এস এম আবদুচ ছালাম আজাদ
জুলাই চব্বিশের ভূমিকম্প কিছু ঘরের উপরের ছাউনি আর আর বড় বড় গাছের ডাল-পালার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঘৃণিত ফ্যাসিবাদ, কুখ্যাত আধিপত্যবাদ আর আধুনিক জাহেলিয়াতের গোড়ার কোন ক্ষতি হয়নি। ভূমিকম্পের ধাক্কায় প্রথম দিকে কিছুটা বেসামাল হলেও তারা হারিয়ে যায়নি চিরতরে। তারা তাদের অবস্থানে ঠিকই আছে। অতি আত্মবিশ্বাসী ও অপরিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের ওভার কনফিডেন্স এবং বিপ্লবের মাধ্যমে পাওয়া বিজয়ের খুশিতে বিভোর জনগণের অসতর্কতার কারণে তারা তাদের আপন আপন জায়গায় রয়ে গেছে বহাল তবিয়তে। সময়ের প্রেক্ষিতে তারা এখন পুরনো কাসুন্দিকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়ে পুরাতন গান নতুন করে গাওয়া শুরু করেছে। গানের শিল্পি পরিবর্তন হলেও তাল আর সুরের পরিবর্তন হয়নি। এমন কি গানের স্কেলও একই রকম রয়েগেছে। বাউল, ভান্ডারী, রবিন্দ্র আর নজরুল সংগীতের মতো। এখন দেখা যাচ্ছে মজলুম জনতার আশা-আকাক্সক্ষার স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই রয়ে যাচ্ছে। জুলাই ভূমিকম্পের পর যে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবার কথা ছিল পরিকল্পিত ভাবে থামিয়ে দেবার জোর চেষ্টা প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে নয়া ফ্যাসিবাদের দোসরেরা। নির্মিত হচ্ছে না আর জনগণের স্বপ্নের শান্তির ইমারাত। উল্টো ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক বাটপারদের বাটপারী আর ভিনদেশী শকুনদের ঘৃণ্য নজরদারী।
চত্রিশ জুলাই চব্বিশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সুচনা হয়েছিল। চৌদ্দশত জীবন্ত মানুষের আত্মদান। ত্রিশ হাজারের অধিক মানুষের স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে যে বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল সেই রক্তাক্ত বিপ্লবের পর নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুছ এবং তাঁর উপদেষ্টাদের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছিল সেই সরকার মজলুম জনগণকে যে ওয়াদা দিয়েছিল সেই ওয়াদা তারা রক্ষা করেনি বা রক্ষা করতে পারেনি। জনগণ আশা করেছিল দেশের রাজনীতিতে গুণগত ও মানগত পরিবর্তন আসবে। আসলে ড. ইউনুছ সরকারের আটারো মাস নয় দিনের মেয়াদে রাজনীতিতে কোন গুণগত পরিবর্তন আসেনি। রাজনৈতিক নেতাদের মানসিকতায়, বক্তৃতায়, আচরণে, ব্যবহারে, শিষ্টতায় কোন পরিবর্তন আসেনি। প্রশাসনের সকল পর্যায়ের চেয়ারে ফ্যাসিবাদীদের রেখে যাওয়া ব্যক্তিবর্গের চেয়ার বদল হয়েছে মাত্র। তাদের চিন্তা চেতনার মধ্যে মানগত ও গুণগত কোন পরিবর্তন আসেনি। মাফিয়া নেত্রী পালিয়ে যাওয়ার প্রক্কালে তার চেলা-চামুন্ডদের যাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিল তারা সে অবস্থায় ও অবস্থানে বহাল তবিয়তে রয়েগেছে। একটি রক্তাক্ত বিপ্লব হয়েছে। ১৩৫ জন শিশু পুলিশের প্রাণঘাতি গুলীতে নিহত হয়েছে। সবচেয়ে যে ছোট্ট শিশুটি শাহাদাত বরণ করেছে তার বয়স মাত্র ৪ বছর। নাম আবদুল আহাদ। ঢাকা যাত্রাবাড়ির রায়ের বাগে নিজ বাসার বারান্দায় সে গুলীবিদ্ধ হয় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ২০ জুলাই আই সি ইউতে সে