॥ কবির আহমদ ॥

বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স.) কে পাঠানো হয়েছিল আল্লাহ পাকের মনোনীত জীবন বিধানকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিজয়ী মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “হুয়াল্লাজি আরসালা রাসুলাহু বিলহুদা অ দিনিল হাক্কি লি ইউজ্জহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি ওয়ালাও কারিহাল মুশরেকুন”। তিনি সেই সত্তা যিনি তার রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন যাতে করে সকল প্রকার জীবন ব্যবস্তার উপর ইসলামকে বিজয় করা যায়। রিসালাতের দায়িত্ব পালনের অপরিহার্য করণীয় হিসেবেই তিনি স্বীয় জন্মভূমি মক্কাতেই এই মহান কাজে ব্রতী হন। এখান থেকেই শুরু হয় এ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এক প্রাণান্তকর আন্দোলন ও সংগ্রামের সূচনা। এ আন্দোলনের মৌলিক দাবি অন্যের নিকট এর দাওয়াত পৌঁছানো। আর এ কাজের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীল এবং শুরু করে নিপীড়ন, নির্যাতন, অপপ্রচার ও মিথ্যাভাষণ। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে তদানীন্তন ক্ষমতাসীনদের রীতিনীতি ও কার্যক্রমের পরিশুদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে রাসূল (স.) যে সামাজিক পরিবর্তনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন, স্বাভাবিকভাবেই তিনি এ কাজে প্রচ- বিরোধিতার সম্মুখীন হন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি চরম সংযম ও ধৈর্যের সাথে অগ্রসর হতে থাকেন স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে। পরবর্তীতে কৌশল অবলম্বন ও বিভিন্ন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ক্রমশঃ তিনি প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ শক্তি ও জনবল গড়ে তুলেন। সমরক্ষেত্রে বিরোধীদের প্রতিহত করার দক্ষতা অর্জন করার সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন অভিযানে তাদের মোকাবেলা করেন। এরই ফলশ্রুতিতে প্রতি পক্ষের শক্তির তামাম দাপট চূর্ণ হয়ে যায়। বিজয় ছিনিয়ে এনে ঈপ্সিত পরিবেশে আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা হয়। সবর ও বাহাদুরীর সাথে তিনি এ সার্বিক জিহাদ পরিচালনা করেন।

একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাসূলুল্লাহর (স.) পক্ষে সম্ভব হয়েছিল জাহেলিয়াতের নিকষ আঁধারে নিমজ্জিত এক জাতিকে ইসলামের আলোকোজ্জ্বল রাজ তোরণে টেনে আনা। অবিচার, জুলুম, নিপীড়ন ও অধিকার বঞ্চনার শিকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে তিনি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। মানুষের উপর অন্যের প্রভুত্বের অবসান ঘটিয়ে সকল মানুষকে একমাত্র আল্লাহর গোলামীর বেষ্টনীর মাঝে তিনি নিয়ে আসেন। লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও দুঃশাসনে জর্জরিত মানবতার মাঝে তিনি ‘ক্বিসত’, ‘আদল’, ‘ইহসান’, ন্যায় ও কল্যাণকর রাজনীতি প্রতিস্থাপন করেন। জঙ্গী, হিংস্র, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও যাবতীয় অমানবিক দোষে দুষ্ট মানুষদের মাঝে তিনি এমন সোনার মানুষদের একটি সুসংগঠিত দল তৈরি করতে সক্ষম হন যাদের প্রভাবে তখন সানয়া থেকে হাজরা মওত পর্যন্ত সেই দুস্তর মরুপথেও একজন সুন্দরী রমনী নির্বিঘেœ ও শঙ্কাহীন চিত্তে একা সফর করতে সক্ষম ছিল। মক্কার বুকে মুহাম্মাদের (স.) ধর্মীয় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে যে কজন লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসেছিলেন সফল রাষ্ট্রনায়ক রাসূলের (স.) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণের প্রভাবে এর তুলনায় বহুগুণে বেশি আপামর জনগণ তখন দলে দলে আল্লাহর মনোনীত এই কল্যাণময় জীবন বিধান নিজেদের বাস্তব জীবনক্ষেত্রে মেনে নিয়েছিল।

আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক দিক নির্দেশনা : ক) শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের মধ্যে তৃপ্তি বোধ করে যারা নিজেদের ধার্মিকতা ও পরহেজগারীর অহমিকার কারণে রাজনীতি করাকে এবং সামাজিক সংশোধনের কাজে সংশ্লিষ্ট হওয়াকে নিন্দনীয় কিংবা অপছন্দনীয় মনে করে এসব কাজ এড়িয়ে চলে তারা তাকওয়ার দাবি সম্পর্কে বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। দুনিয়া বিমুখ এমন লোকদের লক্ষ্য করেই আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন “ইন্নি উসাল্লি অ আকজা অ আসুমু অ আফতারু, অ আতাজাওয়াজুন নিসায়া, ফামান রাগিবা আন সুন্নাতি ফালাইসা মিন্নি”। কারো পক্ষে রাসূলের (স.) চাইতে অধিকতর তাকওয়াবান হওয়ার ভনিতা প্রদর্শন ইসলাম গ্রহণ করে না। রাসূল (স.) নিজে অনেক সময় নামাজরত থেকেছেন আবার হাট-বাজার, গৃহস্থালী ও সামাজিক কাজে কাটিয়েছেন। অনেক দিন রোযা রেখেছেন আবার রোযা ছাড়াও স্বাভাবিকভাবে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বৈরাগ্য জীবন গ্রহণ না করে স্ত্রীদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রক্ষা করেও একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছেন। জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে রাসূলের (স.) সুন্নাত। আর এ সুন্নাত যারা পরিত্যাগ করে তারা রাসূলের (স.) দলভুক্ত তথা ইসলামী সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে ও মানুষের মাঝে সুনীতি এবং সুশাসনের প্রতিষ্ঠায় উন্মানসিকতা প্রদর্শন কিংবা বৈরাগ্য সাধন এবং সামাজিক কাজে নিয়োজিত সৎ ও ধর্মীয় কর্মীদের বিরোধিতা করা কস্মিনকালেও তাকওয়ার সাথে সহায়ক কিংবা সম্পর্ক যুক্ত নয় বরং তা তাকওয়ার পথে বড় অন্তরায়।

খ) যারা মনে করে যে, প্রথমে সব মানুষ দীনদার হয়ে যাবে তখন আপনা থেকেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে তারা সঠিক ইসলামী চেতনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। রাষ্ট্রনায়ক রসূলুল্লাহ (স.) বরং দীনদারদের দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে সহায়ক এক পরিবেশ সৃষ্টির জন্যেই তাঁর নবুওতী জিন্দেগীর প্রথম থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

গ) সেক্যুলার রাজনীতি মানুষকে নৈতিকতামুক্ত ও খোদাবিমুখ করে তুলে। ব্যক্তি স্বার্থ কিংবা গোষ্ঠী স্বার্থের কারণে তখন মানবতার স্বার্থকে জলাঞ্জলী দেয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) নামাজের তাকিদ দিয়েছেন রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে অশ্লীলতা এবং সকল ধরনের খারাপী থেকে মুক্ত থাকার জন্যে। মুসলমান নামধারী যে সব বুজুর্গ ব্যক্তি নামাজ পড়ে অথচ সেক্যুলার রাজনীতির কোরাস গেয়ে থাকে তাদের উপলব্ধি করা উচিত এটা রাসূলের (স.) আদর্শের সাথে চরম বৈপরীত্য প্রদর্শন।

ঘ) শত্রুর মোকাবেলায় উপযুক্ত শক্তি সঞ্চয় ও যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ হচ্ছে ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক দাবি। যুগোপযোগী রণকৌশলে পারদর্শিতা অর্জন, প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং উপকরণ সংগ্রহ তাকওয়ার সাথে কখনও সাংঘর্ষিক নয়। আধুনিক যুগের নির্দোষ উপায়, উপকরণ ব্যবহারের বিরোধিতা করা সঠিক কাজ নয়। বরং জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কারিগরী দক্ষতা সম্পন্ন হয়ে শত্রুদের মোকাবেলায় অগ্রগামী শক্তি হিসেবে জাতিকে গড়ে তোলা একান্ত ঈমানী দায়িত্ব।

ঙ) ইসলাম বাস্তবে কোন বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আদর্শ মাত্র নয়। বরং এটি একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিকও বটে। ইসলাম একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত মতবাদ। এখানে ধর্ম হচ্ছে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ঈমান ও রাজনীতির উৎস হচ্ছে আল-কুরআন ও সুন্নাহ। ধর্ম ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক নিবিড় সংযোগ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

চ) ইসলামে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের কোন স্থান নেই। ইসলামী রাষ্ট্র একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র যার রাজনীতি ও সংবিধানের মূলনীতি কুরআন ও সুন্নাহ। এসব মূলনীতির পরিবর্তন পরিবর্ধন করার এখতিয়ার কোন মানুষের হাতে নেই।

ছ) ইসলামী আইন ও অনুশাসন কার্যকর করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া দ্বীনের প্রতিষ্ঠা কস্মিনকালেও সম্ভব হতে পারে না।

