র বিশেষে ১৫০ টাকা মূল্যের সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে রেজিস্ট্রি মূলে বন্ধক দিতে হয়। নিশ্চয় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকা ঋণের জন্য ১২৫ টাকা অথবা ১৫০ টাকা মূল্যের সম্পত্তি হারাতে চাইবে না। এখানে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যদি ‘খুশি’ করা যায় তাহলে ৫০ টাকা মূল্যের সম্পত্তি ওভার ভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে ৩০০ টাকা দেখানো সম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাগণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বন্ধকীযোগ্য সম্পত্তির ওভার ভ্যালুয়েশন করে নেন। আবার কোন ঋণ আবেদনকারির উপর ব্যাংক কর্মকর্তা অখুশি হন তাহলে তার ১০০ টাকার সম্পত্তি ৫০ টাকা ভ্যালুয়েশন দেখানো কোন ব্যাপার না। বন্ধকীযোগ্য সম্পদ ওভার ভ্যালুয়েশন করার কারণে কোন ব্যাংক কর্মকর্তা শাস্তি পেয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত ব্যাংকিং সেক্টরে নেই বললেই চলে। বেশি মূল্যের সম্পদ বন্ধক দিতে চাইলে ব্যাংক অনেক সময় ব্যাংকে তালিকাভুক্ত বাইরের অডিট ফার্ম দিয়ে সম্পদের ভ্যালুয়েশন করিয়ে থাকে। বাইরের অডিট ফার্মের পক্ষেও ব্যাংক ম্যানেজারের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ বাইরের অডিট ফার্ম যদি ব্যাংক ম্যানেজারের চাওয়াকে উপেক্ষা করে সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন করে তাহলে পরবর্তীতে সেই অডিট ফার্মকে আর কোন কাজ দেয়া হবে না। কাজ দিলেও তার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করা হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা কড়াকড়ি করা হয়েছিল। ফলে রাজনৈতিক প্রভাবে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করতেন তারা ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অনেকে জেলে আছেন। কেউ বা পালিয়ে রয়েছেন। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমে গেছে। নতুন সরকার আমলেও সে প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সিডিউল ব্যাংকগুলো নানা সীমাবদ্ধতা সত্বেও উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু উপযুক্ত ঋণ গ্রহীতা পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ প্রতিবেদন মোতাবেক, ব্যক্তি খাতে ব্যাংকিং প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এটা বিগত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। একদিকে উদ্যোক্তাগণ অর্থের অভাবে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছে না। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ঋণদানের জন্য বসে আছে কিন্তু পার্টি পাচ্ছে না। ব্যাংককে বলা হয়, অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন।’ আর বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর এখন নিজেই লাইফ সাপোর্টে আছে। বিগত সরকার আমলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন তাদের বেশির ভাগই সে ঋণের অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করেছেন অথবা বিদেশে পাচার করেছেন। এ ঋণের অর্থ আর কোন দিন ব্যাংকে ফেরৎ আসার সম্ভাবনা নেই। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের হার দেখানো হয় ৩৫ শতাংশ। এটা মোটেও ঠিক নয়। এটা দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের হার। যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ অবলোপন এবং পুনঃতফসিলিকরণ করা হয়েছে তা যুক্ত করা হলে এবং মামলাধীন প্রকল্পের নিকট দাবিকৃত ঋণাংক একত্রিত করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ শতাংশের বেশি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব আইন প্রণয়ন করে তার বেশির ভাগই ঋণ খেলাপিদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। একজন ঋণগ্রহীতা যদি ১০ কোটি টাকা নিয়ে পাঁচবছর ঋণের অর্থ আটকে রাখেন তাহলে এক সময় ব্যাংক হয়তো তাকে ২ কোটি টাকা সুদ মওকুফ সুবিধা দেবে। কিন্তু একজন ঋণ গ্রহীতা যদি নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাঁচ বছরে ১০ কোটি টাকা ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেন তাহলে তাকে কোন মওকুফ সুবিধা দেয়া হবে না।
‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ’ গঠন করা হয়েছে এটা ভালো উদ্যোগ কিন্তু প্রশ্ন হলো উদ্যোক্তাগণ যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে সেই ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কিভাবে সৎপথে আনা যাবে তার ব্যবস্থা কে করবে? সরকারের এই উদ্যোগ ভালো মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
বাংলাদেশ আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর গড়ে ১০ বিলিয়ন কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আহরণ করতে হবে। বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিবেশে এই মাত্রায় বিনিয়োগ আহরণ করা সত্যি দুরূহ ব্যাপার। অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে প্রক্ষেপন করেছে তা স্বস্তিদায়ক। সংস্থাটি বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি আকারের বিবেচনায় বাংলাদেশ মালয়েশিয়াকে অতিক্রম করে যেতে পারে। বর্ণিত সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকর হতে পারে ৬৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর একই সময়ে মালয়েশিয়ার জিডিপি’র আকার হবে ৬৭২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভিয়েতনামের অর্থনীতির আকার হতে পারে ৬৭৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। থাইল্যান্ড এবং ডেনমার্কের অর্থনীতির আকার হতে পারে যথাক্রমে ৬৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ৫৮৯ দশমিক ২ মার্কিন ডলার।
২০৩০ সালে বিশ^ অর্থনীতির আকার হবে ১৫০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বরাবরের মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবার শীর্ষে অবস্থান করবে। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি’র সার্বিক আকার হবে ৩৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীন ২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে। বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে না পারলেও অর্থনীতির বড় ধরনের বিকাশ ঘটবে। কথায় বলে, বানর এক দিনে ঢাকা থেকে দৌঁড়ে দিল্লি যেতে পারে। যদি মাঝপথে কোন স্বগোত্রীয় তাকে বাধা না দেয়। তেমনি বাংলাদেশও ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে পারবে যদি প্রতি বছর প্রাইভেট সেক্টরে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আহরণ করতে পারে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।