দুই
ইরানী সংবিধানের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি অনুযায়ী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার দেশের ঐক্য এবং আঞ্চলিক সংহতি একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এগুলোর সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং প্রত্যেকটি নাগরিকের অপরিহার্য দায়িত্বও। স্বাধীনতার নামে কোনো ব্যক্তি, দল বা কর্তৃপক্ষ দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত করার ন্যূনতম অধিকারও সংরক্ষণ করেন না। অনুরূপভাবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বা আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার অজুহাত দেখিয়ে আইন বা বিধিবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে বৈধ কোনো অধিকার বাতিল বা স্থগিত করতে পারবেন না।
অনুচ্ছেদ ১০ : যেহেতু পরিবারই হচ্ছে ইসলামী সমাজের প্রাথমিক ও মৌলিক ইউনিট সেহেতু একটি সুষ্ঠু ও কলুষমুক্ত পরিবার গঠন ও বিকাশের উদ্দেশ্যে এবং পারিবারিক বন্ধন ও তার পবিত্রতা রক্ষার জন্য ইসলামী আইন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দেশের যাবতীয় বিধিবিধান ও প্রাসঙ্গিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১১ : পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ৯২নং আয়াত অনুযায়ী সারা দুনিয়ার মুসলমানরা একটি একক ও অনন্য জাতি সেহেতু মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা ও লালনের ব্যাপারে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের একটি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্বের আলোকে মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১২ : ইরানের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং মাজহাব বা ফিকাহ অনুসরণের ক্ষেত্রে ইরান জাফরী মাজহাবকে অনুসরণ করা শ্রেষ্ঠ মনে করে (ইসনা আসারিয়া-বারো ইমামের ওপর আস্থা)। এ আস্থা অনন্তকাল অপরিবর্তনীয় থাকবে। তবে অন্যান্য ইসলামী মাজহাবসমূহ বিশেষ করে হানাফী, সাফেয়ী, মালেকী, হাম্বেলী ও জায়েদী মতাবলম্বীদের প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। তারা তাদের নিজ নিজ জুরিস প্রুডেন্স বা ফিকাহ দর্শন অনুযায়ী তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পটালন করবেন। এসব মাজহাবের অনুসারীরা ধর্মীয় শিক্ষা, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, হেবানামা প্রভৃতি ক্ষেত্রে এবং মামলা মোকদ্দমার ব্যাপারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্য হবেন, দেশের যে সমস্ত অঞ্চলে এ সব মাজহাবের অনুসারী মুসলমান সংখ্যায় অধিক সেসব অঞ্চলের স্থানীয় বিধিবিধানসমূহে তাদের মতাদর্শের প্রতিফলন প্রাধান্য পাবে; তাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া হবে না।
অনুচ্ছেদ ১৩ : অগ্নি উপাসক জরোস্টিয়ান, ইহুদি ও খৃস্টান ধর্মের অনুসারী ইরানীরাই মাত্র আইনের দৃষ্টিতে ইরানে বসবাসকারী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা নিজ নিজ অনুশাসনের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে ও বিনা বাধায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারবেন।
পবিত্র কুরআনের সূরা মুমতাহিনার ৮নং আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সরকার ও তার মুসলিম নাগরিকবৃন্দ ইসলামী আদল, নৈতিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্সেত্রে অমুসলিম নাগরিকদের প্রতি কোনোরকম বৈষম্য সৃষ্টি করবে না। যারা ইসলাম ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্মে লিপ্ত হবেন না তাদের জন্য উপরোক্ত নীতিমালা প্রযোজ্য হবে, বলাবাহুল্য সূরা মোমতাহানার ৮নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ ইরানী সংবিধানের প্রথম ভাগের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সংক্রান্ত ১৪টি অনুচ্ছেদে বর্ণিত বাধ্যবাধকতাসমূহ মেনে নেয়ার পর দ্বিতীয় ভাগে সরকারি ভাষা, স্কিপ্ট, ক্যালেণ্ডার এবং দেশের জাতীয় পতাকা সংক্রান্ত বিষয়ে বিষদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ১৫ : এতে বলা হয়েছে যে, ইরানের সরকারি ভাষা, বর্ণমালা বা স্বরলিপি, যোগাযোগের সাধারণ ভাষা এবং পাঠ্যপুস্তকের ভাষা হবে ফার্সি। তবে পত্রপত্রিকাসহ গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ফার্সি ছাড়াও আঞ্চলিক ও উপজাতীয় ভাষাসমূহের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য হবে এবং তাকে উৎসাহিত করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১৬ : যেহেতু কুরআন হাদিসের ভাষা আরবী এবং ফিকাহ উসুলসহ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এ ভাষাতেই হয়েছে এবং ফার্সি ভাষা সাহিত্য আরবীর সঙ্গে মিশে গেছে সেহেতু এই ভাষাটি প্রাথমিক থেকে শিক্ষার সর্বস্তরে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১৭ : রাসূল (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর বর্ষ পঞ্জিকায় নতুন ধারা প্রবর্তিত হয়েছে এবং এ প্রেক্ষিতে সৌর ও চান্দ্রবর্ষ উভয়ই স্বীকার্য ও তা অনুসরণ করতে হবে। তথাপিও সরকারি অফিস আদালতে সৌরবর্ষ অনুসরণ করা হবে এবং সরকারিভাবে সাপ্তাহিক ছুটিপর দিন হবে শুক্রবার।
