বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে। জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা এ উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু ভারতের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার-যা অন্যান্য সব দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ ছাড়া প্রায় সব দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে এ ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। যদিও কিছু দেশে সামান্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, তা মোট ঘাটতির তুলনায় নগণ্য। এ বৈষম্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি নির্ভরতা তৈরি পোশাক খাতের ওপর অত্যন্ত বেশি। এ একমুখী নির্ভরতা রপ্তানি বহুমুখীকরণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে, আমদানির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য অনেক বেশি-কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও রপ্তানি সেই হারে বাড়ছে না।
এছাড়া, দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ঘাটতিও একটি বড় কারণ। উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের অভাব এবং শিল্পখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অদক্ষ লজিস্টিক ব্যবস্থা, বন্দর জট এবং নানা অ-শুল্ক বাধা- যা রপ্তানিকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। বাণিজ্য নীতিতেও রয়েছে দুর্বলতা। সার্ক কাঠামোর অধীনে শুল্ক সুবিধা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর নয়। বিভিন্ন দেশে অ-শুল্ক বাধা, জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বাণিজ্য প্রবাহকে সীমিত করে রাখছে। ফলে কাগজে-কলমে সুবিধা থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা কাক্সিক্ষত সুফল পাচ্ছেন না।
এ ক্রমাগত বাণিজ্য ঘাটতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, মুদ্রার মান দুর্বল করে এবং অর্থনীতিকে বহির্নির্ভরশীল করে তোলে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এ সময়ে এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে এ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা অপরিহার্য। তবে আশার কথা হলো, সঠিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। প্রথমত, রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। তৈরি পোশাকের বাইরে ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি খাত, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও হালকা প্রকৌশল শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে, অবকাঠামো উন্নয়ন-বিশেষ করে বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন-রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। অ-শুল্ক বাধা দূর করা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সবশেষে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, বাণিজ্য ঘাটতি শুধু অর্থনীতির একটি অংশ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে বাণিজ্য ঘাটতির এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে এখনই গুরুত্বসহকারে মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায়, এটি ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে।