মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

বিশ্ব আগে দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্ব ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। এরপর দাপুটে সমাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীশক্তি সোভিয়েট ইউনিয়নের পতন ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দানবশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে আমেরিকা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে তার হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে নানা কূটকৌশলে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর বাস্তব প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন, মার্কিন মদদে গাজায় গণহত্যা এবং সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে সারা বিশ্বকে তটস্থ করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঘৃণ্য প্রয়াস। সর্বশেষ ইরানে আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলা। সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও অতিবাড়াবাড়ির পরিণতি কখনো ভালো হয় না। যার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। এবার কি একক পরাশক্তি আমেরিকাও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

বলা হচ্ছেÑ পুরনো বিশ্বের মৃত্যু ঘটছে। বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং জনতুষ্টিবাদীদের উত্থানÑ এ সবই হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার আসন্ন সমাপ্তির লক্ষণ। সম্ভবত এই কারণেই এই লক্ষণ ও প্রবণতাগুলোর কিছু কিছু দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্ব যা দেখেছিল তার সাথে এত সাদৃশ্যপূর্ণ। তখনো ছিল অর্থনৈতিক মন্দা, জনতুষ্টিবাদী যুদ্ধ এবং পরিবর্তনশীল জোট।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে হামলা করার অপেক্ষায় ছিলেন। যে যুদ্ধকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনিবার্য বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন, এখন তা বাস্তবে কার্যকর হয়েছে। ইরানের সাথে একটি সরাসরি যুদ্ধÑ যেটা কেবল ইসরাইলের একার নয়, বরং আমেরিকার পূর্ণ সামরিক শক্তি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এটা কোনো সীমিত হামলা বা পরিমিত শক্তি প্রদর্শন নয়। এটা আঞ্চলিক পুনর্গঠনের তথা বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত। বছরের পর বছর ধরে নেতানিয়াহু ও তার ঘনিষ্ঠমহল মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন রূপ দেয়ার কথা খোলাখুলি বলে আসছিলেন।

‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণাটি প্রান্তিক পর্যায় থেকে মূল রাজনৈতিক আলোচনায় চলে এসেছে। গোটা মুসলিম বিশ্বই তাদের টার্গেট বা লক্ষ্যবস্তু। কেবল পালাক্রমে ধারাবাহিক পরিণতির অপেক্ষায় আছে তারা। পেছনে মার্কিন সামরিক শক্তি থাকায় নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন বলপ্রয়োগ করেও ইতিহাস সৃষ্টি করা যায়। বলা হচ্ছে- এই যুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক বোমা এবং আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তাকে নিয়ে।

এই কথা আগেও বলা হয়েছিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং তার ব্রিটিশ প্রতিপক্ষ টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন সাদ্দাম হোসেনের কথিত ‘গণ বিধ্বংসী অস্ত্র’ নিয়ে। আমরা দেখলাম ইরাক আক্রান্ত, ধ্বংস ও খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেল। পরে আবিষ্কার করলাম, যুদ্ধের মূল অজুহাতটি ছিল একটি মনগড়া মিথ্যা কাহিনী।

এখন সেই চিত্রনাট্যটি ঝেড়ে মুছে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন করা হয়েছে। ওমান ও জেনেভায় আলোচনার সময় ইরান নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমাতে এবং ব্যাপক তত্ত্বাবধান মেনে নিতে তারা প্রস্তুত ছিল। উত্তেজনা কমানোর সুযোগও ছিল। কিন্তু তার বদলে, আলোচনা নাটকে পরিণত হলো। কূটনীতিকরা যখন আপসের কথা বলছিলেন, তখন মার্কিন নৌবহরগুলো নীরবে ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপসাগরের পানিতে চলাচল করছিল। সংলাপের ছদ্মাবরণে সৈন্য সমাবেশ চলছিল। এই দৃশ্যপট ছিল পরিচিত : শান্তির কথা বলো, যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা হলো, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হলো, সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমা ফেলা হলো, শহরগুলো কেঁপে ওঠল। তবুও, পশ্চিমা প্রভাবশালী বয়ানে ইরানকে আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কয়েক দশক ধরে ইসরাইল সামরিকভাবে অপরাজেয়তার একটি ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। তারা প্রচলিত যুদ্ধে বারবার আরব সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে। কিন্তু ঐতিহাসিক রেকর্ড আরো অনেক জটিল একটি গল্প বলে। ১৯৪৮ সালে তথাকথিত আরব জোট কোনো অর্থেই ঐক্যবদ্ধ বা সার্বভৌম ছিল না। আরব বিশ্বের বেশির ভাগ অংশ তখনো সরাসরি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসছিল।

যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিন শাসন করত, সেই একই সাম্রাজ্য ট্রান্সজর্দানের আরব লিজিয়ানকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্রসজ্জিত এবং কার্যকরভাবে পরিচালনা করছিল। এর কমান্ডার ছিলেন গ্লুব পাশা নামে এক ব্রিটিশ অফিসার। যুদ্ধ ক্ষেত্রের সবচেয়ে সক্ষম আরব সেনাবাহিনী কোনো স্বাধীন, ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল না। জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ সমগ্র ফিলিস্তিনকে রক্ষা করার চেয়ে পশ্চিমতীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষিত করার দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে মিসরের সামরিক কর্মকাণ্ড ছিল অত্যন্ত অকার্যকর। রাজা ফারুকের অধীনে মিসরীয় সেনাবাহিনী অপ্রস্তুত অবস্থায় যুদ্ধে প্রবেশ করে। তাদের নেতৃত্ব কাঠামো ছিল বিভ্রান্তিকর এবং সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ছিল বিরাট দুর্বলতা। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লেও তাদের সহায়তার আবেদন উপেক্ষিত হয়।

১৯৪৮ সালে কোনো সমন্বিত, সার্বভৌম, ঐক্যবদ্ধ আরব প্রচলিত যুদ্ধ যন্ত্র ছিল না। সেখানে ছিল খণ্ডিত রাষ্ট্র, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজতন্ত্র, ঔপনিবেশিক জটিলতা, প্রতিযোগিতা উচ্চাভিলাষ এবং অসম সামরিক সক্ষমতা। ইসরাইল কোনো সুসংহত প্যান আরব সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেনি। এর উদ্ভব ঘটেছিল এমন এক আরব বিশ্বে, সেটা তখনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি কাঠামোর ছায়ায়Ñ এবং প্রায়ই সরাসরি প্রভাবে আবদ্ধ ছিল। একই সাথে উন্নত সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন থেকে সুবিধা লাভ করেছিল।

১৯৬৭ সালে ইসরাইলের নির্ণায়ক সুবিধাটি এসেছিলÑ একটি পূর্বপরিকল্পিত বিমান হামলা থেকে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিসরের বিমানবাহিনীকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। একবার আকাশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলেÑ ফলাফল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধ এই ধারণাটিকে আরো জটিল করে তোলে। সেই বছরের অক্টোবরে মিসরীয় বাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে, বার-লেভ লাইন ভেদ করে এবং একটি আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে ইসরাইলি কমান্ডকে হতবাক করে দেয়। এতে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত অপরাজেয় ধারণাকে ভেঙে দেয়।

পরে বিপুলসংখ্যক মার্কিন বিমান সরবরাহের মাধ্যমে ইসরাইলের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হয় এবং তাতে তাদের অবস্থানকে স্থিতিশীল করে, যেটার মাধ্যমে ভারসাম্য আবারো বদলে যায়। তারপর থেকে ইসরাইলের প্রধান সঙ্ঘাতগুলো হয়েছে অরাষ্ট্রীয় শক্তির সাথে। লেবাননে তারা হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। গাজায় বিপুল মার্কিন সমর্থন এবং ব্যাপক গোলাবর্ষণ সত্ত্বেও, হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি।

এবার ভিন্ন পরিস্থিতি, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম ইসরাইল এবং আমেরিকা একটি যথাযথভাবে সংগঠিত সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে। ইরান ২০০৩ সালের ইরাক নয়। এটি ২০০১ সালের আফগানিস্তানও নয়। ইরানের রয়েছে ভৌগোলিক গভীরতা, জনসংখ্যারÑ গুরুত্ব, সুপ্রতিষ্ঠিত সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং এই অঞ্চলের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। তারা অভ্যন্তরীণ অস্ত্রশিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামোতে কয়েক দশক ধরে বিনিয়োগ করেছে। ইরান তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই এসব অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।

