আসিফ আরসালান

বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে চলতি সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। আজ ১৩ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ সরকার প্রায় ৭ মাস সময় পার করলো। বর্তমানে অর্থনীতির অবস্থা কী? আজ আমরা সরকারি কিছু পরিসংখ্যানসহ অর্থনীতির অবস্থা আলোচনা করবো। তার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার। প্রথমত, এ সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনীতিতে পরিণত করার সংকল্প ঘোষণা করেছে। এটি কতদূর সম্ভব বা সম্ভব নয়, সেটি পরে বলছি। তার আগে জানা দরকার যে বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির আকার ৪৫৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। উল্লেখ্য, ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমান ১ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের জনসংখ্যা সর্বশেষ আদম শুমারি মোতাবেক ১৭ কোটি ৫৬ লক্ষ। আমাদের চলতি বাজেটের আকার ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব ঘাটতি ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। যে কোনো অর্থনীতিবিদ একবাক্যে বলবেন যে, ঘাটতির পরিমান বা অংক অনেক বিশাল। এত বিশাল ঘাটতি পূরণ করা সহজ কথা নয়।

তার চেয়েও যেটি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয় সেটি হলো যেখানে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা সেখানে খেলাপী ঋণের পরিমান ৬লক্ষ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপী ‘ঋণ মোট রাজস্ব আদায় টার্গেটের ৮৭ শতাংশ। গত ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার জাতীয় সংসদে আলোচনা প্রসঙ্গে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন যে, পৃথিবীর কোনো দেশে এত বিপুল পরিমান খেলাপী ঋণ নেই। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যের তুলনায় ৮৭ শতাংশ খেলাপী ঋনের নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ছিলো ১ লক্ষ ৩১ হাজার ৬২০ টাকা । ২০২৪ সালের জুন মাসে খেলাপী ঋণের পরিমান দাঁড়ায় ২ লক্ষ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এই অংকটি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তার পরেই আমরা দেখতে পাই, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপী ঋণ বেড়ে হয় ২ লক্ষ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। আর বর্তমানে ১ বছর পর এই সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৬ লক্ষ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত ১ বছরে খেলাপী ঋণ বেড়েছে ৩ লক্ষ ২১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা।

প্রিয় পাঠক, আপনারা চিন্তা করুন, যদি এ বিশাল অংকের খেলাপী ঋণ না থাকতো তাহলে আমাদের বাজেট হয়তো ডেফিসিট বাজেট বা ঘাটতি বাজেট হতো না। আর হলেও কিঞ্চিত পরিমাণ। এখন বাজেটের ঘাটতি অংশ পুরণের জন্য সরকারকে গলদঘর্ম হতে হবে। আর এ ঘাটতি পূরণের জন্যই সরকারকে ব্যাংক থেকে নিতে হচ্ছে বিপুল পরিমান ঋণ। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে ব্যাংক ঋণ দিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরন হচ্ছে। না। তখন দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের একমাত্র অবলম্বন সঞ্চয়পত্রের ওপরে হাত দিতে হয়। ৫/৬ বছর আগেও ৫ বছর মেয়াদী পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ছিলো ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ। এখন সেটি নামতে নামতে ১০ শতাংশে এসেছে। গুজবে প্রকাশ, এটি নাকি সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার চিন্তা ভাবনা চলছে।

