দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কেবলমাত্র তার সামরিক সক্ষমতা নয়; বরং একই সময়ে বিশ্বের একাধিক অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতাও বিবেচিত হতো। এ সক্ষমতার ভিত্তিতেই ওয়াশিংটন সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ঘিরে যে তথ্য সামনে আসছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিও কি তার সামরিক সক্ষমতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে?
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অস্ত্র পুনরায় উৎপাদনের গতি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের তুলনায় অনেক ধীর। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রতিরোধক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ জেতা শুধুমাত্র প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে শিল্প উৎপাদনের ওপরও। একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বা থাড ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে যে প্রযুক্তি, যে পরিমাণ সময়, কাঁচামাল এবং দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়, তা রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা গেলেও সেগুলোর পরিবর্তে সমসংখ্যক নতুন অস্ত্র উৎপাদন করা যায় না। ফলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অস্ত্রভান্ডারই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
ইউক্রেন যুদ্ধ এ বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখন ইরান সংঘাত সে একই প্রশ্নকে আরও বড় পরিসরে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। একই সময়ে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারেও তাদের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অর্থাৎ একই মার্কিন অস্ত্রভান্ডার থেকে একাধিক ফ্রন্টে সরবরাহ বজায় রাখতে হচ্ছে। এ বাস্তবতার কৌশলগত প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে চীনকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত কিংবা দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেই এসব অস্ত্রের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতের আরও গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতে ওয়াশিংটনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
উত্তর কোরিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। পিয়ংইয়ংয়ের কাছে বিপুল সংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিও দ্রুত এগোচ্ছে। কোরিয়া উপদ্বীপে যুদ্ধ শুরু হলে শুধু উত্তর কোরিয়ার সামরিক স্থাপনাতেই হামলা চালানো নয়, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করতেও বিপুল সংখ্যক প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হবে। তাই ইরানের বিরুদ্ধে আজ যে অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো ভবিষ্যতের আরও বড় সংঘাতের জন্য সংরক্ষিত রাখতে পারলে ভালো হতো এবং তেমনটাই কথা ছিল। এখানে অর্থনৈতিক দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার। থাড ও প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বাড়বে প্রতিরক্ষা ব্যয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই উচ্চ বাজেট ঘাটতি, বিপুল জাতীয় ঋণ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতার মুখোমুখি।
এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করাও সহজ হবে না। ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তৈরি হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছিল। ইতিহাসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি সামরিক সংঘাত ছিল না; এটি ছিল একটি পরাশক্তির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ক্লান্তির প্রতীক। বিপুল সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি এবং অসংখ্য অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, যার রাজনৈতিক মূল্য, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং সামাজিক প্রভাব সামরিক অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেই ক্ষতি সামাল দেয়া শেষ পর্যন্ত আর সম্ভব হয়নি।
ইরানের ক্ষেত্রেও অনেকে সে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে। কারণ ইরান কখনোই প্রচলিত অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক সমতা অর্জনের চেষ্টা করেনি। বরং ইরান বরাবরই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, প্রক্সি বাহিনী, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশলকে গুরুত্ব দিয়েছে। কেননা, ইরান কেবল যুদ্ধ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত পরাজিত করতে চায়নি। বরং যুদ্ধকে লম্বা সময় টেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের চুড়ান্ত লক্ষ্য হলো সামরিকভাবে ধ্বংসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যকে দুর্বল করে দেওয়া। আফগানিস্তানে দু’দশকের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক বিজয় এনে দিতে পারেনি। ইরাক যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটি যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, সম্মানজনকভাবে তা শেষ করা ততটাই কঠিন। যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমাগত বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অস্ত্র ব্যয় করতে হয়, তাহলে সামরিক বিজয় অর্জনের পরও এটি একটি কৌশলগত পরাজয়ে রূপ নিতে পারে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আধুনিক যুগে প্রতিটি যুদ্ধের ফলাফল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে।
তবে এও সত্য যে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাত গুটিয়ে বসে নেই। নতুন করে প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন কার্যকর করা হয়েছে, উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও দ্রুতগতিতে কাজ করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায় না। একটি নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগে, দক্ষ জনবল তৈরি করতে সময় লাগে, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতেও সময় লাগে। ফলে আজ যে অস্ত্রের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা আগামী কয়েক মাসে দূর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
