ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা

২০১০ সালের সেই কালো দিন থেকে ২০১৬ সালের ১১ মে-এই ছয়টি বছর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কেবল একটি দলের শীর্ষ নেতার কারান্তরীণ থাকা নয়, বরং এটি ছিল একটি আদর্শকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর সুগভীর ষড়যন্ত্র। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে যখন ২০১০ সালে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে গ্রেফতার করা হয়, তখন থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ায় নয়, বরং একটি ‘জুডিশিয়াল কিলিং’-এর মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। আজ এক দশক পর যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন শহীদ নিজামীর সেই শান্ত ও ধীরস্থির চেহারা এবং তাঁর প্রতি হওয়া পাহাড়সম অবিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জনমত তৈরির সেই কঠিন দিনগুলো স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।

গ্রেফতার ও অবিচারের সূচনা

মাওলানা নিজামীকে গ্রেফতারের পর থেকে ট্রাইব্যুনাল গঠন পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ইউরোপে বসে আমরা যখন মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করতাম, তখন শিউরে উঠতাম। কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই কেবল কাল্পনিক অভিযোগের ভিত্তিতে একজন সাবেক মন্ত্রী ও শীর্ষস্থানীয় আলেমকে যেভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তা ছিল আধুনিক বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, দেশের ভেতরের বিচারব্যবস্থাকে সরকার পুরোপুরি কব্জা করে ফেলেছে। তাই আমাদের লড়াইয়ের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গন।

আন্তর্জাতিক মহলে লবিং ও জনমত গঠন

ইউরোপের মুখপাত্র হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল বিশ্বনেতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর কাছে শহীদ নিজামীর প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা। আমরা জেনেভা, ব্রাসেলস, লন্ডন এবং ওয়াশিংটনে নিরলসভাবে দৌড়েছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশ্বকে জানানো যে, এই ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (International Standards) বজায় রাখছে না।

আমি যখন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সাথে কথা বলতাম, তারা অবাক হতেন শুনে যে, এই বিচারে বিবাদ পক্ষকে পর্যাপ্ত সাক্ষী ডাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আমাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যখন একের পর এক বিবৃতি দিচ্ছিল, তখন ফ্যাসিস্ট সরকার বিচলিত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে মাওলানা নিজামীর মতো একজন সজ্জন ও জনপ্রিয় নেতার বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর তকমা লাগানো যে কতটা হাস্যকর ছিল, তা আমরা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলাম।

স্কাইপ কেলেঙ্কারি ও বিচারের কফিনে শেষ পেরেক

শহীদ নিজামীর বিচার চলাকালীন বিচারপতি নিজামুল হকের সেই কুখ্যাত ‘স্কাইপ কেলেঙ্কারি’ ফাঁস হওয়ার পর বিচার বিভাগীয় নৈতিকতা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউরোপের আইনি বিশেষজ্ঞদের সাথে এই বিষয়ে মতবিনিময় করেছি। তারা একবাক্যে বলেছিলেন, এই ঘটনার পর বিচারকের পদে থাকার নৈতিক অধিকার যেমন তাঁর নেই, তেমনি এই আদালতের দেওয়া যেকোনো রায় বাতিল হওয়া উচিত। কিন্তু হাসিনা সরকার আইনের শাসন নয়, বরং রক্তের নেশায় মত্ত ছিল। তারা আন্তর্জাতিক মহলের সকল উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করে মাওলানা নিজামীকে হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়ন করে চলেছিল।

অবিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া

ব্যারিস্টার হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক প্রভাবশালী নেতা শহীদ নিজামীর ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিষ্টরা জানত, মাওলানা নিজামী যদি বেঁচে থাকেন, তবে তাদের গদি নড়বড়ে হয়ে যাবে। কারণ মাওলানা নিজামী কেবল একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইনসাফ ও সততার এক জীবন্ত প্রতীক।

শাহাদাতের সেই বিষাদময় রাত

১১ মে, ২০১৬। সেই রাতটি ছিল কেবল জামায়াতে ইসলামীর জন্য নয়, বরং বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের জন্য এক বেদনাবিধুর রাত। ইউরোপের রাজপথে দাঁড়িয়ে আমরা যখন খবর পেলাম যে মাওলানা নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে, তখন আমাদের হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় ছিল তাঁর অবিচলতা। ফাঁসিতে যাওয়ার আগে তিনি যে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) দেখিয়েছিলেন, তা দেখে খোদ কারারক্ষীরাও বিস্মিত হয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, জালিমরা তাঁর দেহকে মারতে পারলেও তাঁর আদর্শকে মারতে পারবে না।

অবিচার যখন প্রেরণা

মাওলানা নিজামীর প্রতি হওয়া এই অবিচার আজ বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য এক নতুন প্রেরণার উৎস। আমরা যখন জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালগুলোতে কথা বলি, তখন শহীদ নিজামীর মামলাটি একটি ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয় যে, কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বিচার ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ব্যারিস্টার হিসেবে আমি মনে করি, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এই যুদ্ধে পরাজিত হননি। বরং যারা তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিয়েছিল, আজ তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তিনি তাঁর রক্ত দিয়ে এমন এক জমিন তৈরি করে গেছেন, যেখানে ইনসাফের ফসল একদিন ফলবেই।

পরিশেষে

দৈনিক সংগ্রাম-এর পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, মাওলানা নিজামী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং তাঁর প্রতি হওয়া এই অবিচারের ইতিহাস আমাদের প্রতি মুহূর্তে লড়াই করার সাহস জোগায়। ইউরোপের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি মানবাধিকার ফোরামে আমরা যখন তাঁর ত্যাগের কথা বলি, তখন বিশ্ববাসী শ্রদ্ধায় মাথা নত করে। তিনি ছিলেন ইনসাফের সৈনিক, আর তাঁর শাহাদাত হলো সেই ইনসাফ কায়েমের সংগ্রামের এক অমর মহাকাব্য।

অবিচার ও জুলুমের অন্ধকার ভেদ করে সত্যের আলো একদিন উদ্ভাসিত হবেই শহীদ নিজামীর জীবন ও শাহাদাত আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর

ইউরোপের মুখপাত্র এবং আন্তর্জাতিক আইনজীবী