যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য ও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সারাদেশে পবিত্র সীরাতুন্নবী (সা.) পালিত হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জশনে জুলুস, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, দোয়া-মোনাজাত ও নানা ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় পবিত্র সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়েছে। আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার উদ্যোগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে জশনে জুলুস বের হয়। সংগঠনটির সভাপতি শাহসূফী ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী মাইজভাণ্ডারীর নেতৃত্বে এতে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ নেন। সকাল ১০টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ গেট থেকে জুলুসটি শুরু হয়ে দোয়েল চত্বর, শিক্ষা ভবন ও সচিবালয় সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় ‘ইয়া নবী সালামু আলাইকা’ ও ‘ইয়া রাসুল সালামু আলাইকা’ ধ্বনিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক মুখর হয়ে ওঠে। জুলুস শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়, মানবিকতা, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। পরে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
পবিত্র সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনা জাতীয় পতাকা, বিভিন্ন রঙের পতাকা ও ব্যানারে সাজানো হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেও ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার, কিরাত, হামদ-নাত, কবিতা পাঠ ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ, শান্তি, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা তুলে ধরা হয়। এছাড়া, বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও মিশনেও যথাযথ মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিবসটি পালন করা হয়েছে।
এদিকে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাংলাদেশের মুসলিমসহ বিশ্বের মুসলিমদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সীরাতুন্নবী (স.) পবিত্রতা ও মহিমাকে সামনে রেখে বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য এবং মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে অঙ্গীকারের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বর্তমান যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতায় বিপর্যস্ত বিশ্বে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ ততধিক প্রাসঙ্গিক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য নয়, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। তিনি আরও বলেন, তার আদর্শকে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক আচরণে ধারণ করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের শান্তি কামরা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুমহান জীবনাদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
এরআগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বছরজুড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত চর্চা ও অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, “মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমগ্র মানবজাতির শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তির জন্য ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবজাতির চূড়ান্ত মুক্তির একমাত্র পথ তাঁর নির্দেশিত আদর্শ অনুসরণ করা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের বাস্তব প্রতিফলনই পবিত্র কুরআন। তিনি ছিলেন মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রে তথা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ইহকালীন ও পরকালীন সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।
তাই সীরাতুন্নবী (সা.) গভীরভাবে অধ্যয়ন, প্রজ্ঞা বা হিক্বমার সঙ্গে তা মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করা প্রতিটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য। তিনি এই চর্চাকে কোনো নির্দিষ্ট দিন বা মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সব শাখা সংগঠনকে সীরাতের ওপর আলোচনা সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশবাসীকে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়ার তাগিদ দেন।”
খুলনা ব্যুরো
পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন উপলক্ষ্যে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর জীবনী এবং কর্ম শীর্ষক আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো: আবদুল্লাহ হারুন।
প্রধান অতিথি বলেন, মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) তাঁর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে একটি আদর্শ রেখে গেছেন। এই আদর্শ হলো আমাদের জীবন চলার পথ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে পারলে মানুষের জীবন হবে সমৃদ্ধ। শৈশব থেকে আদর্শের চর্চা শুরু করা দরকার। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সকলের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে উম্মতদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন খুলনা দারুল উলুম মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা নাসির উদ্দিন কাসেমী। স্বাগত বক্তৃতা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ। মহানবী (সা.) এর জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা করেন আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. মো. আবু রহীম সরদার, দারুল কুরআন সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসার মুফাসসির মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, তালিমুল মিল্লাত রহমাতিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এ এফ এম নাজমুছ ছউদ ও খান-এ-সবুর মহিলা কামিল মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক মাওলানা মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাসহ স্কুল-মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী (স.) পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে বুধবার সকালে নগর ভবনের নিচতলায় মহানবী (স.) এর জীবন ও আদর্শের উপর আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। অনুষ্ঠানে প্রশাসক ক্বিরাত, হামদ-নাত ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশুদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।
কেসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবন ও আদর্শের উপর আলোচনা করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও ইমাম পরিষদ-খুলনার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা গোলাম কিবরিয়া। স্বাগত বক্তৃতা করেন খুলনা আলিয়া কামিল মাদরাসার সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল মুফতী মাওলানা মুশফিকুর রহমান এবং অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেসিসি’র সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার মো. মনিরুজ্জামান রহিম। অন্যান্যের মধ্যে কেসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান, সচিব মো. রেজা রশীদ, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রহিমা সুলতানা বুশরা, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল ইমরান, চীফ প্লানিং অফিসার আবির উল জব্বার, বাজেট কাম একাউন্টস অফিসার মো. মনিরুজ্জামান, আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে কেসিসির সাবেক কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন বনি, মাজেদা খাতুন, রোকেয়া ফারুক, সমাজসেবক অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম, আরিফুজ্জামান অপু, নজরুল ইসলাম বাবু, শেখ আসাদুজ্জামান মুরাদ, মেহেদী হাসান দিপু, নিজামুর রহমান লালু, এডভোকেট গোলাম মওলা, আনোয়ার হোসেন, ইউসুফ হারুন মজনু সহ কেসিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এবং কেসিসি পরিচালিত মক্তবসমূহের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পরে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন কেসিসি শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাওলানা নাসির উদ্দিন কাসেমী।