জসিম উদ্দিন মনছুরি
বিগত স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি, অর্থলোপাট, অর্থপাচার, হত্যা, গুম এর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সাথে অংশগ্রহণ করে দেশের সর্বস্তরের জনগণ। আন্দোলন দমাতে শেখ হাসিনা সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। আন্দোলনকারী ছাত্র জনতার উপর মানবতা বিরোধী অপরাধে প্রায় ১৪০০জন আন্দোলনকারী শাহাদাত বরণ করেন এবং পঙ্গুত্ববরণ করেন প্রায় ৫০ হাজার আন্দোলনকারী। আন্দোলনে নিহত হয় তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সের মানুষ। আন্দোলনের তীব্রতায় অবশেষে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। ক্ষমতার পালাবদলে নতুন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে জনগণ দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী নীতি, দুঃশাসন, সীমাহীন দুর্নীতি ও জুলুমের বিরুদ্ধে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে। রাজনৈতিক দলগুলির সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেন। রাজনৈতিক দলগুলির সাথে প্রায় ৭২ দিবস আলোচনার পর সকল দলের ঐক্যমত্যে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়। জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন ও ঐকমত্য গঠনের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তিন দফায় মোট ৭২ দিন আলোচনা চালায়। আলোচনার মূল বিষয়সমূহ তিন দফায় আলোচিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শক্তির সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক আলোচনা সভায় কমিশনের পক্ষে নেতৃত্ব দেন জাতীয় সংস্কার কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সংস্কার প্রস্তাব: প্রথম পর্যায়ে ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে ৬৪টিতে এবং পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্যে পৌঁছায় দলগুলো।
জুলাই সনদ (বা জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫) বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সনদ, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐক্যমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রস্তাবসমূহ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং বাংলাদেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা জুলাই সনদের বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। নির্বাচনী ইশতেহারে সকল দলের মতো বিএনপি দলেরও ইশতেহার ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। দুইটি ব্যালট পেপারে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একটি ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশের উপর হ্যাঁ না ভোট। অন্যটি ছিল সংসদ সদস্য বাছাই করণের। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশের উপর গণভোটে প্রায় ৬৯ পার্সেন্ট লোক হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দেয়। কথা ছিল সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার কমিটি সদস্য হিসেবে একটি শপথ অন্যটির সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি জুলাই সনদ ২০২৫-এ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য আশিটিরও বেশি প্রস্তাব ও আটটি বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও সংসদীয় কাঠামোর পরিবর্তনের রূপরেখা স্থান পায়।প্রধান সংস্কার ও ধারাগুলো রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনার প্রস্তাব। আইনসভা ও সংসদ: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা বা আইনসভার কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার: নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল ও সংবিধানে এর সুনির্দিষ্ট সংযুক্তি। বিচার বিভাগ: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। নির্বাচন ব্যবস্থা: নির্বাচন কমিশন গঠনে স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। ভাষা ও নাগরিকত্ব: রাষ্ট্রভাষা বাংলার পাশাপাশি নাগরিকদের অন্যান্য মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি। দুর্নীতি দমন: দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা বাড়ানো। পুলিশ ও প্রশাসন: জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন গড়ে তোলার নীতিমালা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের প্রাথমিক ধাপ হিসাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার জন্য বিচার বিভাগ সচিবালয় গঠন করেন কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর বিচার বিভাগ সচিবালয় বিলুপ্ত করেন। ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সম্পর্কিত অধ্যাদেশটি বাতিল করা হয়। ১৯ মে ২০২৬ তারিখে আইন ও বিচার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে সচিবালয় বিলুপ্ত করা হয়। ফলে দেখা দিয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা। জুলাই সনদের প্রধান দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার। বিএনপি সরকার নির্বাচনের আগে জুলাই সনদের কথা বললেও নির্বাচিত হওয়ার পর তারা বরাবরই সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংবিধান সংস্কার করতে নারাজ। তাদের দাবি সংবিধান সংস্কার হয় না সংবিধান সংশোধন করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে সংবিধান সংস্কার করা ছাড়া পরিবর্তন কখনো সম্ভব নয়। সংবিধানের এমন কিছু ধারা রয়েছে যেগুলো সংশোধন করলেই সংবিধান পুরোপুরি সংশোধন করা কখনো সম্ভবপর নয়। সংবিধানকে পুনঃলিখন বা সংস্কার করণ ছাড়া দেশের পরিবর্তন কখনো সম্ভব নয়।
জুলাই সনদের আকাক্সক্ষা ছিল যুগে যুগে চলে আসা রীতি নীতির পরিবর্তন। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। জুলাই সনদের প্রধান ধারাগুলি আলোকপাত করলে দেখা যায় যেসব মৌলিক সংস্কারের অভাবে নির্বাচিত সরকার স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে সেসব কাঠামোর সংস্কার। জনগণের আকাক্সক্ষা ছিল নতুন বাংলাদেশে শেখ হাসিনার মত আর কোন নতুন স্বৈরাচারের জন্ম হবে না। জবাবদিহিতা না থাকা ও একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে শেখ হাসিনা সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারসহ মোট প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা) পাচার বা লুটপাট হয়েছে বলে অর্থনীতি নিয়ে গঠিত সরকারি শ্বেতপত্র এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পাচার ও লুটপাটের খতিয়ানে দেখা যায় বার্ষিক গড় পাচার প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে দেশ থেকে বাইরে চলে যায়। মোট প্রাক্কলন: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মূল্যায়নে এই ১৬ বছরে দেশ থেকে লুট ও পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত হিসেবে এসেছে। অন্যান্য গবেষণায় বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে ১৫ বছরে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার (১৭.