বাংলাদেশে নতুন বছর এলো। ১৪৩৩ সনকে নানাভাবে স্বাগত জানানো হলো। নিজের মতো করে নানা আশাবাদও ব্যক্ত করেছে মানুষ। কিন্তু ছুটি শেষে আঙ্গিনায় নামতেই ধাক্কা খেল মানুষ এবং তাদের আশাবাদও। যাতায়াতের জন্য জ¦ালানি প্রয়োজন, তাই দীর্ঘ লাইন। লাইনে তেল পুড়ছে, সময় পুড়ছে, টাকা পুড়ছে, পুড়ছে আশাবাদও। এর কি কোনো সামাধান নেই? যদি মানুষ মানুষের জন্য হয়, তাহলেই তো সমাধান। কিন্তু টেবিলের ওপারে তো বসে আছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু, যারা মানুষ কম দানব বেশি। আসলে চেহারায় ওরা মানুষ হলেও চিন্তা-চেতনায় মহাদানব। পৃথিবীর দুঃখ এখানেই।
যুদ্ধবিরতির বিষয়টি উঁকি দিয়েও আবার মেঘের ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে গেল। পহেলা বৈশাখ, ১৪ এপ্রিলের খবর হলো-ইরানের সব বন্দর, হরমুজ প্রণালি ও আশেপাশের সমুদ্র পথের বিস্তৃত এলাকায় নৌঅবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ৮টা) এ অবরোধ কার্যকর হয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়ে পোস্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরানের কোনো জাহাজ পারস্য উপসাগরে কার্যকর হওয়া অবরোধের আওতাধীন এলাকার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে সেগুলোকে তৎক্ষণাৎ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এর বিপরীতে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এ ধরনের অবরোধ অবৈধ ও জলদস্যুতার শামিল। আমরা অবরোধ, ধ্বংস ও প্রতিশোধের বার্তা পেলাম, কিšুÍ শান্তির বার্তা নেই।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক জ¦ালানির বাজার আবার অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কত দূরের ঘটনা কিন্তু তার আঁচ এসে লাগে বাংলাদেশের গায়েও। ইউক্রেন যুদ্ধের আঁচও আমাদের গায়ে লেগেছে। এতে আমাদের দুঃখ বাড়ে। দুঃখের দানব কখনো হয় পুতিন, কখনো ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। এটাইতো বর্তমান বিশ^ব্যবস্থার ঘৃণ্য বাস্তবতা।
বাংলা নববর্ষে আমাদের প্রশ্ন, কেন এই যুদ্ধ? এই প্রশ্ন বিশে^র শান্তিকামী মানুষেরও। বিশ্লেষকদের কারো কারো মধ্যে দেখা দিয়েছে ভিন্ন এক প্রশ্ন। যুদ্ধটা কি ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ; নাকি যুদ্ধটা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরাইলের? এক জটিল প্রশ্ন। কলাম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হামিদ দাবাশি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলতে আমি এখানে সেই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানদের বোঝাচ্ছি, যারা এই যুদ্ধের বিরোধী, যারা নিজ দেশের ভেতরে এই ইসরাইলি আক্রমণের শিকার। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থাকা ইসরাইলি স্বার্থ রক্ষাকারী গোষ্ঠী মনে করে তারা এই যুদ্ধকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলি-মার্কিন জোটের যুদ্ধ হিসেবে বিশে^র কাছে বিক্রি করতে পারবে, কিন্তু তারা তাতে সফল হবে না। হামিদ দাবাশি আরো বলেন, সতর্কভাবে লক্ষ্য করলে উপলব্ধি করা যায়-কীভাবে নিউইয়র্ক টাইমসও তাদের অনুসারী মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলো যুদ্ধ বিরোধী সমালোচনাগুলোকে প্রকৃত অপরাধী ইসরাইল ও এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর না ফেলে বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে কেন্দ্রীভূত করছে এবং এভাবে বিভ্রান্ত করতে চাইছে মার্কিন নাগরিকদের। এর মাধ্যমে তারা যুদ্ধ শুরু করা গণহত্যাকারী জায়নবাদীদের দিক থেকে মানুষের ক্ষোভের দৃষ্টি বিকারগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দিকে ফেরাতে উৎসাহিত করছে। এই যুদ্ধ আসলে শুরু করেছে ইসরাইল ও নেতানিয়াহু। এটি এমন এক যুদ্ধ, যা ইসরাইল একই সঙ্গে ইরান এবং এ যুদ্ধবিরোধী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করছে। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক তাদের দেশকে ইসরাইলের শ^াসরুদ্ধকর কবজা থেকে মুক্ত দেখতে চান।
ইসরাইল, অর্থাৎ এই সেটেলার কলোনি বা বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশের কল্যাণে অর্থায়ন করতে নিজেদের অধিক মূল্য দিতে হচ্ছে এসব মার্কিন নাগরিকদের। গণহত্যাকারী জায়নবাদ থেকে সরে আসার যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন মার্কিন রাজনীতিতে ঘটছে, তার বিরুদ্ধে ইসরাইলপন্থী লবিস্ট গ্রুপগুলোর তৎপরতার ফল ইরানের ওপর এই ইসরাইলি যুদ্ধ। নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে এমন একটি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখে আসছিলেন। অবশেষে তিনি ইরানের ওপর আক্রমণে যোগ দিতে ট্রাম্পকে প্ররোচিত করতে সফল হন।
হামিদ দাবাশির এমন বিশ্লেষণের পক্ষে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। আনাদোলু এজেন্সি জানায়, জন কেরি বলেছেন-ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনের ওপর ইরানে সামরিক হামলা চালনোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন, তবে আগের কোনো প্রেসিডেন্ট এতে সম্মত হননি। গত শুক্রবার ‘দ্য ব্রিফিং উইথ জেন পসাকি’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জন কেরি বলেন, তিনি নিজেও একাধিক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন যেখানে নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কেরির ভাষায়, ‘তিনি আমাদের দিয়ে ইরানে হামলা চালাতে চেয়েছিলেন।’ তিনি জানান, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব সরাসরি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে উপস্থাপন করেন, কিন্তু তিনি এতে রাজি হননি। এমন প্রস্তাবে রাজি হননি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং জর্জ ডব্লিউ বুশও। কেরি আরো বলেন, একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি এতে সম্মত হয়েছেন, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসলে দাম্ভিক ও স্থ’ূলবুদ্ধির মানুষ ভুল বেশি করে থাকেন। ইসরাইলের ফাঁদে পা দিয়ে সেই কথাটাই প্রমাণ করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্পের ভুলের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এবার ইরান যুদ্ধে তিনি ধর্মকে টেনে আনলেন। ধর্মের সদুপোাদেশ গ্রহণের জন্য নয়, বরং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করে স্বার্থ হাসিলের জন্য। সাথে রয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও। নিজেকে খৃস্টান হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন ট্রাম্প। দায়িত্ব পালনকালীন একাধিকবার নিজের কর্মকা-ের পক্ষে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সাংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঈশ^র ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করেন বলে তিনি বিশ^াস করেন। তার ভাষায় ‘ঈশ^র মঙ্গলময়’ এবং তিনি ‘মানুষের কল্যাণ দেখতে চান।’ আর ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরান যুদ্ধকে ‘ঐশ^রিক অনুমোদনপ্রাপ্ত’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, ঈশ^র মার্কিন বাহিনীর পক্ষে রয়েছেন। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর পেন্টাগণের একটি গীর্জায় আয়োজিত হেগসেথ তার প্রার্থনায় সামরিক শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানান এবং বলেন, প্রতিটি গোলা যেন শত্রুদের গায়ে আঘাত হানে।
ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে আমরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বয়ান জানলাম। তারা তো বললেন, ঈশ^র ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করেন এবং ঈশ^র মার্কিন বাহিনীর পক্ষে রয়েছেন। এর বিপরীতে আমরা পোপ লিও চতুর্দশ-এর প্রতি মনোযোগ দিতে পারি। তিনি বলেছেন, সামরিক শক্তি কখনোই প্রকৃত শান্তি ও স্বাধীনতা এনে দিতে পারে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন যখন ইরান-ইসরাইল সংঘাতে ধর্মকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন পোপ স্পষ্টভাবেই সেই অবস্থান নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, ঈশ^র কোনো সংঘাতকে আশীর্বাদ করেন না। যারা এক সময় তলোয়ার চালিয়েছে এবং আজ বোমা ফেলছে, যিশুখৃস্টের কোনো অনুসারী কখনোই তাদের পক্ষে থাকতে পারে না। পোপ আরো বলেন, শান্তি আসে মানুষের মধ্যে ধৈর্যশীল সহাবস্থান ও সংলাপের মাধ্যমে। পোপ অবশ্য তার পোস্টে সরাসরি ট্রাম্প বা অন্য কোনো নেতার নাম উল্লেখ করেননি।
ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের যে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প, তার সমালোচনা করেন পোপ লিও। তিনি একে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল ঘৃণাকে উসকে দিচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিক এক গণপ্রার্থনায় পোপ জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গাইতে ঈশ^রকে ব্যবহার করা যায় না।’ হাজারো মানুষের সামনে পোপ বলেন, ‘ঈশ^র যুদ্ধবাজদের প্রার্থনা শোনেন না, বরং তা প্রত্যাখ্যান করেন।’ পোপের বক্তব্যের পর উপলব্ধি করা যায়, ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী যে বয়ান দিয়েছেন, তার কোনো ভিত্তি নেই। বরং তারা ধর্মের অপব্যবহার করেছেন এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধ নয়, বিশে^র মানুষ শান্তি চায়, শান্তি চায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও। তাই তো যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তাদের কণ্ঠে ছিল ‘নো কিং’ স্লোগান। তারা ট্রাম্পের মতো কোনো স্বৈরাচারী রাজাকে চান না। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ফাঁদে যে প্রেসিডেন্ট পা দেয়, তাকে কিভাবে সমর্থন করবে দেশের নাগরিকরা। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টকেও ইরানে হামলা চালানোর প্ররোচণা দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তারা সেই ফাঁদে পা দেননি, কিন্তু ফাঁদে পা দিলেন ট্রাম্প। এখন কর্মফল তো ভুগতেই হবে।