শেখ এনামুল হক
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ, সুন্দরবন ভ্রমণে ভ্রমণ পিয়াসীদের ঝোঁক বাড়ছে। প্রতিবছর লাখ লাখ ভ্রমণ বিলাসী পর্যটক ছুটছে সুন্দরবনে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ হেলায় হারাতে চান না। গত কয়েক বছরে সুন্দরবনের পর্যটকদের টানতে দুই ডজনের বেশি বিলাসবহুল নৌযান যুক্ত হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব নৌযানের কোনো কোনোটিতে সুইমিং পুলসহ তিন তারকা মানের সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য কয়েক কোটি টাকা লগ্নী করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের ছয় হাজার সতেরো বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পুরোটাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এ ৫৩ শতাংশ এলাকাকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে সম্পদ আহরণ ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সুন্দরবনের ভেতরে বন বিভাগের বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়েছে চারটি।
গত দুই দশক ধরে সুন্দরবন পর্যটক প্রবেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এ সময় পর্যটক বেড়েছে প্রায় চারগুণ। ২০০১-০২ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন ৫৯,১৬৯ জন পর্যটক। ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৩ জন এবং পরের বছর বন ভ্রমণে আসেন ২ লাখ ১১ হাজার সাতান্ন জন। গত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৯৯ জন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে গেছেন। এভাবে প্রতিবছর সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েই চলছে।
এদিকে রমরমা ব্যবসার আড়ালে ঢাকা পড়ছে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়। সুন্দরবন উপকূলে চলাচল নিষিদ্ধ নৌযানে মেটানো হচ্ছে পর্যটকদের ভ্রমন তৃষ্ণা। ট্রলার জালি বোটে বনের গহীনে চলে যাচ্ছেন পর্যটকরা। বনের ভেতরে কোনো পর্যটক অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই।
সুন্দরবন ভ্রমণ দুইভাবে করা হয়। প্রথমটা হলো একদিনের মধ্যে প্রান্তসীমায় থাকা পর্যটন কেন্দ্র ঘুরে দেখা। অন্যটি বনের গহীনে ঘুরে বেড়াতে পর্যটকবাহী নৌযানে তিন দিনের সফর। একদিনের জন্য সাধারণত ছোট ট্রলার ও জালিবোট ব্যবহার করা হয়।
সুন্দরবনের পর্যটকদের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর সালমা বেগম। তিনি বনের প্রান্ত সীমায় থাকা পর্যটন কেন্দ্রে দৈনিক ৪ হাজার ২১৬ জন পর্যটক থাকলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না বলে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্য আমলে নেয়া হয়নি। তিনি তার প্রতিবেদনে বলেন, যেসব ট্রলার বা জাহাজে করে পর্যটকরা সুন্দরবন ভ্রমণ করে সেগুলোর শব্দে বন্যপ্রাণী প্রজননে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া ওই শব্দের কারণে যেসব প্রাণী বাদুড় ডলফিন শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে চলাফেরা করে তাদের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। এতে তারা ওই এলাকা থেকে চলে যেতে পারে।
ড. সালমা বেগম বলেন সুন্দরবনের একটি জটিল ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র বিদ্যমান। পরিবেশের কোনো উপাদানের সামান্যতম তারতম্য হলে ওই প্রক্রিয়ার বিরূপ প্রভাব পড়ে। বর্তমানে সুন্দরবনের যে পর্যটন ব্যবস্থা চলছে তা কোনোভাবেই পরিবেশ সম্মত নয়।
সুন্দরবনের প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন খুবির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী। তিনি বলেন ইকো ট্যুরিজম এর যা করা হয় তা শেষ অবধি পরিবেশ সম্মত থাকে না। বেশিরভাগ পর্যটক এমন সংবেদনশীল জায়গায় কি ধরনের আচরণ করা উচিত তা জানেন না। এটি বনের জন্য ক্ষতিকর । তিনি আরো বলেন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে উন্মুক্ত পর্যটনের সুযোগ কম রাখা দরকার। মানুষ যে পারফিউম কসমেটিক ব্যবহার করে এর ঘ্রাণ প্রাণীরা অপছন্দ করে। এতে তাদের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান বনে মোট পর্যটকের প্রায় ৮০ শতাংশ একদিনের জন্য করমজল, হারবারিয়া, কলাগাছিয়া সহ জনপদের কাছের পর্যটন কেন্দ্রে যান। নতুন পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের পর করমজলসহ অন্যান্য কেন্দ্রের উপর চাপ বেড়েছে। তবে অভয়ারণ্যের মধ্যে থাকা কটকা, কচিখালি, নীলকমল, হিরণ পয়েন্টে আগের চেয়ে চাপ বেড়েছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, নৌযানে যারা বনের ভেতর যান তাদের প্রথম পছন্দ থাকে কটকা বা জামতলা বীচ। দ্বিতীয় পছন্দের নীলকমল অভয়ারণ্য। পর্যটক ধরে রাখতে ট্যুর অপারেটররা এসব স্থানে যাবেন। পাঁচ বছর আগে ৩৫ থেকে ৪০টি নৌযানে পর্যটকরা অভয়ারণ্য এলাকায় যেত। এখন ৬৮টি লঞ্চের প্রতিটি সপ্তাহের দুদিন এলাকায় যায়। ট্যুর গাইডরা জানান কটকা, কচিখালী ও নীলকমলে একসময় প্রচুর হরিণ দেখা যেত। সেখানে মিলতো বাঘের উপস্থিতিও। অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে বনের ওইসব এলাকায় আগের মত হরিণ দেখা যায় না।
