আসিফ আরসালান
বিএনপি সরকার আসলে কোন পথে? এ সরকার আসলে কী চায়? বিগত ২ মাসে এ সরকার এমন সব কাজ করেছে যেগুলো শুধুমাত্র জুলাই সনদ নয়, রীতিমতো জুলাই স্পিরিটেরও বিরোধী। আজ আমরা সেসব কাজের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। সে আলোচনার আগে গত বৃহস্পতিবার একটি অনলাইন দৈনিকে একটি খবর দেখলাম। খবরটি পড়ে চরমভাবে বিস্মিত হলাম। খবরে বলা হয়েছে, মো. মাসদার হোসেনের আইনজীবী সনদ সাময়িকভাবে স্থগিত করে তাঁকে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। গত বুধবার বার কাউন্সিলের সভায় সর্বসম্মতিতে এ সিদ্ধান্ত হয় বলে সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
মাসদার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগসংক্রান্ত একটি দৈনিকের ১২ এপ্রিলের প্রতিবেদন বার কাউন্সিলের নজরে এসেছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাসহ পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্ন বিবেচনায় নিয়ে বার কাউন্সিল সভা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এ ব্যাপারে মাসদার হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রাথমিক উপাদান রয়েছে। তাই সাময়িকভাবে তাঁর সনদ স্থগিত করা হলো। তাঁর সনদ কেন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে পর্যন্ত তাঁর সনদ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।
এ বিষয়ে লিখিত এক বক্তব্যে মাসদার হোসেন বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একটি মহল বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর ও অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রকাশ করেছে।’
মাসদার হোসেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ। ১৯৯৫ সালে তিনি বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ছিলেন। তখন নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত মামলাটি তিনি ও তাঁর সহকর্মী বিচারকেরা দায়ের করেছিলেন। যেটি ‘মাসদার হোসেন মামলা’ নামে পরিচিতি পায়। অবসর গ্রহণের পর মাসদার হোসেন আইন পেশায় ফেরেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মামলা তথা নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ কায়েম করার জন্য মাসদার হোসেনের এ মামলায় মাসদার হোসেন জয়লাভ করেন এবং সারাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আপহীন প্রবক্তা হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। এহেন আইনজীবীর আইনজীবী সনদ স্থগিত করায় আইনজীবী মহল তথা শিক্ষিত সচেতন জনগণ যারপর নেই বিস্মিত হয়েছেন। একই দিন অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আরেকটি খবর সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দৈনিক আমার দেশের অনলাইনে প্রকাশিত খবরটির শিরোনাম, “ফের গণমিছিলের ডাক ১১ দলীয় ঐক্যের”। খবরে বলা হয়েছে, জুলাই সনদ সংস্কার বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১দলীয় ঐক্য।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১৮ এপ্রিল রাজধানী ঢাকায় গণমিছিল, ২৫ এপ্রিল ঢাকা ছাড়া সব বিভাগীয় শহরে এবং ২ মে সব জেলা সদরে গণমিছিল। এছাড়া ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জেলায় সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া পরবর্তীতে বিভাগীয় সমাবেশ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। এসব কর্মসূচির তারিখ পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিরোধী দলের ১১ দলীয় জোট এরকম রাজপথের কর্মসূচি দিলো কেনো? কারণটি হলো, নির্বাচনের আগে বিএনপি সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন সম্পর্কে যেসব কথা বলেছিলো নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে এখন এর অনেকগুলো বিষয়ে তারা ১৮০ ডিগ্রি উল্টে গেছে। বিএনপির এই চোখ উল্টানোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নীচে দিচ্ছি :
সকলেই জানেন যে, সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট। গণভোটে ৬৯ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন। ওই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একই স্থানে দুটি শপথ হওয়ার কথা ছিল। এর একটি সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না থাকার অজুহাতে বিএনপি জোট ও তার মিত্ররা এই শপথ পাঠ করেননি। তারা শুধু এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে জামায়াত ও তাদের মিত্র এনসিপিসহ অন্য দলগুলো থেকে বিজয়ীরা দুটি শপথই নিয়েছেন। এদিকে সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটের ফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন এক আইনজীবী। বিরোধী দল মনে করে যে, বিএনপির অঙ্গুলি হেলনেই জুলাই সনদ বিশেষ করে গণভোটের বিরুদ্ধে এই রিট আবেদন দাখিল করা হয়েছে। একটি পত্রিকায় বলা হয়েছে যে, আগামী ২০ এপ্রিল সোমবার এ রিট আবেদনের শুনানি হবে।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এবং গণভোটের ওপর সাধারণ নির্বাচন ও ভোট গ্রহণ করা হয়। নির্বাচন ও গণভোট দুটিই করা হয় ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ এর অধীনে। এখন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধের যে প্রধান পয়েন্ট সেটি হলো, যে বাস্তবায়ন আদেশের অধীনে নির্বাচন ও গণভোট হলো সে ধরনের আদেশ দেওয়ার কোনো ক্ষমতা বর্তমান সংবিধান প্রেসিডেন্টকে দেয়নি। সবাইকে সংবিধান মেনেই চলতে হবে। বিএনপির পক্ষে যারা তারা বলছেন , বাস্তবায়ন আদেশে দুটি শপথের কথা বলা হয়েছে। একটি হলো, জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে অর্থাৎ এমপি হিসাবে শপথ গ্রহণ। আর একটি হলো, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ। বিএনপি এবং তার মিত্ররা শুধুমাত্র এমপি হিসাবে শপথ নিয়েছেন। কিন্তু তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। তাদের যুক্তি, সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব সংবিধানে নেই। জামায়াতসহ বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য দু’টি শপথই নিয়েছেন।
জাতীয় সংসদ অধিবেশনের পূর্বে সাংবাদিকরা সালাহ উদ্দিন আহমেদ এবং মেজর হাফিজ উদ্দিনকে প্রশ্ন করেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে আজ আপনারা সংস্কার পরিষদকে তথা প্রেসিডেন্টের সংবিধান সংস্কার আদেশকে অস্বীকার করছেন। প্রেসিডেন্ট তো এ আদেশ জারি করেছেন নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। আর নির্বাচন হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। মাঝখানে তো প্রায় ৩ মাস সময় ছিলো। তখন আপনারা এ আদেশ মেনে নিয়েছেন এবং নির্বাচনও করেছেন। তখন কেনো আপনারা বলেননি, ঐ আদেশ অবৈধ। আদেশ অবৈধ হলে আপনারা অবৈধ আদেশের অধীনে নির্বাচনে গেলেন কেনো? তারা উভয়েই উত্তরে বলেছিলেন যে, এটিই ছিলো আমাদের একটি কৌশল। যদি আমরা তখন ঐ আদেশের বিরোধিতা করতাম তাহলে ইন্টারিম সরকার নির্বাচন দিতো না। আর দিলেও অনেক দেরি করে দিতো। আমরা সরকারকে নির্বাচন না দেওয়ার বা পেছানোর সুযোগ দেইনি।
বিএনপির এ ভূমিকাকে কী বলবেন? রাজনীতিরও একটি নৈতিকতা থাকে। বিএনপির এ ভূমিকা শুধুমাত্র চরম সুবিধাবাদিতাই নয়, বরং জনগণের সাথে নগ্ন প্রতারণা। এ প্রতারণা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। নির্বাচনের আগে তিনি সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার এলএফও বা আইনগত কাঠামো মেনে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গিয়েছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা শেখ মুজিবকে বলেছিলেন, ইয়াহিয়ার এলএফও তো ৬ দফার সাথে সাংঘর্ষিক। এলএফও হলো, অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য একটি স্থিতিশীল কেন্দ্রীয় সরকারের ফরমুলা। কিন্তু ৬ দফা তো দুর্বল কেন্দ্র তথা কনফেডারেশনের ফর্মুলা। একটি কনফেডারেশন এলএফওর সাথে যায় কিভাবে? উত্তরে মুজিব বলেছিলেন, আগে ইলেকশনে জিততে দাও। পরেরটা পরে দেখা যাবে। পরে কি দেখা গেলো সেটা সকলেই জানেন। বিএনপিও তো তাই করলো। আগে ইলেকশনে জিতে নেই। তারপর বাস্তবায়ন আদেশ দেখা যাবে। আসলে ইলেকশনে দু’তৃতীয়াংশ মেজরিটি পেয়ে এখন বলছে, বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ।
সালাহ উদ্দিন সাহেব তথা বিএনপির এ অবস্থানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রধান প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেছেন, যদি বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ হয় তাহলে গণভোটই শুধু অবৈধ নয়। নির্বাচনও অবৈধ। নির্বাচন অবৈধ হওয়ার কারণে জাতীয় সংসদও অবৈধ। জাতীয় সংসদ অবৈধ হওয়ার কারণে বর্তমান সরকারও অবৈধ। প্রফেসর দিলারা চৌধুরীর এ বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন, সুপ্রীম কোর্ট আপিল বিভাগের প্রাক্তন বিচারপতি আব্দুল মতিন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান , এ্যাডভোকেট শিশির মনিরসহ অনেকে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়ে দেন, তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তপশিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এ শপথ পড়াবেন তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে।’ দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সহকর্মীদের জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। পক্ষান্তরে জামায়াতের নায়েবে আমীর ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, সংস্কার বিহীন সংসদ অর্থহীন।
ঐ দিকে হাইকোর্টের রিটে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ বা কোনো সাংবিধানিক সভা (গণপরিষদ) নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক ট্রাস্টি, যা কঠোরভাবে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ আনুষ্ঠানিক নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, যা ভঙ্গ করা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
বিএনপি মুখ ফুটে যা বলতে চায় না রিটের মাধ্যমে তা বলেছে। আর সেখানে ড.ইউনূসের ইন্টারিম সরকাকেও কঠোরভাবে সংবিধানের অধীন বলে বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ আনুষ্ঠানিক নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, যা ভঙ্গ করা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
এর পরে আর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো মিটিং পয়েন্ট নেই, অর্থাৎ দুই বক্তব্য দুই মেরুর মতো। বিরোধী দল মনে করে, সংবিধান মেনে হাসিনাকে বিতাড়ন করা হয়নি, সংবিধান মেনে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করা হয়নি, সংবিধান মেনে তারেক রহমানের সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। আসলে সংবিধান মেনে নির্বাচনও করা হয়নি।
সরকারি দলের এ অবস্থানের সাথে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। সেজন্যই ইতোমধ্যেই বিরোধী দল রাজপথে এসেছে। ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে রাজপথের যে কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে সেটি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের মতামতকে তথা জনমতকে উপেক্ষা করার কারণেই দেওয়া হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, ২ মে’তেই এ কর্মসূচি থেমে থাকবে না। এটি অনেক দূর গড়াবে।
Email:[email protected]