রাত পোহালেই পূর্ণ হচ্ছে তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রীতে¦ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারেরর ৬ মাস । চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার শপথ নেয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতার পথ চলা। পর্যালোচনা করতে গিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর একটি ইংরেজী দৈনিকের অনলাইন রিপোর্ট সামনে এসেছে। সেদিন নবগঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। দিনটি ছিল বুধবার। মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সালাহউদ্দিন বলেছিলেন, সরকারের প্রথম দিন একটা কেবিনেট মিটিং করতে হয়। আমরা সবাই বসেছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন, কিছু অনুশাসন দিয়েছেন। 'সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। আমরা এবার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছি,' যোগ করেন তিনি। সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে যেন সমস্যা না হয়, গ্যাস-বিদ্যুতের প্রতি লক্ষ্য রাখা প্রাথমিক অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছিলের সালাহউদ্দিন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথা অনুযায়ী সচিবদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের বলেছেন যে, জনগণ আমাদের ম্যানিফেস্টোর ওপর ম্যান্ডেট দিয়েছে। সুতরাং যেটা জনগণের ইচ্ছা সেটাই প্রাধান্য পাবে। সে হিসেবে সরকারের ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নের জন্য তারা আন্তরিক হবেন। 'সবাইকে আমরা বলেছি যে, কার কী অ্যাফিলিয়েশন আছে সেটা আমরা দেখব না। আমরা মেধার ভিত্তিতে সবাইকে যাচাই করব,' যোগ করেন তিনি।

সেদিনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মোটা দাগে সরকার ৪টি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রাথমিকভাবে টার্গেট করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরমধ্যে ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নিত্যপন্য সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে সংস্কার করে জ্¦ালানি সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।

চারটি বিষয়কে সামনে রেখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কোনটাই সরকারের ছয় মাসে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারেনি। আগের মতোই বাজারে সিন্ডিকেট আর চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ দেখা গেছে সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীরা কাঁচা মরিচ আমদানির দাবি সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলছে। তাতে জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়ছে হু হু করে। বাজারে গিয়ে প্রতিটি মানুষের নাবিশ্বাস ওঠেছে। সরিষার এক লিটার তেলের দাম ৩৬০ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। এছাড়া নিত্য পণ্যের বাজারকে স্থিতিশীল করতে সরকারেরর মনিটরিং সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম দিনের মন্ত্রীপরিষদ বৈঠকে সরকারেরর দ্¦িতীয় প্রাধান্য ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। কিন্তু বিগত ছয় মাসে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কমই চোখে পড়েছে। বরং সরকারি দলের নেতাকর্মীরা প্রভাব এবং আধিপত্য বিস্তার করতে নিজেরাই নিজেদের খুনোখুনির মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র আসকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের বিগত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া পৃথক রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতার ঘটনায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ জন নেতা কর্মী নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল এবং বিভিন্ন বেআইনি অর্থনৈতিক খাতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

পাশাপাশি একই সময়কালে দেশে সামগ্রিক অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের হারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুনÑএই চার মাসে সারাদেশে মোট ১ হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত ৩৮ জন নেতাকর্মীর পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছেÑএদের মধ্যে মূল দল বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতি দলের ১ জন সদস্য রয়েছেন।

তৃতীয় অগ্রাধিকার ছিল জ¦ালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। বর্তমানে জ¦ালানি খাতে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে। রীতিমত হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে জ¦ালানি খাতে। বলা হচ্ছে, গ্যাসের কারণে আজ রান্নার চুলা জ¦লছে না। দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারার অংশ হিসেবে বাজার থেকে উধাও করে দেওয়া হচ্ছে গ্যাসের বোতল। কেউ কেউ স্টক করছে এসব পণ্য। পেট্রোল পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর দীর্ঘ লাইন। মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে ব্যবসা করছেন সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী।

বলা হচ্ছে, নগরীর পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের হাহাকার চললেও অলিগলিতে চড়া দামে মিলছে ড্রামভর্তি তেল। একই মোটরসাইকেল ঘুরেফিরে বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প থেকে একাধিকবার তেল নিচ্ছে। সেই তেল বাইরে বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্য। এমন অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পেট্রোলপাম্প মালিকদের।

সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার যে অঙ্গিকার দেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তা রীতিমত বাতুলতায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করা হয়েছে। নতুন পুরাণো সিন্ডিকেট মিলে কাঁচা মরিচ পর্যন্ত আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেওয়া হলেও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী-সমর্থক, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব পেশাজীবীদের অনেকের মধ্যেই দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা লক্ষণীয়। পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠী বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়ন অব্যাহত, যা বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকারের ১৮০ দিনের অর্জন-সীমাবদ্ধতা জনতার কাছে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে এজন্য একটি কমিটি রয়েছে। তিনি নিজেও ওই কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

বিএনপি সরকারের ছয়মাস পূর্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার এবং ৩১ দফায় দেওয়া অঙ্গীকারের অধিকাংশ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তিনি বলেন, ‘ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, আবার কোথাও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে।