কিশোরগঞ্জ থেকে শামছুল আলম সেলিম, মোবারক হোসেন ও রফিকুল ইসলাম : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে এবং সমুচিত জবাব দিতে তিনি বিএনপির নেতাকর্মী এবং দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
গতকাল রোববার বিকেলে কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে আয়োজিত সামাজিক সুরক্ষা ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ; মেধাবী শিক্ষার্থী, অসুস্থ, দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুদান এবং মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যক্তিবর্গের সম্মানী প্রদান উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভ্রান্তকারীদের চোখে চোখে রাখতে হবে এবং তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ বিভ্রান্ত করতে এলে তাদের সমুচিত জবাব দিতে হবে।’
ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেছে বিএনপি সরকার। শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠনেই এই কার্ড কর্মসূচি।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পড়াশোনার সিলেবাস এমনভাবে করা হবে, যেন একজন শিক্ষার্থী আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। দেশের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে না পারলে দেশকে কখনো আত্মনির্ভরশীল করা সম্ভব হবে না।’
যে রাজনীতি দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, সেটাই বিএনপির রাজনীতি বলেও জানান দলটির সভাপতি। তিনি জানান, গত ছয় মাস আগের নির্বাচনে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সবগুলো একে একে পূরণ করা হচ্ছে। যারা এখন সংস্কারের কথা বলছেন, তারা গত ১৭ বছর কোথায় ছিলেন প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন- বিএনপি ২০২২ সালেই সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। সেই ৩১ দফা বাস্তবায়ন করছে সরকার।
সকালে সড়কপথে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা দেন প্রধানমন্ত্রী। পথে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও কটিয়াদিতে পৃথক অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। পাকুন্দিয়ার সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আগামীতে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেজন্য আমরা জনগণের কল্যাণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।’ এদিন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করার পর এক জনসমাবেশে বক্তব্যকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। উপস্থিত জনসাধারণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আপনারা হাজার হাজার মানুষ সমর্থন দিয়ে বলেছেন যে এই পরিকল্পনাগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ উপকৃত হবে। তাই আপনাদেরকে বলতে চাই, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আপনারা যে দলের ওপর আস্থা রেখেছেন, সেই আস্থা ধরে রাখুন। বিএনপি আপনাদের সাথে ছিল, বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের পাশে আছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের জন্যই কাজ করবে, ইনশাআল্লাহ। দেশ ও জনগণের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করবে না।’ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের সরকারের অপরিকল্পিত বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পদক্ষেপ বর্তমান সংকট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। আগামী ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হবে। সেখানে সরকার আগামী ১০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরবে। বিশৃঙ্খলাকারীদের সস্পর্কে সবাইকে সর্তক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রাস্তায়, রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। রাজপথে যদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি ও জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু উপকৃত হয় সেই সকল বিশৃঙ্খলাকারী।’
তিনি বলেন, ‘আজকে সবাই প্রতিজ্ঞা করি যে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা কাজ করবে, যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, যারা জনগণের স্বার্থে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করবে, তাদেরকে জনগণ সকল শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করবে।’ দেশের মানুষ এখন শান্তি চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন আইনের শাসন চায়, কর্মসংস্থান চায়, সন্তানদের জন্য শিক্ষা চায়, পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা চায়। এই কাজগুলো যদি করতে হয়, আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে হবে। একই সাথে যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে, তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।’ পাকুন্দিয়ায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। পরে অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে উঠলে হাজার হাজার নেতাকর্মী তাকে করতালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
এদিন ‘রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে প্রধানমন্ত্রী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মৎস্য খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সারাদেশে ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, পোনা অবমুক্তকরণ এবং মৎস্যচাষিদের উৎসাহিত করতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম স্বাগত জানান। মৎস্য উৎপাদন, গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাদের এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরে পদকপ্রাপ্তদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দীন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব দেলোয়ার হোসেন ও মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী কটিয়াদীর আচমিতা এলাকায় কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন।
জাতীয় মৎস্য পক্ষ অনুষ্ঠানের পর ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিভিন্ন অনুদান ও মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানীও প্রদান করেন।