জ) রাজনীতিতে চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা, উপায় ও পন্থার পবিত্রতা সাধন এবং উদ্দেশ্যের পবিত্রতা থাকলে তা স্বার্থপর ও দুনিয়াদারদের নোংরা রাজনীতি থেকে পৃথক ও মর্যাদা সম্পন্ন রাজনীতিতে পরিণত হতে পারে। এই রাজনীতিই আলকোরআনের রাজনীতি এবং এটাই ছিল রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদের (স.) রাজনীতি। তাই এই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ মুসলমানদের জন্য প্রধানতম ফরজ। এ ইবাদাত থেকে এড়িয়ে চলা দ্বীনদারীর লক্ষণ হতে পারেনা।

রাষ্ট্র শাসনের বৈশিষ্ট্য : ইতোপূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চারিত্রিক পবিত্রতা রাষ্ট্রপরিচালনার উপায় ও পন্থার পবিত্রতা সাধন এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যের পবিত্রতা রক্ষা করলে সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন তথা কুর-আনের নির্দেশিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। আল-কুরআনের রাজনৈতিক নির্দেশনার আলোকে রাসূলের (স.) রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থার নি¤েœাক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ক) আল্লাহর আইনের কর্তৃত্ব : আল-কুরআনের বহু আয়াত (সূরা-নিসা : ৫৯, ৬৪, ৬৫, ৮০, ১০৫, আল-আরাফ : ৩, আন-নূর : ৫৪, ৫৫) এবং রাসূলের (স.) অসংখ্যবাণীতে এ মূলনীতি জোরালোভাবে পেশকরা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন “আল্লাহ কিছু করনীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা তা নষ্ট করোনা। কিছু হারাম বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন, তোমরা তাতে ঢুকে পড়োনা। কিছু সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা তা অতিক্রম করো না। ভুল না করেও কিছু ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করেছেন, তোমরা তার সন্ধানে পড়ো না” (মিশকাত)।

“আমি তোমাদেরকে যে বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছি, তা গ্রহণ করো, আর যে বিষয় থেকে বারন করেছি তা থেকে তোমরা বিরত থাক।”

খ) সুবিচার প্রতিষ্ঠা : বিচারকের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে আরম্ভ করে সামান্যতম চৌকিদার পর্যন্ত সকলেরই মানবিক গুরুত্ব সমান ভাবে পরিগণিত হবে। মুখ দেখে এক এক জনের জন্য আইনের প্রয়োগ এক এক রকম হবে না। আল-কুরআনে রাসূলকে (স.) এ বিষয়ে ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে : “তোমাদের মাঝে সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে হুকুম করা হয়েছে” (আশশুরা : ১৫)।

গ) তাকওয়াভিত্তিক মর্যাদা : বংশ, ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে সকল মুসলমানের অধিকার সমান। মর্যাদার ভিত্তিতে নেতৃত্বে থাকবেন তিনি যিনি অধিকতর মুত্তাকী।

রাসূল (স.) বলেন “আল্লাহ তোমাদের চেহারা কিংবা ধনসম্পদের দিকে তাকাবেন না বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কার্যাবলীর দিকে তাকান (ইবনে মাজা)।

ঘ) কর্তব্যের বিষয়ে জবাবদিহিতা : রাসূল (স.) বলেন “সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে কড়া জবাবদিহি করতে হবে।” হযরত ওমর (রা.) বলেন “ফোরাতের পাড়ে একটি ছাগল ছানাও যদি যথাযথ পরিচর্যার অভাবে ধ্বংস হয় তবে আমার ভয় হয়, আল্লাহ আমাকে সেজন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।”

ঙ) পরামর্শভিত্তিক শাসন : সূরা আশুরা : ৩৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে “ আর তাদের কাজকর্ম সম্পন্ন হয় পারস্পরিক পরামর্শক্রমে।” হযরত ওমর (রা.) বলেন “পরামর্শ ব্যতীত কোন খেলাফত নেই।”

চ) কল্যাণকর কাজে আনুগত্য : স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (স.) আনুগত্যের ক্ষেত্রেও সূরা মুমতাহিনা : ১২ আয়াতে মারুফের আনুগত্যের শর্তে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। কোন মারুফ কাজে তারা তোমার নাফরমানী কিংবা অবাধ্যতা করবেনা। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন “লা তায়াতা লি মাখলুকিন ফি মায়াশিয়াতিল খালিক।”

