মোঃ রাশেদুল হাসান আমিন
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা বদলের ইঙ্গিত কয়েক মাস ধরেই আঁচ করা যাচ্ছিল। বড় কোনো পরিবর্তন সাধারণত একদিনে ঘটে না। তার আগে তৈরি হয় অনাস্থা, নতুন যোগাযোগ আর বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর সন্ধান। গত কয়েক মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরকে ঘিরে যে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে, তা এ প্রক্রিয়ারই ইঙ্গিত বহন করছিল। মার্চে রিয়াদে এ চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক বিষয়টিকে প্রথম দৃশ্যমান করে তোলে। সে সম্ভাবনার একটি রূপ দেখা গেল ৭ আগস্ট। মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান স্বাক্ষর করল পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিÑতিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে বিবেচনা করা হবে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে। এ ধারার কারণেই চুক্তিটিকে তুলনা করা হচ্ছে ন্যাটোর (উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট) পঞ্চম অনুচ্ছেদের সঙ্গে, কেউ কেউ নাম দিয়েছেন ‘ইসলামিক ন্যাটো’। প্রশ্ন হলোÑ এটি কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা, নাকি সংকটকালীন রাজনৈতিক সমঝোতার একটি ঘোষণামাত্র? উত্তরটা এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন, কারণ চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব যতটা স্পষ্ট, তার সামরিক কাঠামো ও বাস্তবায়ন-পদ্ধতি ততটাই অস্পষ্ট।
মক্কা চুক্তিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে ধাপে ধাপে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল, সেখানেও এক দেশের ওপর আগ্রাসনকে অন্য দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছিল। এর পেছনে কাজ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-নিশ্চয়তার পাশাপাশি বিকল্প অংশীদার খোঁজার সৌদি নীতি। তুরস্কের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২৬ সালের গোড়াতেই। জানুয়ারিতে চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক টিম চ্যাটেল লিখেছিলেন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য জোট তুরস্কের নিরাপত্তা বাড়ানোর চেয়ে বেশি সংগতিপূর্ণ তার কৌশলগত ‘হেজিং’ নীতির সঙ্গেÑ অর্থাৎ একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অবস্থান সুসংহত করার প্রবণতা। মে মাসে আল-জাজিরা সেন্টার ফর স্টাডিজের বিশ্লেষক ইসমাইল নুমান তেলসি এ চার দেশের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা লিখেছিলেন, যার নেপথ্যে তিনি দেখিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-নিশ্চয়তায় আস্থা কমে যাওয়ার প্রবণতা। এ আস্থার সংকট নতুন নয়। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলার পর থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন নিরাপত্তা-ছাতার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল। হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছেÑ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই চলে বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ, আর সেখানে সামরিক ঝুঁকি বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে তেল রপ্তানি, জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যে। বিশ্লেষকেরা অবশ্য এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিচ্ছেনÑআঞ্চলিক দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বাদ দিতে চাইছে না, বরং তারা চাইছে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে।
চুক্তির সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, তিন দেশের সক্ষমতা একে অন্যের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পাকিস্তানের আছে বড় সামরিক বাহিনী, দীর্ঘ যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক সক্ষমতা। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য, আর তার প্রতিরক্ষা শিল্পÑ বিশেষত ড্রোন ও নৌপ্রযুক্তিÑ গত এক দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। সৌদি আরবের আছে বিপুল আর্থিক সম্পদ, জ্বালানি-নির্ভর কৌশলগত গুরুত্ব ও আরব বিশ্বের প্রভাবশালী অবস্থান। তাত্ত্বিকভাবে এ তিন ধরনের সম্পদ এক জায়গায় এলে আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতায় নতুন ওজন তৈরি হতে পারে। কিন্তু সক্ষমতা একত্র হওয়া আর সংকটের মুহূর্তে অভিন্ন সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়াÑ এই দুটো এক জিনিস নয়। কোন পরিস্থিতিকে ‘আগ্রাসন’ বলা হবে, কোন দেশ কতটা সহায়তা দেবে, প্রতিক্রিয়ার মাত্রা কী হবেÑ এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কাজ করবে।
চুক্তি ঘোষণার পরপরই একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে বর্ণনা করার প্রবণতা দেখা গেছে, আর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিজেও এ তুলনা টেনেছেন। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদে একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে দেখা হয়Ñ মক্কা চুক্তির ভাষাতেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি আছে। তবে এ সাদৃশ্য যতটা দেখা যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো।
ন্যাটো কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রতিষ্ঠানÑএর আছে সামরিক কমিটি, আন্তর্জাতিক সামরিক স্টাফ, স্থায়ী বহুজাতিক সদর দপ্তর এবং কৌশলগত ও পরিচালন পর্যায়ের কমান্ড কাঠামো। সংকট এলে ন্যাটোকে শূন্য থেকে কমান্ড তৈরি করতে হয় না। মক্কা চুক্তিতে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী এসবের কিছুই নেই। সৌদি আরবে একটি সাধারণ সচিবালয় ও মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে বটে, কিন্তু সচিবালয় প্রশাসনিক সমন্বয় করতে পারে, সামরিক কমান্ড হতে পারে না। হামলা হলে সিদ্ধান্ত নেবে কে, কোন দেশ কী ধরনের সহায়তা দেবে, যৌথ বাহিনী কার অধীনে কাজ করবেÑ এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষক টম হুসেইন এপ্রিলেই সতর্ক করেছিলেন, চার দেশকে ঘিরে নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে উঠলেও একে এখনই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা ঠিক হবে না। তাঁর যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়ে সাধারণ উদ্বেগ দেশগুলোকে কাছাকাছি আনলেও তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার পুরোপুরি এক নয়। এই পার্থক্যই চুক্তির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চুক্তিতে ইরানের নাম নেই। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদান বলেছেন, এ চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও একে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ বলে বর্ণনা করেছেন। এ ঘোষিত অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েই দেখা দরকার। তবে বাস্তব ভূরাজনীতিতে কোনো চুক্তির লক্ষ্য শুধু তার লিখিত ভাষা দিয়ে বোঝা যায় না। চুক্তি স্বাক্ষরের সময়টিতে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র। সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে চায়, তুরস্কের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতাÑদুটোই আছে, আর পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত এবং জটিল নিরাপত্তা-সম্পর্ক বিদ্যমান। তেলসির বিশ্লেষণও একই কথা বলছেÑ ইরান প্রশ্নে চার সম্ভাব্য অংশীদারের অবস্থান এক নয়। এ ভিন্নতা থেকেই স্পষ্ট হয়, চুক্তিটি সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোট বলা যেমন অতিরঞ্জিত হবে, তেমনি ইরান প্রশ্নটি এর কৌশলগত হিসাবের বাইরে ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। ‘কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়’Ñএই ভাষা আসলে একধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা, যাতে তিন দেশের ভিন্ন ইরান-নীতি একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারে।
পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা মক্কা চুক্তির চারপাশে সবচেয়ে বেশি জল্পনা তৈরি করেছে। প্রশ্নটা নতুন নয়Ñ ২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান চুক্তির পরও একই আলোচনা হয়েছিল, সৌদি আরব কি পাকিস্তানের পারমাণবিক নিরাপত্তা-ছাতার আওতায় চলে এসেছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের বিশ্লেষক রাবিয়া আখতার এ ধারণাকে অতিরঞ্জিত বলেছেন। তাঁর মূল্যায়নে, প্রকাশ্য চুক্তিতে সৌদি আরবকে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের নিশ্চয়তা দেওয়ার কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেইÑএটি মূলত দুই দেশের পুরোনো সামরিক সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চুক্তি। তবে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক টিম উইলাসি-উইলসি ভিন্ন কোণ থেকে বিষয়টি দেখছেন। তাঁর মতে, সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্কে পারমাণবিক প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে, আর নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতার হিসাবকে জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে তিনি এ-ও বলেছেন, এই সম্ভাবনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করার কারণ নেই।
দুই বিশ্লেষকের এ মতপার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, বিষয়টি এখনো মীমাংসিত নয়। মক্কা চুক্তিকে ‘সৌদির জন্য পাকিস্তানি পারমাণবিক ছাতা’ বলে দেওয়ার আগে প্রকাশ্য চুক্তির সুনির্দিষ্ট ভাষা ও বাস্তব সামরিক ব্যবস্থা দেখা প্রয়োজন। অস্পষ্টতা নিজেই অবশ্য একটি ঝুঁকি তৈরি করেÑপ্রতিরোধক্ষমতা প্রচলিত অস্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পারমাণবিক সক্ষমতার কোনো পরোক্ষ ভূমিকা থাকবে, তা স্পষ্ট না হলে অন্য পক্ষগুলো ভুল হিসাব করতে পারে।
তিন দেশের জন্য এ চুক্তির অর্থ এক নয়। পাকিস্তানের জন্য এটি শুধু সৌদি আরবকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয় নয়Ñএর মাধ্যমে ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা-রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে পাকিস্তানের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর আকাঙ্খাকে এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। ভারতীয় বিশ্লেষক অজয় দর্শন বেহেরা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে লিখেছেন, এই সম্পর্ক পাকিস্তানের মুসলিম বিশ্বে নিরাপত্তা-ভূমিকা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের আকাঙ্খার সঙ্গে যুক্ত, যা ভারতীয় কৌশলগত হিসাবেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, ফলে রিয়াদ এ চুক্তির কারণে হঠাৎ নয়াদিল্লিবিরোধী অবস্থান নেবেÑএমন ধারণার ভিত্তি নেই।
ফিদান জানিয়েছেন, মিসরসহ আরও কয়েকটি দেশ ভবিষ্যতে এই জোটে যুক্ত হতে পারে। মিসর যোগ দিলে সুয়েজ খাল, বড় সামরিক বাহিনী ও আরব বিশ্বে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে চুক্তির ভৌগোলিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে বাড়বে। কিন্তু সদস্য বাড়া মানেই জোট শক্তিশালী হওয়া নয়Ñ বরং নিরাপত্তা-অগ্রাধিকার যত বাড়বে, অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আসল প্রশ্নটা তাই সম্প্রসারণের চেয়েও গভীরে। এ মুহূর্তে ক্ষমতায় থাকা নেতাদের মধ্যকার রাজনৈতিক সমঝোতা চুক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু নেতৃত্ব বদলালে নতুন সরকার আগের অঙ্গীকার কতটা মেনে চলবে, তার নিশ্চয়তা নেই। যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কিংবা আকাশ-সমুদ্র নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে স্থায়ী অর্থায়নও প্রয়োজন হবেÑ কে কত দেবে, ব্যয় কীভাবে ভাগ হবে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই। বেলফার সেন্টারের বিশ্লেষণে ২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান চুক্তি নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছিল, তা এখানেও প্রাসঙ্গিকÑআনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে সহযোগিতার নিশ্চয়তা নয়।
বাংলাদেশ এ চুক্তির অংশ নয়, তবে এর পরোক্ষ প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে জ্বালানি বাজার, বৈদেশিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যয়ে তার আঁচ লাগে দেশে দেশে। হরমুজ প্রণালি বা উপসাগরীয় জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, বাড়তে পারে পণ্য পরিবহনের খরচও। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গেও দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তিন দেশের সঙ্গেই এ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলে বাংলাদেশের কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি হয়ে ওঠে। কোনো সামরিক ব্লকে না জড়িয়ে শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংগতিপূর্ণ।
মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেÑআঞ্চলিক দেশগুলো এখন আর শুধু বহিরাগত নিরাপত্তা-নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। সৌদি অর্থনীতি, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা আর তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিÑএ তিন সম্পদ পরিকল্পিতভাবে একত্র হলে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে সত্যিকারের প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এখনই একে ন্যাটোর সমতুল্য বলে দেওয়াটা তাড়াহুড়ো হবে। স্থায়ী কমান্ড, বহুজাতিক বাহিনী, যৌথ অর্থায়ন কিংবা নিয়মিত মহড়ার মতো যেসব উপাদান একটি সামরিক জোটকে টিকিয়ে রাখে, তার প্রায় কোনোটিই মক্কা চুক্তিতে এখনো দৃশ্যমান নয়।
চুক্তিটির প্রকৃত পরিচয় তাই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতে। সংকটের মুহূর্তে তিন দেশ যদি সত্যিই একে অপরের পাশে দাঁড়ায়Ñ যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা সহযোগিতা আর কার্যকর পরামর্শ-কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই অঙ্গীকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়Ñ তাহলে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা মানচিত্রে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে। আর যদি ঘোষণার বাইরে সেই ভিত্তি তৈরি না হয়, তবে এটি ইতিহাসে থেকে যাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত হিসেবেইÑ যার কালি শুকিয়েছে কাগজে, বাস্তবে নয়।
লেখক : সাংবাদিক।