অনুচ্ছেদ ১৮ : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জাতীয় পতাকা সবুজ সাদা ও লাল, এ তিনটি সমান আনুভূমিক ডোরা বা রঙের সমন্বয়ে গঠিত একটি আয়তাকার পতাকা হবে। সবুজের ওপর সাদা কুফিক লিপিতে ‘আল্লাহু আকবর’ লেখা থাকবে, কার্যত এটি হবে তিনটি রঙের সমান আনুভূমিক ব্র্যান্ডের একটি ত্রিবর্ণ যেখানে ইসলামিক প্রতীক সাদা ব্র্যান্ডের ওপর কেন্দ্রীভূত লাল রং রয়েছে এবং আরবী তাকবীর সবুজ ও লাল ব্র্যান্ডের প্রান্ত বরাবর সাদা কুফিক লিপিতে ১১ বার লেখা হবে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইসলামী বিপ্লবের আগে ১৯০৭ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সিংহ ও সূর্যের প্রতীক খচিত একটি ত্রিবর্ণ পতাকা ছিল ইরানী পতাকা। এই পতাকায় সিংহ ও সূর্যকে শক্তির উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিপ্লবোত্তর পতাকায় সার্বভৌমত্বের মালিক হিসেবে মহান আল্লাহকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং সবুজ হচ্ছে ইসলামের সাদা শান্তি এবং লাল রংকে সাহস ও জেহাদের প্রতীক হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। ইরানী সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে জনগণের অধিকারের বিষয়টি বিধৃত করা হয়েছে। ১৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সকল ইরানী বাসিন্দারা সমান অধিকার ভোগ করবে; ভাষা, ধর্ম, বর্ণ বা এই ধরনের কোনো কিছু তাদেরকে বিশেষ অধিকারের যোগ্য বলে গণ্য করবে না।
২০নং অনুচ্ছেদে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিককে মৌলিক মানবাধিকার বিশেষ করে আইনি সুরক্ষা ও ইসলামী মানদণ্ডের ভিত্তিতে সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।
২১নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সরকার ইসলাম প্রদত্ত অধিকার ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে নারীদের সকল অধিকার নিশ্চিত করবে এবং তার আলোকে নিম্নোক্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলী সুসম্পন্ন করবে :
১। পার্থিব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় ক্ষেত্রে মহিলাদের ব্যক্তিত্ব গঠন ও বিকাশ এবং অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
২। গর্ভাবস্থা এবং শিশু পরিচর্যাকালে মায়েদের এবং অভিভাবকহীন শিশুদের সুরক্ষা প্রদান।
৩। পরিবারের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য উপযুক্ত আদালত প্রতিষ্ঠা।
৪। বিধবা, বয়ষ্কা ও অসহায় মহিলাদের ভরণ-পোষণ, গৃহ ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান।
৫। আইনসঙ্গত অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে অসহায় ছেলেমেয়ে তথা শিশুদের উপযুক্ত মা’দের আভিভাবকত্ব প্রদান।
২২নং অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্মান ও মর্যাদা, জীবন, সম্পত্তি, বাসস্থান, পেশা ও বাসস্থানের অধিকারকে আইনগত বাধা ছাড়া সর্বত্র অলঙ্ঘনীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
২৩নং অনুচ্ছেদে ব্যক্তির ধারণা বিশ্বাসকে সন্দেহ করা এবং তাকে তদন্তের বিষয়বস্তু বানানোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যেকোনো একটা বিশেষ ধারণা বা বিশ্বাস পোষণ করার কারণে কাউকে উত্ত্যক্ত বা তিরস্কার করা যাবে না।
২৪ নং অনুচ্ছেদে পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনীসহ গণমাধ্যমকে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। তবে ইসলামের মৌল নীতি ও গণঅধিকারের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে সংযমী হবার কথাও বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনীয় বিধিবিধান তৈরি করবেন।
২৫ নং অনুচ্ছেদে বৈধ ও বিদ্যমান আইনের সুুুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলে চিঠিপত্রের বিষয়বস্তু পরীক্ষা করা, প্রাপককে না দেয়া টেলিফোনের কথাবার্তা রেকর্ড করা, বিঘ্ন সৃষ্টি করা টেলিগ্রাফ বা টেলেক্স যোগাযোগ ফাঁস করা, সেন্সর করা, কাটছাঁট করা অথবা বার্তা প্রেরণ না করা, আড়িপাতা অথবা যেকোনো ধরনের তদন্ত বা অনুসন্ধানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধরনের অনুসন্ধান করতে হলে যথাযথ কারণ উল্লেখ করে সরকারের পূর্ব অনুমোদন নিতে হবে। (চলবে)