আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছর, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখবে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি)। এসব অডিট আপত্তি ও অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

তিনি বলেন, অতীতের সব সরকারের আমলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে।

তবে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নিকট অতীতের অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালের অডিট আপত্তিগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

কমিটির কাজের পরিধি তুলে ধরে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সরকারের বর্তমান ও অতীতের ব্যয় পর্যালোচনা করা এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) উত্থাপিত অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই হিসাব কমিটির মূল কাজ।

সেই অনুযায়ী, কোথাও কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি অডিট আপত্তি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি।

তিনি বলেন, কয়েকটি আপত্তি নিষ্পত্তি হলেও বাকি বিষয়গুলো তদন্তের জন্য একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরেজমিনে তদন্ত করে এক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে সাব-কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমিটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে অর্জিত অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী– পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে আয় করা অর্থের ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে লভ্যাংশ থাকে, তার ৩০ শতাংশ বিশেষজ্ঞদের পাওয়ার কথা। কিন্ত অভিযোগ রয়েছে, লভ্যাংশের পরিবর্তে মোট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ অর্থ ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘কোনো ক্ষেত্রে ১০০ টাকা আয় হলে এবং ওই কাজ সম্পন্ন করতে ৯০ টাকা ব্যয় হলে প্রকৃত লভ্যাংশ থাকে ১০ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী এই ১০ টাকার ৩০ শতাংশ বিশেষজ্ঞদের পাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে পুরো ১০০ টাকার ওপর ৩০ শতাংশ হিসাব করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি আইন ও সরকারি বিধির লঙ্ঘন কি না, তা তদন্ত করে দেখার পাশাপাশি অতিরিক্ত নেওয়া অর্থ যেকোনো মূল্যে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। একইসঙ্গে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি প্রতি মাসে কমিটিকে জানাতে বলা হয়েছে।

সরকারি হিসাব কমিটি জানিয়েছে, শুধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কমিটির সভাপতি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা অন্যান্য সরকারের আমলের অডিট আপত্তিও পর্যায়ক্রমে সামনে আনা হবে। যেসব জায়গায় বড় ধরনের দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান অডিট আপত্তির যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে জানিয়ে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে এখন থেকে কমিটির প্রতিটি বৈঠকের সিদ্ধান্ত প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

এদিকে সংসদ সচিবালয় বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর সভাপতি, কমিটির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) রিপোর্ট নম্বর-৩৬/২০২৩-এর ওপর আলোচনা শুরু হয়। এই রিপোর্টে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টের ১ থেকে ৮ নম্বর অনুচ্ছেদের অডিট আপত্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

আলোচনা শেষে অডিট আপত্তি সংশ্লিষ্ট অর্থ দ্রুত আদায়ের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর বাইরে নিরীক্ষাকালীন সময়ে কেনাকাটায় দরপত্রের স্পেসিফিকেশন সঠিকভাবে বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা সরেজমিন যাচাই করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংসদীয় কমিটি। কমিটির সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান, মো. ফজলে হুদা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নিয়ে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে স্পেসিফিকেশন যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া বৈঠকে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের রিপোর্টভুক্ত অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তিগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত ১০টি বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। এসব অডিট আপত্তির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জমা দেওয়া জবাব এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণক নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। সিএজি কার্যালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে এবং দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এই ১০টি অডিট আপত্তি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত নেয় স্থায়ী কমিটি।

বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সদস্য মো. আমানউল্লাহ আমান, হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, এ, কে, এম ফজলুল হক মিলন, মো. হাফিজ ইব্রাহিম, এস কে আজিজুল বারী, মো. মনজুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ জাকির হোসেন, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও মো. রুহুল আমিন অংশ নেন।

উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সরকার মেধার পরিবর্তে কোটার দিকে ধাবিত হচ্ছে : সংসদে মাসুদ

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ৫০-৫০ নম্বর রাখার মাধ্যমে দলীয়করণ ও স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

এ ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মেধার পরিবর্তে কোটার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার প্রক্রিয়ার দিকে বর্তমান ব্যবস্থাপনা ধাবিত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, আমরা জাতির পক্ষ থেকে বড় প্রত্যাশা নিয়ে এ সংসদের দিকে তাকিয়ে আছি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর কোটার পরিবর্তে মেধাভিত্তিক সংসদ তৈরি হয়েছে— এটা সবার জানা। কিন্তু আমরা খুবই শঙ্কার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগবিধিতে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন এনে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ৫০-৫০ করে নম্বর রেখে দলীয়করণ, স্বেচ্ছাচারিতা এবং একই সঙ্গে মেধার পরিবর্তে একটা কোটার ভিত্তি পরিচালনা করার প্রক্রিয়ার দিকে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ধাবিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সমান করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রক্সি পরীক্ষা বা জালিয়াতি প্রতিরোধের যুক্তি দেখিয়ে প্রশাসনিকভাবে উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা চরমভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, প্রশাসনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয় লোক বসানোর রাস্তা এক্ষেত্রে সুগম হবে।

বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত নম্বর বিভাজন তুলে ধরে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ১১ থেকে ১২তম গ্রেডে আগে ১০ থেকে ৯০ শতাংশের যে বিভাজন ছিল, সেখানে ৫০-৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে আগে ১০ থেকে ৯০ শতাংশের বিভাজন থাকলেও তা পরিবর্তন করে ৪০ ও ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে আগে ১০ থেকে ৪০ শতাংশের বিভাজন থাকলেও এখন তা পরিবর্তন করে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি শুধু এটুকু বলি, কোটার ভিত্তিতে না হয়ে মেধার ভিত্তিতে দেশটা পরিচালনার জন্য এই সংসদ যেন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এ বিষয়ে রুলিং দেন। স্পিকার বলেন, পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদের চলমান বিষয়ের ওপর কোনো মন্তব্য থাকলে, কোনো ভুল হলে কিংবা সংসদের নিয়ম ভঙ্গের মতো কোনো বিষয় থাকলে সদস্যরা এভাবে বক্তব্য দিতে পারেন। তিনি বলেন, সংসদ কার্যক্রমের চলমান বিষয় ছাড়া নিয়োগবিধি নিয়ে তো এখন কোনো আলাপ-আলোচনা হচ্ছে না। সুতরাং এটি পয়েন্ট অব অর্ডার হলো না।