৬ লক্ষ কোটি টাকা) পাচারের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল। তাছাড়া শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ। এর বাইরে জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ও দমন পীড়নে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এই সময়ে রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন ঘটনায় আরও বহু মানুষ প্রাণ হারান। হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিচারবহির্ভূত হত্যা: সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্রসফায়ারের নামে সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। গুমের ঘটনা: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি এই দীর্ঘ শাসনামলে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। হতাহতের অন্যান্য তথ্য আহত ও পঙ্গুত্ব: ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন এবং ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। শিশু নিধন: জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহতদের ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গুম সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে (২০০৯ থেকে ২০২৪) বাংলাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে যাচাইকৃত ও সংজ্ঞায়িত গুমের শিকার হয়েছেন অন্তত ১,৫৬৯ জন মানুষ। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী এই শাসনামলে গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজের মোট সংখ্যা ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। গুমের পরিসংখ্যান ও তথ্য যাচাইকৃত অভিযোগ: গুম কমিশনে মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনা গুম হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। নিহত বা মৃত বলে চিহ্নিত: নিশ্চিত করা মামলার মধ্যে অন্তত ২৫১ থেকে ২৮৭ জন ভুক্তভোগীকে নিখোঁজ ও পরবর্তীতে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব: স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর দীর্ঘমেয়াদী তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ৭ শতাধিক গুমের সুনির্দিষ্ট রেকর্ড ছিল, যা পরবর্তীতে কমিশন গঠনের পর ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রকৃতি কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে যে গুমের শিকার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বা সিংহভাগ ভুক্তভোগী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, যা একটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক দমনপীড়নের ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়া বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, জঙ্গী নাটকের মাধ্যমে শত শত মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা, ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে জঙ্গী ট্র্যাপ দিয়ে দমন পীড়ন। বছরের পর বছর জেলে বন্দী করে রাখা। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। ব্রিটিশ গণমাধ্যম Financial
Times এবং অর্থনীতি নিয়ে গঠিত সরকারি হোয়াইট পেপার বা শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। পাচার ও দুর্নীতির প্রধান খাতসমূহ ব্যাংকিংখাত: ভুয়া ঋণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাংক দখলের মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ লোপাট। বাণিজ্যিক কারসাজি: আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার। মেগা প্রকল্প: বিভিন্ন বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় প্রাক্কলন ও দুর্নীতির অভিযোগ। হুন্ডি ও আবাসন: হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ বাইরে পাঠিয়ে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়। প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নশ্বেতপত্র কমিটি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জমা দেওয়া অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে বিগত সরকারের আমলে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও পরিসংখ্যান কারসাজির চিত্র প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম: Financial Times তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই লুটপাটকে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক বিশাল আর্থিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে (২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত) প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৪১ হাজারেরও বেশি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব মামলায় অভিযুক্ত বা আসামির সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৪৯ লাখের অধিক। এছাড়া (২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে মোট কতটি মামলা হয়েছিল, তার কোনো সর্বসম্মত বা দাপ্তরিক একক পরিসংখ্যান সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা, নাশকতা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার প্রধান ক্ষেত্র ও বিবরণ নাশকতা ও রাজনৈতিক মামলা: বিভিন্ন সময়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সাথে আন্দোলন এবং কর্মসূচির সময় পুলিশ ও সরকারদলীয় লোকজনের করা নাশকতার মামলায় জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মী ও শীর্ষ নেতা আসামি হন। ২০১৪ সালের আগের ও পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু ঢাকা ও আশেপাশের অঞ্চলেই শত শত মামলা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের কথিত অভিযোগে মামলা ও বিচারকার্য পরিচালিত হয়।
দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ছিল রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে সংস্কার ও পরিবর্তন। জুলাই সনদ ছিল গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। ছাত্র-জনতা শুধুমাত্র ক্ষমতার পালাবদলের জন্য গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেননি। জুলাই অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী নীতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, অর্থপাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা। বিএনপি সরকার গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করলেও বিভিন্ন টালবাহানায় জুলাই সনদকে বারবার এড়িয়ে চলছে। যা জুলাই অভ্যুত্থান ও জুলাই সনদের আকাক্সক্ষার পরিপন্থী। জনগণ শুধুমাত্র সরকারের পালাবদলের জন্য এত প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি। ছাত্র জনতা ও দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষা অতি শিগগির জুলাই সনদের যথাযথ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার কাঠামোর পরিবর্তন আনা। আশা করি সরকারের বোধোদয় হবে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যথায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও শহিদের আত্মত্যাগ বিফলে যাবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।