অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) সংকটের কারণে চট্টগ্রামে অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেডের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ১৬ ধরনের তেল উৎপাদনে চরম ঝুঁকিতে পড়ল দেশ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত রোববার বিকালে শেষ পরিশোধন কার্যক্রম চলেছিল। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, পর্যাপ্ত ক্রুড অয়েল মজুত না থাকায় দুপুর থেকে তিনটি ইউনিটের মধ্যে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল উৎপাদনকারী দু’টি ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এটা দেশের জন্য একটি দুঃসংবাদ। ইস্টার্ন রিফাইনারি হলো বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার। ১৯৬৮ সাল থেকে ইআরএল বেশ ভালোভাবেই চলে আসছে। প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর এর পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ (টার্নঅ্যারাউন্ড) কাজও চলে। তবে অপরিশোধিত তেলের মজুত শেষ হওয়ার কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় চলতি মাসের শুরু থেকেই চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এই শোধনাগারটি কাঁচামালের সংকটে ভুগছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ এপ্রিল থেকে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন চালু রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। জানা যায়, ইস্টার্ন রিফাইনারির পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন, কেরোসিন ইত্যাদি তৈরি হয়, ওই ইউনিটটা এখন বন্ধ। শুধু বিটুমিন প্রোডাকশনটা চালু আছে। সূত্র জানায়, দেশের চাহিদা হচ্ছে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল এ জিনিসগুলা। এ প্রোডাক্টগুলার যে শর্টেজ হবে, এটার কারণে বাড়তি ফিনিশড প্রোডাক্ট বিপিসি বাইর থেকে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে এনে এটা মেকআপ দেয়ার চেষ্টা করছে।

বুধবার এক ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বলেছে, ইআরএল জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রুড অয়েল স্বল্পতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হচ্ছে বিধায় লো ফিডে (ধীরগতিতে) ইআরএল চালু থাকলেও এর কোনো বিরূপ প্রভাব সরবরাহ চ্যানেলে পড়বে না এবং এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, ইআরএলের মোট ইউনিট সংখ্যা ৪টি। তন্মধ্যে ২টি ইউনিট বর্তমানে মেইনটেন্যান্সে এবং ২টি ‘অপারেশনে’ আছে। তবে অন্য একটি সূত্র সেচ মৌসুমে রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বড় ধরনের হোঁচট হিসেবে মন্তব্য করেছে। ওই সূত্র মতে, সরকার দ্রুত সেচব্যবস্থা সচল রাখতে বিকল্প উৎস থেকে ডিজেলের পর্যাপ্ত জোগান দিতে না পারলে দেশে খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে।

সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে ক্রুড অয়েলবাহী একটি জাহাজ নির্ধারিত সময়ে না পৌঁছানো। তবে নতুন একটি চালান পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। আগামী ১৮ এপ্রিল সৌদি আরব থেকে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল জাহাজে তোলার কথা রয়েছে, যা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালে পুনরায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল মজুত রাখার ক্ষমতা দেড় লাখ টন এবং পরিশোধিত তেল রাখার ক্ষমতা আড়াই লাখ টন।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মার্চ মাসে মোট দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু সেই চালান দুটি পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণেই বর্তমানে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মনে করি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রেক্ষিতে বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আনার প্রক্রিয়া আরো গুরুত্বসহ বিবেচনা করা দরকার ছিল। দ্রুত চালান এনে এই রিফাইনারি চালুর ব্যবস্থা করতে হবে।