সঞ্চয়পত্র সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদী হয়। কিন্তু স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট বা এফঅডিআরে সুদের হার তুলনামূলক ভাবে কম হয়। দু’এক বছর আগেও স্বল্প মেয়াদী এফঅডিআরে সুদের হার ছিলো সাড়ে ১০ শতাংশ। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সেটি নেমে এসেছে সাড়ে ৮ শতাংশে। অর্থাৎ সুদের হার হ্রাস হলো ২ শতাংশ। সঞ্চয়পত্র বা স্বল্প মেয়াদী এফডিআর করেন সাধারণত ছোটো ছোটো চাকরিজীবী, ছোটো ছোটো দোকানদার ও ব্যবসায়ী, অবসর প্রাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী প্রমুখ। এরা সরাসরি ব্যবসায় নামতেও পারেন না অথবা ব্যবসা ভালো করে বোঝেনও না। তাছাড়া তাদের যে ক্ষুদ্র সঞ্চয় সেটুকু ব্যবসার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে খাটিয়ে নিজের পুঁজি পাট্টা হারিয়ে আম ছালা দুটোই হারানোর রিস্কে যেতে পারেন না। তাই বলা হয় যে, সরকার যখন স্বল্প মেয়াদী এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের ওপর হাত দেয় তখন মধ্যবিত্ত ও গরীবদের পেটে লাথি মারা হয়।

এ সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো বিদ্যুৎ খাতে। আর দ্বিতীয় ব্যর্থতা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। বিদ্যুৎ খাতের সংকট এতো গভীর যে এব্যাপারে গত সপ্তাহে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও কথা বলতে হয়েছে। গ্যাস সংকটে প্রতিটি ঘরের গৃহিনীরা ত্যক্ত বিরক্ত। এ ঢাকা মহানগরীতেই লক্ষ লক্ষ বাড়িতে রন্ধনের জন্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সারা দিনে গ্যাস তুষের আগুনের মতো আসে। রাতে আপনার চুলায় কিছুটা ফ্লেম দেখা যায়। এ টুকু ফ্লেমের আশাতেই গৃহিনীরা সারা দিন অপেক্ষা করেন। এখন অধিকাংশ ফ্যামিলি এক সাথে ৩/৪ দিনের রান্না করে রাখেন। প্রথম দিনের রান্নার পর অবশিষ্ট দু তিন দিনের রান্না রেফ্রিজারেটরে রেখে দেন এবং দু তিন দিন গরম করে খান। সেখানেও দেখা যায় গরম করার আগে লোডশেডিং।

সুশীলদের কথা বাদ দিন। আমি ক্ষুদ্র দোকানদার বা বাংলাদেশের টেসলা বলে খ্যাত ব্যাটারি রিকশাওয়ালাদেরও প্রশ্ন করতে শুনেছি যে, ড. ইউনূস তো শেখ হাসিনার হাতে ধ্বংস প্রাপ্ত এক অর্থনীতির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। তিনি ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিলেন। অথচ ঐ ১৮ মাসে তো ঢাকা মহানগরীতে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তাহলে এখন কেনো হচ্ছে? হাসিনার কয়েকজন অলিগার্ককে কুইক রেন্টাল দেওয়া হয়েছিলো।

ড. ইউনূস তো কুইক রেন্টাল বন্ধ করেছিলেন। এর ফলে অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রাপ্তি বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের আদানী বকেয়া পাওনা না দিলে বাংলাদেশে পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করার হুমকি দেন। ইউনূস সরকার বিদেশে থেকে ধার দেনা করে আদানী এবং অন্যান্য ভারতীয়দের পাওনার অংশ বিশেষ নিম্নোক্ত ভাবে পরিশোধ করেন। আদানীকে পরিশোধ করা হয় ৮০০ মিলিয়ন ডলার, ভারতীয় পিটিসিকে ৮০ মিলিয়ন ডলার এবং ভারতীয় সেইল এনার্জিকে ১৯০ মিলিয়ন- মোট ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়।

আমি পত্র পত্রিকা এবং ইন্টারনেট প্রচুর ঘাটাঘাটি করলাম। কোথাও দেখলাম না যে তারেক রহমানের সরকার বিগত ৭ মাসে আদানীকে বা অন্য কোনো ভারতীয় কোম্পানীকে কোনো পেমেন্ট করেছে। অথচ ড. ইউনূস একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়ে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছেন। মূল কথা সেটা নয়। জনগণ বিদ্যুৎ চায়। গ্যাস চায়। সার চায়। কিভাবে সরকার জোগাড় করবে সেটি সরকারের মাথা ব্যাথা। জনগণের প্রশ্ন, একটি বিপ্লব বিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে ইউনূস সরকার যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার দিতে পারে তাহলে নির্বাচিত সরকার দিতে পারবে না কেনো?