মারা যায়। এ ভাবে শাহাদাত বরণ করে রাজধানী ঢাকার মিরপুরের ১০ বছর বয়সী শিশু সাফফাত। ঢাকা উত্তরার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে নাঈমা সুলতানা। নারায়নগঞ্জে মারা যায় মাত্র ৬ বছর বয়সী রিয়া গোপ। এ ভাবে ১৩৫ জন শিশুসহ ১৪০০ মানুষ জীবন দিয়েছে এই বিপ্লবের সময়। এই রক্তাক্ত বিপ্লব ছিল একটি কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেখতে পাচ্ছি যে লাউ সেই কদুই রয়ে গেছে। বর্তমান ক্ষমতাসিন বিএনপির কাছে জনআকাক্সক্ষার কোন গুরুত্বই নেই। জনগণের সাথে করা হচ্ছে সরাসরি বাটপারী। ৭০% মানুষের দেওয়া হ্যাঁ ভোটকে সরাসরি অস্বীকার করা হচ্ছে। জুলাই শহীদদের রক্তের সাথে করা হচ্ছে গাদ্দারী। পরাশ্রিত বুদ্ধিজীবী, অন্যের পা-চাটা একশ্রেণীর সাংবাদিক-বিশ্লেষক আর সুবিদা ভোগী রাজনৈতিক নেতাকর্মী রক্তাক্ত ৩৬ জুলাই এর গণবিপ্লবকে নিয়ে করে যাচ্ছে হাসি টাট্টা। নিয়মিত রেখে যাচ্ছে হটকারিতা মূলক বক্তব্য। এক শ্রেণীর চেতনাবাদি নেতা কর্মীরা হটকারিতাকে প্রাসাঙ্গিক কাজ হিসেবে গ্রহণ করে নিত্য বাড়াবাড়ি করে চলছে। দেশের সর্বত্র তারা করে যাচ্ছে এ কাজ।
ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী এ বিশ্বাস প্রতিষ্টিত হয়েছে যে, বিএনপি ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছে। মানে তারা নির্বাচন কমিশন এবং ডিপস্টেটের যৌথ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নয় ছয় করে ক্ষমতায় এসেছে। তারা জনগণের স্বতস্ফূর্ত রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি। ভোটের রেজাল্ট পাল্টিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার রেখে যাওয়া লোকজন যারা প্রশাসনে রয়েছে তাদের কারসাজির মাধ্যমে এসেছে। এমনকি কোটি কোটি টাকার লেনদেনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। ড. ইউনুছ সরকারের আলোচিত উপদেষ্টা রিজোয়ানার স্বীকারোক্তিতে তা প্রমাণিত হয়েছে। যারা নেত্রীর বাসার সামনে থেকে একটি সামান্য বালুর ট্রাক সরাতে পারেনি তারা নয় ছয় করে ক্ষমতায় এসে সেই সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে যে সংবিধানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং তার দোসর ও তাবেদার শক্তি বিগত ১৬/১৭ বছর লরাগাতার বাংলাদেশের মানুষকে অসহায় করে রেখেছিল। চেপে ধরেছিল জনগণের কণ্ঠনালী। তারা সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে রক্তাক্ত জুলাই সনদকে ছেড়া কাগজের মতো উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। গণভোটকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের পর ভারতের শিলং থেকে বাংলাদেশে ফেরৎ এসেছেন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমদ। সালাউদ্দিন সাহেব দেশে ফিরেই রাজনীতি শুরু করেছেন। তিনি এখন নয় ছয় করে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এখন তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে দম্ভভরে উঁচু গলায় চিৎকার করে বলে যাচ্ছেন-অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো প্রক্রিয়া ছিল অবৈধ। প্রশ্নজাগে, তিনি যে শিলং থেকে ফিরলেন তাকি বৈধ? স্বাভাবিক ভাবে রাজনীতি করলেন তা কি বৈধ? নির্বাচন করলেন সেটা কি বৈধ? নয় ছয় করে ক্ষমতায় আসলেন সেটাকি বৈধ? তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন পরে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন সেসব কি বৈধ? সালাউদ্দিন সাহেবরা যে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে সে সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনা এখনও প্রধানমন্ত্রী। যদি সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয় তাহলে তারেক রহমানের স্থান কোথায়? সালাউদ্দিন সাহেবের জায়গা কোথায়? সালাউদ্দিন সাহেব যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ওজার মন্ত্রপাঠ করে যাচ্ছেন সে মন্ত্র অনুসারে তারেক রহমান, সালাউদ্দিন এবং তাদের সরকার সবইতো অবৈধ হয়ে যায়।
আইন বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জমান সাহেব তাচ্ছিল্লভরে বলেছেন-“গণভোট” লেপস হয়েগেছে। তিনি ড. ইউনুছ সরকারের অন্তর্বতীকালীন সরকারের এটর্নি জেনারেল ছিলেন। সেই সময়ে তিনি ফ্যাসিস্টদের পক্ষে কাজ করতেন বলে চাউর আছে। তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগও যে, তিনি চাননি ফ্যাসিস্ট লীগ নিষিদ্ধ হোক। তিনি ফ্যাসিবাদী, অত্যাচারী, জালিম হাসিনার দলের পক্ষে ছিলেন। তিনি যে গণভোট লেপস হয়েছে বলে তাচ্ছিল্ল করলেন সে গণভোটের অধ্যাদেশ এটর্নি জেনারেল হিসেবে তার মতামত ছাড়া হয়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিলেন জনাব আসিফ নজরুল। তিনি নিশ্চয় এটর্নি জেনারেলকে বাদ দিয়ে আইন বিষয়ক কোন প্রস্তাবনা গ্রহণ করেনি। সেই হিসেবে গণভোটের বিষয়ও আসাদুজ্জমান সাহেবের অগোচরে হয়নি। আজ তিনি সেই গণভোটকে লেপস হয়েগেছে বলে তাচ্ছিল্ল করছেন। এটা কি রাজনৈতিক বাটপারী নয়? আসলে আসাদুজ্জমাদের সৌভাগ্য যে, বিএনপি র মন্ত্রীর তালিকায় তার নামটি আছে। তিনি জুলাই বিপ্লবের প্রসব করা সরকারের আইন মন্ত্রী হয়ে ১৪০০ জুলাই শহীদ আর ৩০ হাজার পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধাদের কথা বেমালুম ভুলে গেলেনে! তাই তাচ্ছিলের হাসি হেসে বলছেন- গণভোট লেপস্ হয়েগেছে। “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশ ফুড় আন্ডার কনিস্টিটিউশান।” এসব কথা কি মিঃ সালাউদ্দিন এবং মিঃ আসাদুজ্জমান সাহেবদের মুখে মানায়? গণভোট লেপস মানে ৭০% জগণকে অসম্মান করা এবং গাদ্দারী করে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখানো। যদিও এমনটা হবার কথা ছিল না। যে লাউ সেই কদু থাকার কথা ছিল না। জুলাই ভূমিকম্পের পর নতুন চেতনার ভিত্তিতে একটি নতুন দেশ গড়ার কথা ছিল। একটি দুর্নিতীমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত আর খুন খারাবী মুক্ত শান্তিপূর্ণ সুন্দর আবাস ভূমির স্বপ্ন দেখেছিল জনগণ। কিন্তু সেই স্বপ্নময় বাংলাদেশ কেন গড়া হচ্ছেনা? এর প্রকৃত জবাব কি সেটা সময়ে বলবে। তবে মনে প্রশ্ন জাগে হাজারো মানুষের রক্ত মাড়িয়ে ক্ষমতায় বসা নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুছ সাহেব কি কারো পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলেন? খলিল সাহেব, রিজোয়ানা এবং আসিফ নজরুলদের প্রকৃত ভূমিকা কি ছিল? বিপ্লবের পর গড়া অন্তর্বর্তী সরকার কি বেঈমানী করেছে? নাকি ড. ইউনুছ একাই বেঈমানী করেছে? এর সঠিক জবাব পেতে আরো সময় লাগবে নিশ্চই।