দেশের শিক্ষাঙ্গন আবারও অস্থিরতার মুখোমুখি- এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার নতুন বহিঃপ্রকাশ। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে সাম্প্রতিক সহিংসতার অভিযোগ, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার কথা বলা হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে পরিকল্পিত হামলা, অস্ত্রের ব্যবহার, এমনকি শিক্ষকদের ওপর শারীরিক লাঞ্ছনার মতো গুরুতর অভিযোগÑযা কোনোভাবেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এ ধরনের ঘটনাকে শুধুমাত্র দলীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলনÑ যেখানে শিক্ষাঙ্গন ক্রমাগতভাবে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়া, দেয়ালচিত্র মুছে ফেলা, উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারÑএসব আপাতদৃষ্টিতে ছোট ঘটনা হলেও এগুলোই সহিংসতার পূর্বাভাস তৈরি করে। যখন এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না, তখন তা দ্রুত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্র রাজনীতির নামে এ নোংরা সহিংসতা বন্ধ হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি- তা সত্যিই হতাশাজনক।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো শিক্ষকদের ওপর হামলার অভিযোগ। শিক্ষকরা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তারা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাদের ওপর আক্রমণ মানে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। একইভাবে, শিক্ষার্থীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা, গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা এবং চিকিৎসাধীন অবস্থার খবর আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñক্যাম্পাসে নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। এখানে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তারা যদি সত্যিই শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তাহলে তাদের আচরণে দায়িত্বশীলতা থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ছাত্রদলসহ বেশ কিছু সংগঠন নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। দখলদারিত্ব, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি জোরপূর্বক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রবণতাÑএসবই একটি অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ।

তবে দায় কেবল ছাত্রসংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতাও কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শাস্তি এড়িয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করে। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে কোনোভাবেই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑজাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে ক্যাম্পাসের উত্তেজনা বৃদ্ধি। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত যখন তীব্র হয়, তখন তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষাঙ্গনে পড়ে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরাতে ক্যাম্পাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তপ্ত রাখা হয়। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন, তবে এটি স্পষ্ট যে, ক্যাম্পাসের অস্থিরতা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

একই সময়ে, দেশে অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, বেকারত্ব, জ¦ালানি তেলের সংকট, বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিÑএসব বড় ইস্যু নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। যদি এ বাস্তবতা আড়াল করতে শিক্ষাঙ্গনকে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ, এতে শুধু শিক্ষাব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে জনবিরোধী আইন পাস, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ ল্যাপস হওয়া এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতি নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে গড়িমসি যদি চলতেই থাকে, তাহলে এর প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে ক্যাম্পাসে, প্রতিফলিত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলোÑসহাবস্থানের সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ক্যাম্পাসে ভিন্নমত থাকবে, রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু তা কখনোই সহিংসতায় রূপ নিতে পারে না। সব ছাত্রসংগঠনকে এই নীতিতে একমত হতে হবে যে, শিক্ষাঙ্গন সবার জন্য, কোনো একক গোষ্ঠীর জন্য নয়। সরকারের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে না করে। মনে রাখতে হবেÑশিক্ষাঙ্গন কোনো সংঘর্ষের ক্ষেত্র নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র। সেখানে যদি নিরাপত্তা, সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।