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এক কথায় বলা যায়, অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো নয়। ৩/৪ বছর আগেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ ছিলো। এখন সেটি সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে কেনো? এমন অবস্থার মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন? অন্যদের কথা বাদই দিলাম। কিন্তু ড. রাশেদ মাহমুদ তিতুমীর একজন নামকরা অর্থনীতিবিদ। তিনি কি বিশ্বাস করেন যে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ দূরের কথা, লাগাতার ৮ শতাংশ করলেও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি কায়েম করা যাবে না?

ড. ইউনূসের সময় মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশনের হার ছিলো ৮ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এখন সেটি ১০ শতাংশ বলে দল নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদরা দাবি করছেন। আমাদের কথা হলো, মূল্যস্ফীতি বলুন আর মুদ্রাস্ফীতি বলুন, মানুষ শতাংশের হিসাব চায় না। মানুষ চায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে যে আগুন জ্বলছে সে আগুন নিয়ন্ত্রণ করুন। এ তো ১০ দিন আগেও এক পাউন্ড পাউরুটির দাম ছিলো ৫০ টাকা। হঠাৎ করে সেটি করা হয়েছে ৬০ টাকা। এটি মাত্র একটি পন্যের উদাহরন দিলাম। নিত্য ব্যবহার্য্য প্রায় প্রতিটি পন্যের দাম প্রতি সপ্তাহে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

সরকার বেতন বাড়িয়েছে। সে বৃদ্ধি বাস্তবায়িত হবে ৪ পর্যায়ে। কিন্তু তার সুবিধাভোগী মাত্র ২৪ লাখ। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ২৪ লাখ। তো অবশিষ্ট সাড়ে ১৭ কোটির অবস্থা কি হবে? পাবলিক সেক্টরে বেতন বাড়লে তো Correspondingly প্রাইভেট সেক্টরে বাড়ে না। তারা তো দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জর্জরিত। অর্থনীতির পরিভাষায় ক্যাপিটাল ফর্মেশন অথনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ক্যাপিটাল ফর্মেশনে কোনো প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর নয় যে এখানে প্রবৃদ্ধি হবে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড। এখানে দেশী এবং বিদেশী বিনিয়োগ যুগপৎ বড় অংকে ঘটতে হবে। চীনারা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমারা দেয়নি। বিদেশী বিনিয়োগকে বলা হয় এফডিআই অর্থাৎ ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট। সেই এফডিআইয়ের কমিটমেন্ট আশাব্যাঞ্জক নয়।

অর্থনীতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো ফরেন রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণ। আরেকটি হলো, গার্মেন্টস রফতানি বাবদ আয়। কিন্তু এ দুই ক্ষেত্রে সরকার কতটুকু ক্রেডিট নিতে পারে? এটিকে তো অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় Private sector led growth. শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় এ দুটি খাতই প্রতিষ্ঠিত এবং দিনকে দিন সমৃদ্ধ হয়। সেই ধারা আজও চলছে। এ দুটি খাত ছাড়া আশাবাদী হওয়ার লক্ষন এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়।

আরো অনেক কথা আছে। একদিনে সব বলা সম্ভব নয়। তবে বড় একটি সমস্যা হলো বেকারত্ব। সরকার বলেছে, আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। তাহলে প্রতি বছরে ২০ লাখ কর্মসংস্থান করতে হয়। খেয়াল রাখতে হবে যে, এই মুহূর্তে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৪ লাখ। এদেরকে যত দ্রুত সম্ভব কর্মসংস্থানের বাজারে ঢুকিয়ে দেওয়া হোক। এটা তাদের জন্যও মঙ্গল, সরকারের জন্যও মঙ্গল।

Email:[email protected]