বৈশাখও ব্যাপৃত যুদ্ধে
হাসান হাফিজ
তুমি কার প্রতিধ্বনি?
সময়ের। প্রগতির। কল্যাণের।
কী তোমার শক্তি ও পাথেয়?
স্বপ্ন ও সুন্দর। মানবিক শুদ্ধতা প্রত্যয়।
কী তুমি হঠাতে চাও?
অশান্তি কলুষ হিংসা অনৈক্য সংঘাত।
বৈশাখ তোমার মধ্যে মুখরতা কেন?
জাগিয়ে তুলতে চাই ঘুমন্ত মানব সত্তা।
তারপর? অন্বিষ্ট কী আছে কিছু আর?
প্রতিষ্ঠা সাম্যের। অবসান সমস্ত যুদ্ধের।
এ স্বপ্ন পূরণ হওয়া কতটা সম্ভবপর?
অনেক, অনেকটাই। চলবে লড়াই।
-যুদ্ধই জীবন।
ঝেড়ে ফেলে দাও
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
আমার দেয়ালের ঘড়িটা আজ সময় বলে না
বরং থেমে গিয়ে ফিসফিস করে বলে,
পুরোনো সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দাও।
তারকাঁটাগুলো আটকে আছে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে
যেখানে আমি শেষবার নিজেকে হারিয়েছিলাম।
১৪৩২ এর শেষ নিঃশ্বাস এখনো বাতাসে ঝুলে আছে
আর নতুন বছর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে
একটা আজব জটিল অদ্ভুত নীরবতা বাজায়
যেন সে জানে, আমি এখনো কিছুমাত্র প্রস্তুত নই।
এবার বৈশাখের বাতাসে আমি গুঞ্জন শুনি
ভবিষ্যৎ তার নাম বদলাচ্ছে
প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন পরিচয়ের জন্ম নিচ্ছে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করি
কিন্তু প্রতিবারই আমার কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে ওঠে
চারদিকে শোনা যায় পুরোনো দিনের প্রতিধ্বনি।
নববর্ষ মানে সময়কে নতুন করে গোনা নয়
নিজের ভেতরের ভাঙা ঘড়িটাকে সচল করা!
স্বীকৃতি চায়
মুহাম্মদ রফিক ইসলাম
গলা পর্যন্ত উঠে আসা কথাগুলো
ঠোঁটে এসে থেমে যায়
জিভ শুকিয়ে গিয়ে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকে
বিজ্ঞদাঁতের নিষেধাজ্ঞায়...
সাদা কাগজে কাঁদতে গিয়েও ভাবতে হয়
কাটাছেঁড়া ঘষামাজা শেষে ছিঁড়ে ফেলতে হয় পাতা
ক্ষমতার হিংস্র আঙুল ঠোকা রক্তচক্ষু
গোপন অঙ্গীকারের নথিবদ্ধ পেরেক
খবরের লোকদের মতো মাইক্রোফোন হাতে
জুড়ে দেয়া প্রশ্নসূচক উত্তর চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া
চলনে বলনে শিখে নিতে হয় পাখির ঠোঁটে পাঠ
আমার রক্তই এখন আমার কাছে
পোস্টমর্টেম দেহের স্বীকৃতি চায়।
নাম পত্তন
মোশাররফ হোসেন খান
সতের বছর---
সতের বছরব্যাপী তুমি ছিলে জীবন্মৃত।
অতঃপর লাল চব্বিশে ফিরে পেয়েছো জীবন।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
সতের বছরব্যাপী বধির ছিলে তুমি।
অতঃপর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছো।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
সতের বছরব্যাপী তুমি ছিলে নির্বাক।
অতঃপর বাকশক্তি ফিরে পেয়েছো ।।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
সতের বছর---