ইরান হলো গভীর উপনিবেশÑ বিরোধী সেন্টিমেন্টের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি বিপ্লবের ফসল। ইরানিরা একটি জাতীয়তাবাদী ও আদর্শিক এবং প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা জাতি। তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরা তৈরি করে এবং নিজের জোট নিজেই গঠন করে। ইরান শুধু ইসরাইলের বিরুদ্ধেই লড়াই করছে না। তারা এই অঞ্চলে ইসরাইলি আধিপত্যের পৃষ্ঠপোষক, সরবরাহকারী এবং নিশ্চয়তাদানকারী আমেরিকার সমগ্র ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করছে।

আত্মবিশ্বাসের শীর্ষে থাকা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের বানানো কল্পকাহিনীকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা মনে করে, শক্তি দিয়ে ইতিহাসকে নতুন করে সাজানো যায়। কিন্তু তাদের পতন হয় ক্ষমতার অভাবে নয়, বরং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও ঔদ্ধত্যের কারণে।

মার্কিন-শাসিত বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য বিভিন্ন কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে যখন পরিবর্তন হচ্ছিলÑ তখন এই অঞ্চল বা এর কিছু অংশ সময়ের সাথে স্থবির হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর গণতন্ত্রায়নের যে ঢেউ এসেছিল, মধ্যপ্রাচ্য তা থেকে মুক্ত ছিল। এই অঞ্চলের স্বৈরশাসক ও রাজা-বাদশাহরা তেলসম্পদ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের সুবাদে, বিশ্বের অন্যান্য অনেক অংশের মতো পদ্ধতিগত গণতন্ত্র প্রদানের জন্য কোনো চাপের মধ্যে ছিলেন না। একই কারণে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত না করেই অপারেশন ডেজার্টস্টর্ম শেষ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র তখন এই অঞ্চলকে আর অস্থিতিশীল করতে চায়নি। মিথ্যা অজুহাতে ইরাকি যুদ্ধের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা করে সেখানে মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। নাইন-ইলেভেনের পর ইসলামী শক্তির হুমকির মোকাবেলা করা নিয়ে বিতর্ক আমেরিকার নব্য রক্ষণশীলদের ইরাক আক্রমণের পক্ষে সুযোগ করে দেয়।

বর্তমান সঙ্ঘাত সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কিনা তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সেই পরাশক্তির সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যাকে এক সময় স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবেই দেখা হতো। প্রকৃতপক্ষে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপই অঞ্চলটিকে নতুন রূপ দেবে। মধ্যপ্রাচ্য কয়েক দশকের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে অস্থিতিশীল মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত বাড়তে থাকা মার্কিন ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ এই অঞ্চল এবং এর বাইরের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন রূপ দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি অংশ জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নজিরবিহীন সহিংসতা, ব্যবসায়-বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা সারা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এখনো পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সঙ্ঘাত বন্ধ হলেও এর রেশ ধরে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকবে। এ ধরনের সঙ্কট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় না; এগুলো কয়েক দশকের অমীমাংসিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভুল হিসাব এবং ক্ষমতার পরিবর্তনশীল গতিশীলতার ফল। বহু বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছিল, ইসরাইল মনে করে, ইরান তাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রধান হুমকি। তারা ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছিল। অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইসরাইল ইরানের সাথে আলোচনায় ছদ্মাবরণে আকস্মিকভাবে ইরানে কাপুরুষিতভাবে যৌথ হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে। এরপর ইরান শুধু ইসরাইল নয়, মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালাতে বাধ্য হয়। এর ফলে আঞ্চলিক শক্তি, বৈশ্বিক শক্তি এবং ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের মধ্যে দ্রুত ব্যাপক সঙ্ঘাত শুরু হয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং স্থল, আকাশ ও সাইবার জগতে বিস্তৃত সঙ্কটের চাপে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো চাপের মধ্যে পড়ে।

বর্তমান সঙ্কটের গুরুত্ব বোঝার জন্য এটিকে বৈশ্বিক রূপান্তরের শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সাম্রাজ্যগুলোকে ভেঙে দিয়েছিল এবং সম্মিলিত বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে লিগ অব নেশন্সের জন্ম দিয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। জাতিসঙ্ঘ এবং ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশনস প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার মাধ্যমে আমেরিকান নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনকে সুদৃঢ় করা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে যখন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলার স্বর্ণের বিনিময় যোগ্যতার অবসান ঘটান। ব্রেটন উডস মুদ্রাব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটান এবং ভাসমান বিনিময় হারের সূচনা করেন। এটি ছিল একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন। দুই বছর পর ১৯৭৩ সালের তেল নিষেধাজ্ঞা জ্বালানি বাজারকে ভূ-রাজনীতির সাথে এমনভাবে সংযুক্ত করে যার রেশ বর্তমানেও রয়ে গেছে। ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামী বিপ্লব আরেকটি বড় ধরনের বিচ্ছেদ ঘটায়Ñ যার মাধ্যমে মার্কিন তাবেদার শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশক ধরে মার্কিন ইরান বৈরিতার মঞ্চ তৈরি হয়ে যায়।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘একমেরু মুহূর্ত’-এ প্রবেশ করে বলে মনে হয়েছিল। কারণ তখন তারা স্নায়ুযুদ্ধের পর নজিরবিহীন সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু এই আধিপত্য ও পরীক্ষার মধ্যে পড়েছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন রূপ দেয়। বিশ্বব্যাপী নজরদারি প্রসারিত করে এবং অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধের সূচনা করে যা দেশ-বিদেশে আমেরিকার ভাবমর্যাদা বদলে দেয়।

গাজায় শুরু হয়ে মার্কিন-ইরান সরাসরি যুদ্ধে পরিণত হওয়া বর্তমান ২০২৩-২৬ সালের সঙ্ঘাতটি এখন বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুতর রূপান্তর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যেটি একটি স্থানীয় সঙ্ঘাত হিসেবে শুরু হয়েছিল, সেটি এখন বিমান হামলা, সাইবারযুদ্ধ, পরিবর্তনশীল জোট এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একটি বহুস্তরের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাস যদি কোনো শিক্ষা দেয়, তা হলোÑবৈশ্বিক ধাক্কাগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেয়। স্থির বিনিময় হারের অবসান, তেলের অস্ত্রায়ন, ইরানি বিপ্লব, নব্বইয়ের দশকের এক মেরু শাসন, নাইন-ইলেভেন-পরবর্তী যুগ, চীনের উত্থান, আর্থিক সঙ্কট, ক্রিমিয়া ব্রেক্সিট ও ট্রাম্প এবং মহামারীÑ এসবই বিশ্ব রাজনীতিতে কাঠামোগত ছাপ রেখে গেছে। ২০২৬ সালে যে চিত্রটি ফুটে উঠছে, তা হলোÑ একটি অধিকতর খণ্ডিত, নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বহু মেরু বিশ্বের দিকে ইঙ্গিত করছে যা ওভারলেপিং অস্ত্রসজ্জিত সরবরাহ শৃঙ্খল, সাইবার সঙ্ঘাত এবং বৈশ্বিক পরিণতি সম্পন্ন আঞ্চলিত যুদ্ধ দ্বারা সংঘটিত হবে।

উত্তেজনা বৃদ্ধি ও যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে শুধু আমেরিকা, ইসরাইল ও ইরান নয়Ñ গোটা বিশ্ব বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ব আরো বিভক্ত হয়ে পড়বে। এখন একমাত্র নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়Ñ বিশ্ব ব্যবস্থা আবারো পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং ১৯৭০ বা ১৯৯০-এর দশকের পালাবদলের মতোই এই মুহূর্তের পূর্ণ তাৎপর্য আমরা হয়তো আগামী দিনগুলোর পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরে উপলব্ধি করতে পারব।

লেখক : সহসভাপতি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)।