মুহাম্মদ নূরে আলম

বিশ্ব রাজনীতি এক অভূতপূর্ব মেরুকরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। একদিকে পরাশক্তিগুলো তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে নতুন নতুন অক্ষ তৈরি করছে, অন্যদিকে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট গড়ে তুলছে। এই বৈশ্বিক সমীকরণের ঢেউ এসে লেগেছে দক্ষিণ এশিয়া এবং মুসলিম বিশ্বেও। গত ৭ আগস্ট ২০২৬ পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশের পর ঢাকার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নানা উদ্যোগের দিকে ইঙ্গিত করে ভুরাজনীতি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন যে, এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। মক্কা চুক্তিতে যোগদানে করলে সামরিক ও অর্থনীতি দু’দিক থেকেই লাভবান হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে বাংলাদেশের।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কী? ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের দোহায় ইসরাইলি হামলার পর পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। পরবর্তীতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল সামরিক উত্তেজনা বাড়লে ন্যাটোর সদস্য তুরস্কও এতে যুক্ত হয়। ৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ মক্কায় এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির প্রধানতম অনুচ্ছেদটি হুবহু ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর আদলে তৈরি। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সাক্ষরকারী কোনো একটি দেশের ওপর বহিরাগত সশস্ত্র হামলা হলে তা তিনটি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সব দেশ সম্মিলিতভাবে তা প্রতিরোধ করবে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নির্ভর করছে সদস্যদেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর জাতীয় সংসদে গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান একথা জানিয়েছেন। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে যোগদানের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত সুবিধা ২০২৬ সালের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনার অংশ হিসেবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের একটি স্পষ্ট বার্তা দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সাথে কৌশলগত সখ্য বাড়ানোর যে উদ্যোগ, মক্কা জোটে আগ্রহ তারই একটি অংশ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান শক্তির জন্য এই জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য সুবিধাগুলো হলো: ১. সামরিক আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, ২. প্রবাসী শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি; বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত আছেন, যা দেশটির সর্ববৃহৎ প্রবাসী গোষ্ঠী। তারা বছরে ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। ৩. জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা এই নতুন জোটে বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে মর্যাদা দেবে। তবে ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও ভারত-চীন ফ্যাক্টর উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি মক্কা জোটে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পেছনে একাধিক প্রচ্ছন্ন ঝুঁকিও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ মক্কা চুক্তির পরপরই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে ফোনালাপ হয়। ভারত ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে তারা এই চুক্তির প্রভাব গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমায় সৌদি-চীন সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। বেইজিং এই নতুন জোটে কৌশলগত সুবিধা খুঁজতে পারে।

সাবেক সিনিয়র কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শাকিব আলী বলেন, “সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাওয়ার ক্ষেত্রে এই চুক্তি ইতিবাচক হতে পারে। তবে দেখতে হবে বাংলাদেশ কোনো অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কি না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি, ভারত ও ইসরাইলের সমীকরণ এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে কৌশলগত সুবিধা, ঝুঁকি ও দুর্বলতা; এই তিনটি বিষয় গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেই বাংলাদেশকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

মক্কা চুক্তি নিয়ে জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেসের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের (বিডস) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান হোসাইন আনসারী বলেন, মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ একদিকে যেমন বড় সুযোগ তৈরি করছে ঠিক তেমনি আবার এর পেছনে চ্যালেঞ্জ ও রয়েছে। কারণ, সৌদি আরব হচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় একটি দেশ। গত বছর প্রায় ৫.২৮ বিলিয়ন ডলার দেশটি থেকে এসেছে। এ ছাড়া আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানোর নির্ভরতা রয়েছে। সৌদি আরবের সাথে এ জোটে যুক্ত হলে এই শ্রমবাজার আরো বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের এলএনজি ও এনার্জি সেক্টরে যে সংকট তৈরি হয়েছে সে জায়গা থেকে সৌদি আরব বাংলাদেশকে বড় ধরনের সহযোগিতা করতে পারে।

তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক সুযোগ ছাড়াও এ জোটে যুক্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কারণ তুরস্ক এবং পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ড্রোন, জেএফ ৭০ ফাইটার্স এবং নেভাল প্ল্যাটফর্ম অফার করেছে- যে তিনটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যদি ভারত ও মিয়ানমারকে সামনে রেখে চিন্তা করা হয় তাহলে বাংলাদেশের ড্রোন, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও ফিগ্রেটসের আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তান বাংলাদেশকে আরো বেশি সহযোগিতা করতে পারবে। টেকনোলজি ট্রান্সফার করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘মোটাদাগে অর্থনৈতিক ও সামরিক জোটে যোগদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে দুটো সুযোগ তৈরি করবে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, “মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে, এতে তড়িঘড়ি না করে ভালোভাবে পর্যালোচনা করে এগোনো উচিত। দেখতে হবে এই চুক্তি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে যায় কি না। যদি তা না হয়, তবে যোগ দিতে বাধা নেই। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে। ভারতের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালে বাংলাদেশের আখেরে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না।” তবে তাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি ইতিবাচক দিক ছিল ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’। সরকার পরিবর্তন হয়েছে বলেই পররাষ্ট্রনীতিও পরিবর্তন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বাংলাদেশের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির বলেন, আমরা এই চুক্তিতে যোগদিলে আমাদের জ¦ালানি সংকট অনেকাংশে দূর হবে। সৌদি আরব তেল দিয়ে সাহায্য করবে, গ্যাস দিয়ে সাহায্য করবে। তুরস্ক দিবে তার সমরাস্ত্র। পাকিস্তান তার অবস্থানে প্রতিরোধ যদি ডেপ্লয়মেন্ট করে, বাংলাদেশে কোনো রকম থ্রেট ডেভেলপ করলে পাকিস্তান তার সীমান্তে যদি সৈন্য সমাবেশ করে, চীন যদি তার সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে; সেটাই আমাদের জন্য প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে একটা বিরাট বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তখন এই বিষয়টায় চিন্তা করেই কিন্তু ভারত এখন চিন্তায় পড়ে গেছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির মনে করেন, কোনো দ্বিধা না রেখে বাংলাদেশের উচিত ‘মক্কা প্যাক্ট’-এ অবিলম্বে স্বাক্ষর করা। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক দিক থেকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমবাজার ও রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, তুরস্ক থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি লাভ এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ভারতের মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবে কাজ করবে। বিগত ১৭ বছরে প্রতিরক্ষা খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা নিজস্ব বাজেটে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়; তাই জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এই আঞ্চলিক চুক্তিতে যাওয়া জরুরি। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের বিপুল জনশক্তি ও বাণিজ্য জড়িত থাকায় তারা এই চুক্তির বিরোধিতা করতে পারবে না। কোনো আগ্রাসনের জন্য নয়, বরং কেবল আত্মরক্ষার্থেই বাংলাদেশকে এই পদক্ষেপ নিতে হবে এবং প্রয়োজনে এর খসড়া জনগণের সামনে প্রকাশ করা যেতে পারে।