গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক সাংবাদিকদের সংগঠন ‘জুলাই জার্নালিস্ট ইউনিটি (জেজেইউ)’-এর আত্মপ্রকাশ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসিয়ারা জামান জেজেইউর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। এতে ফেস দ্য পিপলের সম্পাদক সাইফুর সাগরকে আহ্বায়ক এবং চ্যানেল আইয়ের আহসান কামরুলকে সদস্য সচিব নির্বাচিত করা হয়েছে।

নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন দৈনিক জাতীয় অর্থনীতির প্রকাশক লুৎফর রহমান বাদল, দৈনিক পাঞ্জেরীর সম্পাদক তালুকদার রুমী, এখন টিভির মাহমুদ রাকিব, চ্যানেল আইয়ের আকতার হাবীব, দ্য নিউ নেশনের শিমুল পারভেজ, ডেইলি ইন্ডাস্ট্রির রিয়াজুর রহমান রিয়াজ এবং দৈনিক জনকণ্ঠের ইসরাফিল ফরাজী।

যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন দৈনিক জনকণ্ঠের আবদুর রহিম, বাংলাভিশনের কেফায়েত শাকিল, ভিওডি বাংলার নুরুল ইসলাম খান মামুন, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ওবায়দুর রহমান, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক একেএম রেজাউল করিম, দৈনিক বর্তমানের নিজাম উদ্দিন দরবেশ এবং দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের রহমতুল্লাহ।

কমিটির সদস্যরা হলেন—অনলাইন বাংলার সম্পাদক খোমেনি এহসান, এটিএন বাংলার আল ইমরান, এশিয়া পোস্টের অন্তু মোজাহিদ, দৈনিক যায়যায়দিনের জালাল আহমেদ, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রাকেশ রহমান, সোনালী নিউজের সাজ্জাদ হোসেন, দৈনিক ইত্তেফাকের ডিজিটাল হেড ফখরুল ইসলাম, আরটিএনএনের আবু বকর সিদ্দিক, দৈনিক মানবজমিনের মিফতাহুল জান্নাত, বাংলানিউজের ফারজানা ববি, বাংলাদেশ টাইমসের তাসবির ইকবাল, নতুন আশার মোর্শেদুল আলম, দেশ রূপান্তরের কেফায়েত রুমী, দেশ টিভির মেহেদী হাসান বাপ্পি, চ্যানেল আইয়ের রাশেদ মানিক, বাংলাভিশনের ওমর ফারুক, স্টার নিউজের এইচএম ইমরান হোসেন এবং আজাদ বাণীর মেহরাজ রাব্বি।

আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে জেজেইউর আহ্বায়ক সাইফুর সাগর বলেন, “জুলাই জার্নালিস্ট ইউনিটি সময়ের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে। জুলাইপন্থী সব সাংবাদিকের জন্য এটি উন্মুক্ত। গণমাধ্যমকে সঠিক পথে রাখতে জুলাইয়ের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবে।”

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে গণমাধ্যমে পেশাগত স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করা হবে।

জেজেইউর সদস্য সচিব আহসান কামরুল বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংবাদমাধ্যম সঠিক ভূমিকা রাখতে না পারলেও এখনো গণমাধ্যমের কাছে মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।”

তিনি বলেন, গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, অন্যদের সমালোচনা করার আগে নিজেদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমরা যেন পূর্ববর্তীদের মতো হয়ে না যাই, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, কাউকে আহত করে এমন কথাবার্তার পরিবর্তে সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো নাটক, সিনেমা, গানসহ বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন, সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া অভ্যুত্থান সম্ভব ছিল না। আন্দোলনে সাংবাদিকদের ক্ষুদ্র হলেও সমর্থন ছিল। দলান্ধতার পরিবর্তে সাংবাদিকদের এখনও দেশের জন্য কাজ করে যেতে হবে।

আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, “প্রেসক্লাবে শেখ হাসিনার ছবি সাংবাদিকরাই ঝুলিয়েছিল। এখনও যাতে একই ধরনের কাজ না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য নিরপেক্ষভাবে সাংবাদিকতা করতে হবে। এমন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সরকার পরিবর্তন হলে সাংবাদিকদের পালিয়ে যেতে না হয়।

জেজেইউর যুগ্ম আহ্বায়ক তালুকদার রুমি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়েও বহু সাংবাদিক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তাঁরা সে সময় বঞ্চিত ছিলেন, এখনও বঞ্চিত। জুলাইয়ের সাংবাদিকদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জেজেইউ কাজ করে যাবে।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

জেজেইউর সদস্য ও অনলাইন বাংলার সম্পাদক খোমেনি এহসান স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “এটি এমন এক উদ্যোগ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্ভয়ে সত্য বলার অধিকার নিশ্চিত করা।”

তিনি বলেন, হামলা, মামলা ও চাকরিচ্যুতির হুমকি যেন সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দিতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই সংগঠনের অন্যতম অঙ্গীকার। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা এবং জনগণের জানার অধিকারের পক্ষে জেজেইউ অবস্থান করবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে শহীদ জাবির ইব্রাহিমের বাবা কবির হোসেন এবং শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসিয়ারা জামান বক্তব্য দেন। তাঁরা দেরিতে হলেও জুলাইয়ের সাংবাদিকদের নিয়ে এমন একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হওয়ায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তাঁরা বলেন, সংগঠনটি যেন ন্যায় ও সত্যের পক্ষে কাজ করে এবং কারও প্রতি অন্যায় না করে। এমনকি চরম শত্রুও যেন অন্যায়ের শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।

বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থের বাইরে থেকে জনগণের কাছে সত্য ও নির্ভুল তথ্য তুলে ধরতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক নেতা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা নবগঠিত জেজেইউকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা এবং জনগণের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।