• উপযুক্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র
  • হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের চাঞ্চল্যকর তথ্য
  • আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সরাসরি বৈঠকও করছেন হাসিনা
  • ফিটনেস বজায় রাখতে নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলছেন হাসিনা

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় অতিক্রম করছে, ঠিক তখনই পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের পক্ষ থেকে ঢাকার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করা হলো। আগস্ট দণ্ডিত শেখ হাসিনার উন্মুক্ত গত ৫ নতুন দিল্লীতে মিডিয়া ব্রিফিংয়ের কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লী সফরের অনুকূল পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আবহ তৈরিতে দিল্লীকে অবশ্যই হাসিনাসহ পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণ এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যার অভিযুক্তদের হস্তান্তরে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। গতকাল রোববার সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে সার্বভৌম সমতা ও জাতীয় মর্যাদাই হবে ঢাকার মূল ভিত্তি। ভারতের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ প্রস্তাবের সঙ্গে ২০১৩ সালের চুক্তির প্রয়োজনীয় আইনি ও বিচারিক নথিপত্র সংযুক্ত করে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা-দিল্লীর কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছেন, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক পলাতক প্রধানমন্ত্রী ও জুলাই গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্য আসামীদের অবিলম্বে ফেরত পাঠাতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে। এই গুরুতর সংবেদনশীল আইনি ও রাজনৈতিক বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের সফলতা নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে দ্বিধাদ্বন্দ রয়েছে। কারণ ফ্যাসিস্ট হাসিনা ইস্যুতে আদালতের উপরে দায় চাপিয়ে দিল্লীর ব্যাকফুট কূটনীতি খুব বেশি লাভ হবে না।

ভূরাজনীতি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব সর্বজনবিদিত। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক ও সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও নানা গুঞ্জন দেখা যাচ্ছে। একদিকে চলতি প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি ও তারিখ নির্ধারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লীতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে তাঁর উপস্থিত না হওয়ার সিদ্ধান্তের খবরও প্রকাশ্যে জানিয়ে দিল ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী ও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত হওয়ার পরও ভারতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি ৫ আগস্ট উপলক্ষে দিল্লীতে তাঁর দেওয়া বিতর্কিত সংবাদ সম্মেলন ও বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারবিভাগ ও জনগণের সেন্টিমেন্টকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের মাটিতে বসে কোনো নেতিবাচক বার্তা ছড়ানোর বিষয়টিকে ঢাকা সহজভাবে নিচ্ছে না।

এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি এখন কেবল দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক সমঝোতার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ভারতের বিচারিক পর্যালোচনার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অধীনে বাংলাদেশ যেভাবে আইনি নথি ভারতের কাছে উত্থাপন করেছে, তা এখন ভারতের আদালতের কাঠগড়ায় চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। ভারত কি ২০১৩ সালের চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে সম্মান জানাবে, নাকি আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের ঢাকা-নয়াদিল্লী সম্পর্কের গতিপথ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সাধারণ জনগণের ভাবাবেগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি সফল ও ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য কিছু জটিল ভূরাজনৈতিক বাধা ও অসংগতি দূর হওয়া জরুরি।

ভারতের পররাষ্ট্র ও বিচারিক কাঠামোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান, আইনগত ভিত্তি এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন, “আদালতের প্রক্রিয়ায় যা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তা হলো, যেসব অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ কি না।” ভারতে ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের অনুরোধ পাওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা (সিপিভি)’ বিভাগ বিচারিক পর্যালোচনার জন্য এক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিতে পারে। ওই ম্যাজিস্ট্রেট যদি প্রমাণ সাপেক্ষে দেখেন যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রামাণ্য ভিত্তি (প্রাইমা ফেসি) রয়েছে, তবেই হস্তান্তরের সুপারিশ করা সম্ভব। আর পর্যাপ্ত প্রামাণ্য ভিত্তি না থাকলে আদালত আসামীকে খালাস বা অব্যাহতি দিতে পারেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানরত জীবনযাপন এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে জানায়, দিল্লীতে ভারত সরকারের দেওয়া এক নিরাপদ আশ্রয়ে (সেইফ হাউস) অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। সেখান থেকে তিনি তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছেন এবং মাঝে মধ্যে তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকও করছেন। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তাঁর দৈনন্দিন রুটিনে ফিটনেস বজায় রাখতে নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভারতের সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট দিল্লীতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, “ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস, তাই আমি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই।”

