দেশ থেকে লাগামহীন অর্থপাচার আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে রীতিমত প্রান্তিকতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক সেক্টর। যা আমাদের জন্য মোটেই সুখবর নয়। জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিটেন্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য কাঠামোর অপব্যবহার করে অর্থপাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মূলত, ব্যাংকিং চ্যানেল ও আমদানি-রফতানি ব্যবস্থার ছিদ্রপথ কাজে লাগিয়ে অশুভ চক্রগুলো অবলীলায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করছে। সূত্রমতে, প্রতি বছর দেশ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন পদ্ধতিতে পাচার হয়। কিন্তু এসব প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিটেন্স প্রবাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও একই সাথে এ দু’টি খাতকে ব্যবহার করে অর্থ পাচারের প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, তদারকির ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল কাঠামোর সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিটেন্স এসেছে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার। মূলত, এ বড় অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেনের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে পাচারের একটি বড় অংশ, যা সরাসরি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এর উৎস ও প্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আবশ্যকতা। হুন্ডি চ্যানেল বন্ধ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং শক্তিশালী না হলে পাচার রোধ করা কঠিন হবে। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং অর্থ পাচারের মতো কারণগুলো একসাথে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, রফতানি-আমদানি যে বিশাল অঙ্কের লেনদেন হয়, সেখানে সামান্য শতাংশ অনিয়মও বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি করে। এ খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সাথে ঘোষিত দামের বড় পার্থক্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে এ ব্যবধানের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা বিদেশে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য স্থিতিশীল নয় বা সহজে যাচাই করা যায় না, সেসব ক্ষেত্রেই তারা বেছে নিচ্ছে।

এ দিকে রেমিটেন্স খাতেও একই ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সরকার প্রণোদনা দিয়ে বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে, তারপরও ‘হুন্ডি’ বা অবৈধ লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে অর্জিত অবৈধ অর্থ বৈধ রেমিটেন্স হিসেবে দেশে পাঠানো হচ্ছে, যা মানি লন্ডারিংয়ের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত। ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলেছে, অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশও এ ঝুঁকির বাইরে নয়।

তবে আশার কথা হচ্ছে, পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ইতোমধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে নজরদারি জোরদার করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি কয়েক হাজার সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (এসটিআর) বিশ্লেষণ করেছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাটা অ্যানালিটিক্স ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা পাচারের নতুন নতুন কৌশল শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। তবে এক্ষেত্রে আহামরি কোন সাফল্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো বাণিজ্য খাত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাই টাকা পাচার রোধে কাস্টমস ও ব্যাংকিং খাতে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। আমদানি-রফতানির তথ্য আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিলিয়ে দেখার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারও সময়ের দাবি। একই সাথে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে এ খাতগুলো যদি পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

আমাদের দেশ থেকে অর্থপাচারের ঘটনা একেবারে অভিনব নয়। পাচারকারীরা নানাভাবে বা বিভিন্ন পদ্ধতিতে দেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিদেশের মাটিতে বিপুল বিত্ত-বৈভবের সৃষ্টি করেই চলেছে। সুইচ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি দেশ থেকে অর্থপাচারের ধরন পাল্টানো হয়েছে। এখন রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য কাঠামো ব্যবহার করে দেশ থেকে দেদারছে অর্থপাচারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় দেশের অর্থভাণ্ডারকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রয়োজনে আইন হালনাগাদ করে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায় দেশের অর্থভাণ্ডার আগামী দিনে আরো অরক্ষিত হয়ে পড়বে।