বনের প্রকৃতি ভিত্তিক পর্যটন নিয়ে কাজ করা খুবি ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন এর অধ্যাপক মো. ওয়াসি উল ইসলাম বলেন ইচ্ছা হলে অভয়ারণ্যে যাবার সুযোগ বন্ধ করা দরকার। নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারলে পর্যটকের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে বেশিরভাগ সময় একটি নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দেব বলেন, সুন্দরবনের ২০ বছর মেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। এর ফলে পর্যটকবাহী বিশেষায়িত নৌযান ছাড়া বনের মধ্যে অন্যরা প্রবেশ করতে পারবে না। পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তখন অভয়ারণ্যের উপর চাপ আরো কমবে।
সুন্দরবন ভ্রমণে একমাত্র বাহন নৌযান: চলতি মৌসুমে ১৩৩ টি নৌযান সুন্দরবনের পর্যটক পরিবহনের অনুমতি নিয়েছে। এর মধ্যে ৬৮টি লঞ্চ ৬২টি ট্রলার ও দুটি স্পিডবোট। প্রতিটি লঞ্চের সাথে একটি ট্রলার থাকে। তাদেরও নিবন্ধন নিতে হয়। অনুমোদন নেয়া ৬২টি ট্রলার লঞ্চের সাথেই বাধা থাকে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সুন্দরবনে চলা নৌযানগুলো প্রথমে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর থেকে সার্ভে সনদ নেয়। এরপর বনে ঢোকার একমাত্র অনুমতি দেয় বন বিভাগ। বিভিন্ন নদীতে চলাফেরার জন্য বি আই ডব্লিউ টি এ এবং পশুর চ্যানেলের জন্য মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। বনে প্রবেশের অনুমতি প্রয়োজন হলেও বেশিরভাগ নৌযান চলাচলের অনুমতি নেয় না।
জানা গেছে সুন্দরবনের পশুর, শিবসাহ বড় নদীতে ছোট নৌযান চলাচলের অনুমতি নেই। তাছাড়া বিআইডব্লিউটি এর অনুমতি ছাড়াই নৌপথে চলাচল করে। শীতকালে সাগর শান্ত থাকায় অনুমতি ছাড়াই পশুর, শিবসা চ্যানেলসহ বিভিন্ন পথে পর্যটক বহন করে অসংখ্য ট্রলার ও জালট।
এদিকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আওয়ামী লীগ আমলে কয়লাভিত্তিক পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সারা বিশ্বের বিশেষত উন্নয়নশীল দেশসমূহ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হ্রাস পেলেও আওয়ামীলীগ শাসনামালে ২০৪১ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০ ভাগে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত কতটা আত্মঘাতী ছিল তা না বললেও চলে। মজার ব্যাপার হল আওয়ামীলীগ স্বৈরশাসনের পতন হলেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত এখনো বাতিল করা হয়নি। ওই সময় ২০৪১ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ৫০ শতাংশে উত্তীর্ণ করার কথা বললেও তদানিন্তন বিদ্যুৎমন্ত্রী কখনোই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেননি। অথচ এটাই এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৮ শতাংশ নেমে আসবে এবং ২০৫০ সালে তার শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের উচিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বিপুল রাজস্ব আয় হলেও সেবা কম নির্ধারিত অর্থ জমা দিয়েও নৌযান ও পর্যটকরা বনে প্রবেশের অনুমতি পায়। বিভিন্ন খাতে বন বিভাগ এই টাকা আয় করে। ৭৫ দেশি পর্যটক বহনের জন্য একটি নৌযানকে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকার রাজস্ব দিতে হয়। বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে তা কয়েক গুণ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পর্যটন খাত থেকে বনবিভাগ দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা পরের অর্থ বছরে ৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ মাসে আগস্ট থেকে নভেম্বরে এক কোটি ৪৮ লাখ টাকার রাজস্ব আয় করেছে। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হলেও পর্যটকদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বনবিভাগ অনেকটা উদাসীন। পর্যটকবাহী নৌযানে ওঠার জন্য খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ঘাট গুলিতে মানসম্মত পল্টুনের ব্যবস্থা নেই।
জুই ট্যুরিজমের পরিচালক আখতার হোসেন রনি বলেন ১৫ বছর আগে হাতুড়ি পেরেক নিয়ে কটকা যেতাম। পাটাতন খুলে গেলে নিজেরাই ঠিক করতাম। ওই সময়ে পর্যটনখাত কত বদলে গেছে তবে কটকা অফিস আগের মতই রয়ে গেছে, সেখানে ন্যূনতম সেবা মেলে না।
সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, বনের মধ্যে বেশ কিছু প্লাটুন ও জেঠি নির্মাণের কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে ভোগান্তি থাকবে না বলে আশা করি।
সুন্দরবনের চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ পরিবেশবিদদের বক্তব্য: একটি শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে যে কমিটি ৩ মাস পর পর বৈঠকে বসবেন এবং তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। এ ব্যাপারে কোনোরকম শিথিল্য বা বিচ্যুতি প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।