সিলেট ব্যুরো
বিদ্যুতের দাবিতে ও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠছে বিভাগীয় নগরী সিলেটসহ সিলেটের প্রতিটি জেলা-উপজেলার মানুষ। সুনামগঞ্জে একই দাবিতে গত সোমবার রাতে শিল্প শহর ছাতক, সিলেট সুনামগঞ্জ সড়কের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে প্রতিবাদী জনতা। এরপরও টনক নড়ছে না সরকারের। একদিকে লোডশেডিং অপরদিকে ভুতুড়ে বিলের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পুড়ছে সিলেট, পুড়ছেন সিলেটবাসী। চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ার পাশাপাশি ঘনঘন লোডশেডিং এর কারণে অতিষ্ঠ গোটা সিলেটের মানুষ।
৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে বিদ্যুতের ভেল্কিবাজী। রাগে আর ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। গরমের সঙ্গে পেরে উঠার কোনো সুযোগ কারো নেই। পাশপাশি বিদ্যুতের এমন রঙতামাশার কাছেও যেনো সবাই অসহায়। এখন শ্রাবণ মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে। এবার এই শ্রাবণে অন্যান্য বছরের তুলনায় বৃষ্টিপাত একেবারেই কম হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ১৫ মিলিমিটার। এ অবস্থায় গরম বাড়ছে।
গতকাল মঙ্গলবার সিলেট অঞ্চলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন বৈরী শ্রাবণে জনদুর্ভোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ঘন্টায় ঘন্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। গেলে আসার কোনো নাম থাকছেনা। এলেও কতসময় থাকবে তা নিয়ে রীতিমতো হতাশায় কাটছে নাগরিক জীবন।
এই প্রচন্ড গরমে শিশু ও বয়স্কদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অনেকেই অসুস্থ হয়ে ছুটছেন ডাক্তারের কাছে। কেউ কেউ ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। গরমজনিত নানান রোগবালাইয়ের উৎপাতও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে।
এদিকে শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বিশেষ করে কায়িক শ্রমের সঙ্গে জড়িতদের অবস্থা সবচেয়ে বেশী খারাপ। নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে বিশ্রাম করতে দেখা যাচ্ছে। ঠেলা ও রিকশাচালকদের অবস্থা ও একই।
প্রচ- গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সিলেট বিভাগের জনজীবন। দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানি ওঠানোর মোটর চালানো যাচ্ছে না, দেখা দিয়েছে পানির সংকট। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ ও ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ-মাংস, দুধ, আইসক্রিমসহ বিভিন্ন খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন চলে যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রচ- গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে একদিকে ঘুমের ব্যাঘাত, অন্যদিকে মশার উপদ্রব সব মিলিয়ে নাকাল হতে হচ্ছে মানুষকে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যেও। দোকানপাট, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, মিষ্টির দোকান, ফার্মেসি, ফটোকপি ও কম্পিউটার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসহ বিদ্যুৎ নির্ভর প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো যাচ্ছে না। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকও ফিরে যাচ্ছেন।
এদিকে বর্তমানে চলছে এইচএসসি পরীক্ষা। লোডশেডিংয়ের কারণে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার মধ্যে খারাপ প্রভাব পড়ছে। রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলে গরম ও অন্ধকারের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইন ক্লাস, কম্পিউটার ভিত্তিক পড়াশোনা কিংবা মোবাইল ল্যাপটপে শিক্ষামূলক কাজও ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুনামগঞ্জে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
এদিকে, সুনামগঞ্জের ছাতক পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে জেলার বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা।
গত সোমবার রাত ৮টা থেকে জেলার জাউয়া বাজার, চেচান ও কালারুকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। এতে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কসহ ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের উভয় পাশে আটকা পড়ে হাজার হাজার যানবাহন।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জাউয়া বাজার ও কালারুকা ফিডারের আওতাধীন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে এবং বিদ্যুত আসা-যাওয়া করছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অফিস-আদালতের কার্যক্রমসহ স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবিতে সোমবার সন্ধ্যায় প্রথমে জাউয়া বাজার এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। পরে চেচান ও কালারুকা এলাকাতেও একই কর্মসূচি পালন করা হয়।
অবরোধের কারণে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের জাউয়া বাজার ও চেচান এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের দুই পাশে আটকা পড়ে অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস, সিএনজি, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
চাহিদার অর্ধেকও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সিলেট অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সময়-সময়ে ক্ষোভ বাড়ছে। যেকোন সময় ফুঁসে উঠতে পারে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের মানুষ।