ইরানও মার্কিনীদের এ বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। আর এ কারণেই তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড়ো সংকট হলো নৈতিকভাবে দেশটির দুর্বল অবস্থান। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ আবারও একটি পুরোনো প্রশ্নকে সামনে এনেছে। আর তাহলো, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে ওয়াশিংটনের অবস্থান কি সব দেশের ক্ষেত্রে একই রকম হচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের কথা বলে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মিত্র রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তারা এক ধরনের নীতি এবং প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে আরেক ধরনের নীতি অনুসরণ করে। জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান, ড্রোন হামলা কিংবা একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ কোনো রাষ্ট্র একই ধরনের পদক্ষেপ নিলে ওয়াশিংটন তাকে থামানোর চেষ্টা করে এবং সেজন্য অহরহই আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক শৃঙ্খলার অজুহাত দেখায়। এ দ্বৈত মানদণ্ড শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোকেই নয়, বিশ্বের বহু নিরপেক্ষ দেশকেও যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা একটি বড় শক্তি। কিন্তু নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে সে বিশ্বাসযোগ্যতা দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে।
প্রকৃত সত্য হলো, প্রতিটি যুদ্ধের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে। সমালোচকদের একটি বড় অংশের দাবি, ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনার ক্ষেত্রেও কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের অর্থনৈতিক স্বার্থও এর নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অঞ্চল। এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক তেলের বাজার, জ্বালানির মূল্য এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাছাড়া প্রতিটি বড় যুদ্ধ উন্নত অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক প্রযুক্তির চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে যুদ্ধ শুরু হলেই প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। এ ছাড়া ইসরাইলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সমালোচকদের মতে, ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখার টার্গেট থেকেই ওয়াশিংটন বেশিরভাগ সময় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এসব পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা ও মিত্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তবু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যা শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমনভাবে পরস্পরসংযুক্ত যে, একটি সংঘাত দ্রুত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় ইসরাইল, ইরান, ইরাক, লেবানন এবং ইয়েমেন, কোনো না কোনোভাবে এই সংঘাতের অংশে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের জোরালো অবস্থান চলমান সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নিরাপত্তা ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এরই মধ্যে ইরান আশপাশের দেশ বিশেষ করে কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে টার্গেট করে হামলা করেছে। এ ঘাঁটিগুলোর বেশ ক্ষতিও হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামো টার্গেট করে হামলা শুরু করেছে। ইরান যদি এর প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর স্থাপনায় হামলা চালায় তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অনেকদিন আগে থেকেই বিস্তৃত। উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরাক, সিরিয়া এবং আশপাশের বিভিন্ন দেশে তাদের ঘাঁটি, নৌবহর ও সামরিক স্থাপনা রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব ঘাঁটির অনেকগুলোই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, যাদের অনেককে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ইরান-সমর্থিত বলে বর্ণনা করেন, তারা মার্কিন উপস্থিতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইরানের সঙ্গে নয়, বরং একাধিক ফ্রন্টে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এ বহুমাত্রিক সংঘাত কতদিন এবং কীভাবে পরিচালনা করবে ওয়াশিংটন? নতুন ফ্রন্ট খোলা মানেই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, আরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিপুল অস্ত্র ব্যয় এবং বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবেও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই দশক সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখলেও শেষ পর্যন্ত কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ফল অর্জন করতে পারেনি। ইরাকেও দীর্ঘ যুদ্ধ ও সামরিক উপস্থিতি বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। সে কারণেই আজ প্রশ্ন উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের মুখে পড়ে, তাহলে ওয়াশিংটনের সামনে কি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলো গুটিয়ে নেয়া ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই হয়তো পাওয়া যাবে না। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এই প্রশ্ন বারবার সামনে আসতেই থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে কে কত বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল, ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক কৌশলকে কতটা প্রভাবিত করবে। যদি একটি আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ওয়াশিংটনের অস্ত্রভান্ডার, প্রতিরক্ষা শিল্প, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট হিসেবেই সীমিত থাকবে না; বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বহু পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অঙ্গীকার, অতিরিক্ত ব্যয় এবং কৌশলগত ক্লান্তির কারণে দুর্বল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আজও সে ঐতিহাসিক শিক্ষা বিদ্যমান। তাই ইরান সংঘাত শেষ পর্যন্ত কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ধারণ করবে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফল নয়; বরং এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক জাতীয় শক্তিকে কতটা ক্ষয় করে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড়ো বিবেচ্য বিষয়।