সতের বছরব্যাপী গুহায়, কবর¯’ানে, বন-বাদাড়ে, যত্রতত্র,
যেখানে সেখানে--- যাযাবর ছিলে তুমি।
ছিলে গৃহহীন।
অতঃপর প্রত্যাবর্তন করেছ নিজ গৃহে।
স্তিত হয়েছো।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
সতের বছরব্যাপী বেদখল হয়ে গিয়েছিল তোমার ভিটেমাটি,
বাড়ির, ক্ষেত খামার, ব্যবসা প্র্রতিষ্ঠান,
ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
মসজিদ, ঈদগাহ, হাটবাজারসহ সকল কিছু।
তোমার বলতে ছিল না কিছুই।
তুমিও ছিলে না তোমার ভেতর।
অতঃপর সবই ফিরে পেয়েছো।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
লাল চব্বিশের অদম্য দুঃসাহসী বিপ্লবীরা---
মেধা-মনন দিয়ে, রক্ত দিয়ে,
চোখ হারিয়ে, হাত হারিয়ে, পা হারিয়ে, পঙ্গুত্ব বরণ করে,
শহীদ হয়ে মুক্তি এনে দিয়েছে।
তাদমোর কিংবা গুয়ানতানামো কারাগারের চেয়েও ভয়ঙ্কর কারাগার থেকে,
আয়না ঘর থেকে মুক্ত করেছে তোমাকে, তোমার সন্তান-সন্ততিকে।
সকল রুদ্ধতার শৃংখল ভেঙে অজস্র পথ তৈরি করে দিয়েছে।
ফ্যাসিস্টের চির¯’ায়ী বন্দোবস্ত থেকে
তোমার বসতভিটাসহ এ দেশকে রক্ষা করেছে।
অতঃপর দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিন
নতুন করে নাম পত্তন করে দিয়েছে।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
লাল চব্বিশের পাঁজর উৎসর্গকারী বিপ্লবীরা---
পুনর্বার স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।
মুক্তি এনে দিয়েছে।
অতএব কৃতজ্ঞ হও।
কৃতজ্ঞ হও।
কৃতজ্ঞ হও।
সময় ও জীবন
আবুল খায়ের বুলবুল
আঁধারের পথ ঠেলে উঁকি মারে সূর্য
বাধার পাহাড় কঠিন হলেও
সাহসীরা তা সরিয়ে দেয়
কখনই কোনো চলার গতিকে
কেউ আটকাতে পারেনি পারে না
গতিও পাল্টায় সময় পাল্টায়
জীবনও তেমনি পাল্টায়
বহু মুরুভূমিতে আজ তাই নানা
ফুল ফোটে, চেষ্টা প্রচেষ্টা যদি অব্যাহত থাকে,
সফলতার স্নিগ্ধ লোবান ঠিকই ছড়ায়
আমরা পারি না বলে পারি সব
না হয় এই পৃথিবী যেমন ছিলো তেমনই থাকত।
বৈশাখের দিকে
নয়ন আহমেদ
কেমন এক বৈশাখের দিকে যাচ্ছে সমূহ নির্মিতি
যেন যাত্রা করছে সে প্রাকৃত স্বভাবে
কোলাহলে
বীরদর্পে যুবক স্বভাবে।
পোড়াবে আবাল্য ব্যাধি, শোক-তাপ;
রাখবে উঠোনে রাশি রাশি সম্ভাবনা
আর গৃহফুলে পূর্ণ হবে প্রমত্তা প্রাঙ্গণ।
বাংলাদেশ হয়ে ঝুলবে তোমার খোঁপায়। দেখে নিয়ো।
এই বৈশাখে যদি ফোটে লাল শিমুলের মতো রোদ
যদি ঘুচে যায় অন্ধত্বের হাহাকার
যদি মননের কোষে কোষে রক্ত চলাচল হয় খুব স্বাভাবিক
আর জন্ম নেয় পাখিদের মতো অগণিত কিচিরমিচির শব্দবোধ
তবে ফিরবে এবার অশেষ ব্যঞ্জনা
অস্থির ধ্বনিপুঞ্জ।
মৃত্যু, জরা অস্ত যাবে।
ঘরমুখো থইথই কলরব হবে।
মনে রেখো, সর্বব্যাপী এই গুঞ্জরণ।
হেই ভোর, মনে পড়ছে না এইসব নতুন সৃজন?
মনে পড়ছে না প্রেম, ফুটন্ত দুপুর, রুক্ষ রোদ?
যৌবনের মতো লাল কৃষ্ণচুড়া, মনে পড়ছে না?