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জনমতের মূল ভিত্তি হলো সমতা ও মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে পর রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা। ভারতকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশের পাওনা (যেমন: তিস্তা নদী পানি চুক্তি, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, বাণিজ্য ভারসাম্য) না পাওয়ার যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে, তা সমাধান না করে ভারতের মাটি স্পর্শ করা রাজনৈতিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও পরবর্তী সময়ে চীন সফর করেছেন। ভারত ছাড়াও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় মঞ্চে তড়িঘড়ি উপস্থিত না হয়ে কেবল একটি পরিপক্ব ও উপযুক্ত পরিবেশে ভারত সফর করাই ঢাকার কৌশলগত অবস্থান।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় কূটনৈতিক বার্তা প্রদান করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ. কে. এম. শাহিদুল করিম আজ এক ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেন, “একটি সফল ও অর্থবহ শীর্ষ সফরের জন্য ‘উপযুক্ত ও অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া আবশ্যক। আমরা ভারতের কাছে শেখ হাসিনাসহ বিচারপ্রক্রিয়ার অধীনে থাকা পলাতক ব্যক্তিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছি।”

অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী এবং দিল্লীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। ভারত চায় বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট ও সংযোগের ওপর ভিত্তি করে শীর্ষ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সফর বাস্তবায়িত হোক।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামের অভিমত, পূর্ববর্তী সরকারের মতো “একপক্ষীয় ছাড়” দেওয়ার মানসিকতা থেকে বাংলাদেশ সরে এসেছে। বর্তমান প্রশাসন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে আলোচনা করতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, “ভারতের কর্মকর্তাদের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তারা হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার চাপটি রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে ‘বিচারিক প্রক্রিয়ার’ দিকে ঠেলে দিতে চাইছে যা ভারতীয় গণমাধ্যমের নিউজে এসেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ ও খুনকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে আড়াল করার সুযোগ ভারতের বিচার বিভাগের নেই। বাংলাদেশ সরকারের যুক্তিসংগত নথিপত্র ভারতের আদালতে উঠলে বিচারিক প্যানেল আন্তর্জাতিক আইন মেনে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে বলেই আমি মনে করি। কারণ ভারত আদালতের উপরে দায় চাপিয়ে নিজেদের দায় সাড়তে চাইছে এটা পরিষ্কার।

সাবেক সিরিয়র কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাকিব আলী মনে করছেন, শুধু সৌজন্যমূলক সফর করে লাভ নেই। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি ও সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশীদের প্রাণহানি বন্ধে যদি লিখিত অগ্রগতি না আসে, তবে দেশের সাধারণ জনগণের কাছে এই সফরের বার্তা ইতিবাচক হবে না। “ভারত যদি বিষয়টিকে পুরোপুরি নিজেদের বিচার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়, তবে তা একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে। ভারতের আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ ও প্রাইমা ফেসি প্রমাণের সময়ক্ষেপণকে নয়াদিল্লী এক ধরনের ‘কূটনৈতিক বাফার’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে ঢাকাকে ভারতের আইনগত প্রতিটি পদে শক্ত আইনি প্রতিনিধি দিয়ে লড়তে হবে।”

সাবেক এই সিনিয়র কূটনৈতিকের মতে, ব্রিকস সম্মেলনে না গিয়ে আলাদা দ্বিপক্ষীয়ভাবে বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া কূটনৈতিক দিক থেকে যৌক্তিক। তবে তার আগে শেখ হাসিনা ইস্যুতে দিল্লীর কৌশলী অবস্থান পরিবর্তন না হলে দুই দেশের সুসম্পর্ক টেকসই হওয়া কঠিন ।