ছ) আমর বিল মারুফ ও নেহি আনিল মুনকার : এ প্রসঙ্গে সূরা আল-মায়েদায় বর্ণিত হয়েছে : “নেকী ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর পরস্পরের সাহায্য করো এবং গুনাহর কাজে সাহায্য করো না।” রাসূল (স.) বলেছেন : “তোমাদের কেউ যদি কোন খারাপ কাজ হতে দেখে তবে তার উচিত হাত দিয়ে সেটা ঠেকানো। তা যদি না পারো তবে মুখ বা ভাষার প্রয়োগ করে এই বিষয়ে বাধা সৃষ্টি করবে। তাও যদি না পারো তখন অন্তর দিয়ে খারাপ জেনে ভিতরে ভিতরে এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে।”

জ) নাগরিক অধিকার : আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক রাসূল (স.) ঘোষণা করেছেন “খাদিমুল কওমী রইসুহুম”। তিনি আরো বলেন “আল্লাহ যে বান্দাকে কোন জনসমাজের উপর নেতৃত্ব দান করেন সে যদি অধীনস্থদের সাথে প্রতারণা করে মারা যায় আল্লাহ তারজন্য বেহেশত হারাম করেছেন” (মুসলিম)। এ প্রসঙ্গে আরো শক্ত ভাষায় বলা হয়েছে “কোন ব্যক্তিই ঈমানদার হতে পারবেনা যদি না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে যা সে কামনা করে নিজের জন্য।” ইসলামী রাষ্ট্র মৌলিক অধিকার হিসেবে সুস্থ অবস্থায় অন্নের সংস্থানের জন্য কাজের ক্ষেত্র, এ জন্য যথোপযোগী শিক্ষা, উপযুক্ত চিকিৎসা ও অসহায় অবস্থার সম্মুখীনদের জন্য নিরাপত্তার ও আশ্রয় বিধানের তিনি যথাযথ ব্যবস্থা করেছেন।

রাসূলের (স.) প্রজ্ঞা ও মহত্ত্ব : প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও রাসূলুল্লাহ (স.) ছিলেন অহির জ্ঞানের গুণে গুণান্বিত শ্রেষ্ঠতম মানুষ ও সর্বোত্তম রাষ্ট্রনায়ক। আল-কুরআন মানুষকে শেখায় জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আর হৃদয়স্পর্শী কথা বলার কৌশল যা রাসূলের মাঝে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। আল কুরআন বলে দেয় সঠিক কর্মপন্থা, অন্তরে দেয় শক্তি, সাহস, ও হিম্মত। মিথ্যার প্রতিবাদে যুক্তি সহকারে জবাব দানের যোগ্যতা এবং এর মোকাবেলা করার উপযুক্ত কর্মনীতি ও কর্মকৌশল। দিনের বেলা জিহাদের ময়দানে এবং রাতে রুকু, সিজদা ও সালাতের ভিতর আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে তিনি নৈতিক, মানসিক ও আত্মিক শক্তি অর্জন করে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রজ্ঞা, পরম উন্নতি ও অনন্যতা লাভ করেন।

শত্রুরাও তাঁর চারিত্রিক সৌন্দর্যে এতই বিমোহিত ছিল যে, মুশরিক আরবদের প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ানও রোম সম্রাট হিরাকেলের দরবারে তাঁর বিরুদ্ধে কোন খারাপ রিপোর্ট পেশ করতে পারে নি। তাঁর সহধর্মিণীগণ এক বাক্যে তাঁকে জীবন্ত কুরআন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর গোলাম হযরত আনাসও দীর্ঘকাল খিদমতের কোন এক সময়েও তাঁর নিকট কোন ভর্ৎসনা বা তিরস্কারের গালি শোনেননি।

প্রতিবেশীদের প্রতি তিনি এতটা যতœবান ছিলেন যে সাহাবীরা পর্যন্ত ভয় করতেন না জানি তাদের ওয়ারিশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কাফির চাচাদেরও তিনি পিতার মত শ্রদ্ধা করতেন।

তিনি বলেন “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” শরাব, নারী, ব্যভিচার ও পাপাচারের নিমজ্জিত একটি জাতির মাঝ থেকে নিজেকে পুত পবিত্র রেখে তিনি ঐ সমাজের একদল মানুষকে, সেই অত্যাচার ও নির্যাতনের সামাজিক আগুনের মাঝে পুড়িয়ে খাঁটি সোনার মত করে নতুন বিপ্লবের উপযোগী চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তুলেন। তাইতো মক্কা বিজয়ের পর দশ লক্ষ বর্গমাইলেরও অধিক এলাকার অধিপতি হয়েও তিনি স্বীয় জুতা ও কাপড় নিজেই সেলাই করতেন। তিনি কখনও কটুভাষী ছিলেন না। সাথীদের নিকট সর্বদাই তিনি ছিলেন নরমদিল এবং আকর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী।

লেখক : কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন