আধুনিক বিশ্বে “জাতিরাষ্ট্র” ধারণাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত রূপ। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে, এ ধারণাকে অনেক বেশি জটিল করে তোলে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও বহু দেশ এমন এক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকে, যেখানে তাদের অর্থনৈতিক নীতি, উন্নয়ন কৌশল, এমনকি দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বহিরাগত প্রভাবের বাইরে থাকে না। ফলে প্রশ্ন জাগেÑজাতিরাষ্ট্র কি সত্যিই মুক্তির কাঠামো, নাকি এটি এমন এক সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা, যার ভেতরে থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়া সত্যিই কঠিন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকÑএই দুই প্রতিষ্ঠান বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই সহায়তা প্রায়ই শর্তসাপেক্ষ। কোনো দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ঋণ নিতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে নিতে হয়Ñযেমন ভর্তুকি কমানো, কর বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন, কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সংস্কার বা বেসরকারিকরণ।
শর্তগুলোকে অর্থনৈতিক “সংস্কার” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও এগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব গভীর। জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। অনেক দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে, জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ভিত্তি। যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন শুধু পরিবহন খরচই বাড়ে নাÑখাদ্য উৎপাদন, শিল্পকারখানা, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। এ প্রক্রিয়াকে অনেক বিশ্লেষক “অদৃশ্য ঔপনিবেশিকতা” হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন। কারণ এখানে আগের মতো কোনো বিদেশি সেনাবাহিনী নেই, নেই সরাসরি শাসনব্যবস্থা। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতির ওপর এমন প্রভাব রয়েছে, যা অনেক সময় দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতাকে সীমিত করে। ফলে একটি রাষ্ট্র কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তার নীতিনির্ধারণের পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বাস্তবতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ, আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত এবং বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে একটি সংবেদনশীল অবস্থানে রেখেছে। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে বা ঋণদাতা সংস্থাগুলো নীতি পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়, তখন সেই প্রভাব সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এসে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত এ বৃহত্তর কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সম্প্রতি ঘোষিত নতুন দরে ডিজেল লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং পেট্রল ১৯ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ধরনের খাতওয়ারী মূল্যবৃদ্ধি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শুধু তেল নয়; এক মাসেই দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানো হয়েছে ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। এবার প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। এর আগে এপ্রিলের শুরুতে বেড়েছিল ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। এতে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ২১২ টাকা। গত মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এপ্রিলের শুরুতে সেই দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে জাহাজভাড়া বাড়ায় দাম সমন্বয় করা হলো এবার। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। অভিযোগ আছে, প্রতি সিলিন্ডারে বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা।
তেল ও গ্যাসের মতো অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ দুটো উপকরণের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে আনবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর। খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের আয় না বাড়লেও ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। এতে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি খাতও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। সেচ, পরিবহন ও কৃষি উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। শেষ পর্যন্ত এসব কিছুর সম্মিলিত প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। মুদ্রাস্ফীতি যখন বাড়ে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে রাজনৈতিক বাস্তবতা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিতে বহিরাগত প্রভাব সবসময় সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও তা বিভিন্নভাবে কাজ করে। অর্থনৈতিক সহায়তা, উন্নয়ন প্রকল্প, কূটনৈতিক সম্পর্কÑএসবের মাধ্যমে নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রভাবিত হতে পারে। ফলে সরকারগুলো অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়, যা হয়তো স্বল্পমেয়াদে জনগণের জন্য কষ্টকর, কিন্তু আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে গ্রহণযোগ্য।
এখানেই জাতিরাষ্ট্র কাঠামোর একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আসে। একদিকে একটি রাষ্ট্র তার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাকে আন্তর্জাতিক শর্তও মানতে হয়। এ দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। অনেক সময় এ ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। তবে এই বাস্তবতাকে একমাত্রিকভাবে দেখাও ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেÑ এমন দাবিও সরলীকৃত। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে, অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এ সহায়তার শর্তগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় বা সামাজিক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা না হয়।
বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ জটিল কাঠামোর ভেতরে থেকে নিজের নীতিগত স্বাধীনতা যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করা। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী করা, জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎস তৈরি করাÑএসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন নীতিগত স্বচ্ছতা, যাতে জনগণ বুঝতে পারে কোন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব কী। বিশ্বব্যবস্থার একটি প্রচলিত ভাষ্য হলোÑউন্নয়নশীল দেশগুলোকে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে: এই সহায়তা কি সত্যিই দেশগুলোকে স্বাবলম্বী করে, নাকি তাদেরকে একটি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার চক্রে আবদ্ধ রাখে?
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সহায়তা এমনভাবে গঠিত হয় যাতে একটি দেশ সংকট থেকে সাময়িকভাবে বের হতে পারে, কিন্তু স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না। অর্থাৎ, বাঁচিয়ে রাখা হয়Ñকিন্তু পুরোপুরি দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা গড়ে তুলতে দেওয়া হয় না। এ বাস্তবতা বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা জরুরি। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ ও সহায়তা দেয়, কিন্তু সে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত থাকে নানান শর্ত। এ শর্তগুলো সাধারণত ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার নামে দেওয়া হলেও, এর ফলে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন বা কৌশলগত সক্ষমতা তৈরির জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। বিশেষ করে বড় মাপের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, ভর্তুকি বা কৌশলগত খাতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে এসব শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ফলে একটি দেশ এমন এক অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে সে নিয়মিতভাবে ঋণ নেয়, সংস্কার করে, আবার নতুন করে সংকটে পড়েÑএবং আবার ঋণের দিকে ফিরে যায়। এ চক্র ভাঙা সহজ নয়, কারণ অর্থনীতির কাঠামো ধীরে ধীরে এমনভাবে গড়ে ওঠে, যা বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ বৃহত্তর কাঠামোর ভেতরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। দেশে কার্যত একটি প্রধান শোধনাগারÑ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডÑযা পাকিস্তান আমলে ১৯৬০-এর দশকে স্থাপিত। এই শোধনাগারের সক্ষমতা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অনেক কম, ফলে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়।
প্রশ্ন হলো, এত দীর্ঘ সময়ে কেন নতুন বড় রিফাইনারি গড়ে ওঠেনি? এটি কেবল প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে নীতি, বিনিয়োগ অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রভাব। বড় আকারের রিফাইনারি স্থাপন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ, নীতিগত স্থিরতা এবং কখনো কখনো স্বল্পমেয়াদি আর্থিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতাÑযা সবসময় সহজ হয় না, বিশেষ করে যখন অর্থনীতি ঋণ ও শর্তাধীন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকে।
এ সীমাবদ্ধতার বাস্তব প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈশ্বিক সংকটের সময়ে। সাম্প্রতিক ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য আগ্রাসন ও এর প্রতিক্রিয়ায় শুরু হওয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, সরবরাহ অনিশ্চয়তাÑসব মিলিয়ে একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে যেসব দেশের নিজস্ব শোধনাগার ও মজুদ সক্ষমতা বেশি, তারা তুলনামূলকভাবে চাপ সামাল দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশ, যার পরিশোধন ও সংরক্ষণ ক্ষমতা সীমিত, তারা দ্রুত মজুদ বাড়ানোর সুযোগ পায় না।
ফলে যা ঘটে তা হলোÑবাজারে দামের চাপ সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে এসে পড়ে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কৃষি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, শিল্পখাতে ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে সব পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এ প্রক্রিয়াই মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়ায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑএ সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নীতির ফল নয়, আবার সম্পূর্ণভাবে বাইরের চাপের ফলও নয়। বরং এটি একটি সম্মিলিত বাস্তবতা, যেখানে বৈশ্বিক কাঠামো, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করে।
বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তের প্রয়োজন হলো এই দ্বৈত বাস্তবতার ভেতরে পথ খুঁজে বের করা। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে, অন্যদিকে নিজের কৌশলগত সক্ষমতাÑবিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তাÑশক্তিশালী করতে হবে। নতুন রিফাইনারি স্থাপন, মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবে এসব পরিকল্পনা নিছক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। আজকের বিশ্বে নিয়ন্ত্রণ সবসময় দৃশ্যমান নয়। অনেক সময় তা কাজ করে কাঠামোর ভেতরে, নীতির মাধ্যমে, নির্ভরতার সম্পর্কের মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোÑকীভাবে তারা এ কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত নীতিগত স্বাধীনতা এবং কৌশলগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। এই বাস্তবতা বোঝা এবং এর ভেতরেই ন্যায়সঙ্গত ও জনগণমুখী নীতি খুঁজে বের করাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।