জেনো রাখো,
বৈশাখের আছে প্রবল ইচ্ছার মতো গর্জন করা এক বঙ্গোপসাগর।
বোশেখ আসুক সূর্য-রথে
এ কে আজাদ
চৈত্র শেষে বোশেখ এলো, আজ বোশেখের পয়লা,
নতুন দিনে যাক মুছে যাক মনের যত কয়লা।
মন থেকে যাক মনের কালি, সমাজ থেকে কালো,
কায়মনে আজ চাই গো সবাই দেশের জন্য ভালো।
অফিস থেকে দুর্নীতি যাক, এবং ঘুষের সাপ,
সবাই মিলে পায়ে দলি লুটতরাজের পাপ।
কারও ধনে কেউ দেবো না লোলুপ কালো থাবা,
শরীর থেকে খুলে ফেলি স্বার্থপরের আবা।
খুনীর বুকে ফুটুক গোলাপ সুবাস ভরা যত,
হিংস্র পশুর চামড়া খুলে হোক মানুষের মত।
পরের জন্য শুভেচ্ছা হোক আজকে দিনের কাম্য,
সব মানুষের জন্য যাচি সম্প্রীতি আর সাম্য।
শহর নগর গেরাম জুড়ে খুশির ধারা ঝড়ুক,
সব মানুষে মিলে মিশে সুখের ধরা গড়ুক।
দখলদারের ধকল হতে মানবতার মুক্তি চাই,
মুক্তো দানার ঝলক ভরা সবার হৃদয়-শুক্তি চাই।
বোশেখ আসুক আমার দেশে রবির আলো নিয়ে,
বোশেখ আসুক বিশ্বজোড়া মহৎ, ভালো নিয়ে।
বোশেখ আসুক সূর্য-রথে বিশ্ব ভরা সুখে,
অত্যাচারীর বুকে জ্বলুক আঁধারপুরি রুখে।
চৌতলা ছাদের সিঁড়ি
মাহফুজুর রহমান আখন্দ
(মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান শ্রদ্ধাভাজনেষু)
সময়ের হাওয়াই সিঁড়িতে পা ফেলতে ফেলতে স্পর্শ করেছো চৌতলা ছাদের গলি
ক্লান্তির মেঘেরা একে একে উড়াল দিয়েছে প্রতিটি ধাপির শব্দে
সুরেলা গানে মুখরিত করেছে বৈচিত্র্যময় দোয়েল কোকিল
তুমিও সুর তুলেছো ঐক্যে, গেয়ে চলেছো নিখাঁদ প্রেমের মৌসুমী গান।
আমরা তখনো আনমনা
ভোরের হাওয়ায় হৃদয় দোলাবে বলে সিঁড়ি ভাঙছো রোজ
লাল-কালো আর সাদা গোলাপের চারার সন্ধানে সচল রেখেছো তোমার সুক্ষ্মদৃষ্টি
শেফালি বেলীর সুরভিত ছন্দে পাল উড়িয়েছো মাতাল হাওয়ায়
তখনও আমরা সাদা কইতর উড়াই, চাষ করি সবুজের মাটি, স্বপ্নের লালশাক।
একটা স্বপ্নফুল ফোটাবে বলে অনবরত চাষ করে যাচ্ছো পাথুরে মাঠে
জৈবসারের কম্পোজখালে সাঁতার কেটেছো প্রতিনিয়ত
চোখের রেটিনায় ভরিয়ে নিয়েছো মানবিক শব্দকলি
শাপলা ফুলের সুরছন্দে ডুবুরি হয়েছো সিদ্ধশালুকের আশায়
‘অনুভবে’র পরতে পরতে সাজিয়ে নিয়েছো কাব্যগানের হৈমন্তী সুর
‘মোঘলদের দেশে’ স্বার্থক অতিথি হয়েছো, রাস্তা মাড়িয়েছো মুসাফিরি বেশে
‘বাংলাদেশের ঐতিহ্য’ সংরক্ষণে গড়ে তুলেছো কলম-কালির অবিনাশী প্রেম
মানবিক শিল্পকলায় নান্দনিকতার আবহে নির্মাণ করেছো ‘সোসাইটি ধারা’
কাব্যময় ক্যানভাসে তুলির আঁচড় টেনে লাগাম পরিয়েছো বাতাসের গায়
তবুও মেঘেরা হাসে। গর্জন করে কালবৈশাখী ঢোলের তালে
তুমি হাসিুমখে উড়িয়ে দিয়েছো সব-
‘ঢাকনাটা খুলে দ্যাখো আড়ালের ছবি
স্বপ্নের রঙ মাখো লিখে হও তুমি বড় কবি’
জীবন খাতার প্রতিটি পাতায় জলছবি এঁকে যাচ্ছো
অন্ধকার মাড়িয়ে তুলে আনছো স্বপ্নের ভোর, মুক্তিফজর
‘আস সলাতু খইরুম মিনান নাউম’।
একদিন তুমি এসো
জাকির শায়েরী
আমার নিলয়ের দরজা হারিয়ে গেছে
হারিয়ে গেছে আমার জীবনের দুঃখগুলো
এতো এতো সুখ যে, আমি সইতে পারি না বন্ধু?
একদিন তুমি এসো, সময় নিয়ে এসো
এই চৈতীর কাক ডাকা দুপুরে
মৃদু দখিনা পবনে একবোঝা সুখ তোমাকে দিবো?
তোমরা এসো বন্ধু, জোনাকির জ্বলজ্বল সন্ধ্যায়
প্রদীপের শিখা নিভিয়ে, আমরা আড্ডা দিবো
এককাপ কফি সমান ভাগ করে পান করবো?
অমৃত সুখ এখানেই আছে বন্ধু, ভুল বুঝো না
এখানে সুখ দুঃখ সবই সমান আমাদের মতো
প্রতিদিনের পূর্বাকাশে দিবাকর উদয়ের মতো?