খুন বা হত্যা-এগুলো কাক্সিক্ষত শব্দ নয়। যে সমাজে হত্যার ঘটনা নানাভাবে নানামাত্রায় অব্যাহত থাকে, সে সমাজকে সুস্থ সমাজ হিসেবে অভিহিত করা যায় না। এক সময় আমাদের এই সমাজেই হত্যা ছিল বিরল ঘটনা। কখনো হত্যার কোনো ঘটনা ঘটলে তা সংবাদপত্রের বড় শিরোনাম হতো, মানুষ হুমড়ি খেয়ে সেই খবর পড়তো। আর এখন? হত্যার ঘটনা যেন এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ খবর নয়। হত্যার বহু ঘটনা এখন সংবাদপত্রের ভেতরের পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়। ব্যক্তিগত ও বংশগত শত্রুতার বাইরে এখন আরো বহু বিষয় যুক্ত হয়ে গেছে হত্যাকাণ্ডের সাথে। এর একটি ইয়াবা তথা মাদকের কারবার।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারের সাদেক খান ইটখোলা এলাকায় ইয়াবার কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, আগে পাল্টাপাল্টি হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার ও জামিন-এতকিছুর পরও দুইপক্ষে তৎপরতা থামেনি। সবশেষে মীমাংসার কথা বলে ডেকে এনে গত বুধবার রাতে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ওই এলাকার আইন-শৃংখলা পরিস্থতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে রায়েরবাজার এলাকায় এটি ছিল খুনের দ্বিতীয় ঘটনায়। ঘটনার পর পুলিশ ও র‌্যাব আলাদা অভিযান চালিয়ে নিহত আসাদুলের প্রতিপক্ষ আকতার হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নিহত আসাদুলের চাচাতো বোন অঞ্জু আক্তার বাদী হয়ে আকতার হোসেনসহ নয়জনকে আসামি করে শুক্রবার মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী আক্তার অনেক দিন ধরে এলাকায় মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন। নিজেকে শ্রমিক দলের মোহাম্মদপুর থানার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সদস্যসচিব পরিচয় দিয়ে এলাকায় পোস্টারও লাগিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আসাদুল খুন হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; এর পেছনে ছিল পুরনো দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ে ইটখোলা এলাকায় আকতারকে কুপিয়ে জখম করেছিল আসাদুল। ওই ঘটনায় আসাদুলসহ ছয়জনকে আসামি করে মামলা হয়। ওই মামলায় আসাদুল গ্রেপ্তার হয় এবং অল্পদিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়েও আসে। তবে এরপর আসাদুল আর আগের মত ওই এলাকায় মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। এই দ্বন্দ্বের সর্বশেষ প্রকাশ্য ঘটনা ঘটে গত ১৭ মার্চ। পুলিশ সূত্র জানায়, সেদিন আকতারের সহযোগী নয়নকে মারধর করে আসাদুল। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে বন্ধু ওলিউর আসাদুলকে ফোন করে ইটখোলা এলাকায় ডাকে, নয়নকে মারধরের ঘটনাটি সীমাংসার কথা বলে। এলাকায় পৌঁছানোর পর কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে আসাদুলকে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এই এলাকায় মাদক বেচাকেনার বিষয়টি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা থাকবার কথা নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক দোকানি গণমাধ্যমকে জানান, ‘পুলিশ সবই জানে, ব্যবস্থা নেয় না।’ তবে পুলিশ বলছে, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। আসাদুল হত্যার আসামিদের ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করার কথা জনিয়েছে পুলিশ। পুলিশের পারঙ্গমতার কথা আমরা জানি। তবুও তো মাদক ব্যবসা থামছে না, মাদককারবারিদের দৌরাত্ম্যও কমছে না। ফ্যাসিস্ট আমলে কক্সবাজার এলাকার আওয়ামী এমপি বদির মাদক ব্যবসা ও দৌরাত্ম্যের কথা দেশবাসী জানেন। একজন এমপির তো মাদকের বিরুদ্ধে থাকার কথা, কিন্তু বদি নিজেই মাদক ব্যবসাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশে। তার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন কিছু অসাধু পুলিশ ও রাজনৈতিক কর্মী। সেই যোগসাজশ কি এখনো অব্যাহত রয়েছে?