চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সীতাকুণ্ড সংবাদদাতা : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে পুরোনো একটি এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত নয়জন শ্রমিক মৃত্যু হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকালে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে জাহাজের ভেতরে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। ভাটা শুরু হলে আবারও তল্লাশি চালানোর কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

মৃত্যু নয়জন হলেন-নাসির উদ্দিন (৩৮),মনসুর আলী (৪০), হাবিবুর রহমান (৫০),রহমান জিহাদ (৫৩),সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭),মো. খোকন (৪০), মো. রানা (২৭), আব্দুল আলিম সুজন (২৫) ও মতিউর রহমান সাজ্জাদ। মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন আপন দুই ভাই বলে জানা গেছে। খোকন ও রানা গাইবান্ধার বাসিন্দা।

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আল মামুন জানান, সীতাকুণ্ডে দুটি লাশ রয়েছে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ছয়টি লাশ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃতে্যুর সংখ্যা নয়জন।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে কুমিরা ফায়ার স্টেশনে ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার খবর আসে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট, একটি রেসকিউ ভ্যান ও অ্যাম্বুল্যান্স ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।

তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে তিনটি লাশ ও দুইজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিকটস্থ বিএসবিএ হাসপাতালে পাঠান। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় একজন ফোরম্যানকেও উদ্ধার করে অ্যাম্বুল্যান্সে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজনও কয়েকজনকে উদ্ধার করেন।

তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, দুর্ঘটনাটি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আগে ঘটেছে বলে তারা জানতে পারেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরও গ্যাস বা রাসায়নিকের তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। তবে পরে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় দুর্গন্ধ আর পাওয়া যায়নি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ধারণা, কার্বন মনোক্সাইড অথবা কার্বনজাত উপজাতীয় গ্যাসের কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাহাজটি একটি পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভেতরের গ্যাস, রাসায়নিক ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ সম্পূর্ণ অপসারণ করার কথা।

ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় জাহাজের পাইপ কাটার জন্য কয়েকজন শ্রমিক ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সামনে থাকা শ্রমিকরা প্রথমে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে মারা যান। কিছুটা দূরে থাকা শ্রমিকরাও পরে গ্যাসে আক্রান্ত হন।

এদিকে জাহাজে জোয়ারের পানি ঢুকে যাওয়ায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ভেতরে পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অ্যাম্বুল্যান্স ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে ভাটার অপেক্ষায় ছিলেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জাহাজের ভেতরে আরও শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন। পানি নেমে গেলে সর্বশেষ সার্চ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম বলেন, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আটজন মারা হয়েছেন। তাঁদের লাশ চমেক হাসপাতালে রয়েছে। আহতদের মধ্যেও কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃত্যের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

‘খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা’ : দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি মৃতুদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন এবং আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার খোঁজ নেন।

এ সময় তিনি বলেন, “খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।” দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে সরকারের দায়িত্ব সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের করে আনা।

মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মৃত্যু প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার পর সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গেছে। তারা গ্যাস নির্গমন বন্ধ করার চেষ্টা করছে। শিপব্রেকিং শিল্পে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের মানদণ্ড ও সনদ দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

মৃত পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা : চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা চমেক হাসপাতালে গিয়ে মৃতেদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, মৃতদের প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন এ অর্থ দেবে।

জেলা প্রশাসক জানান, ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি দল ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গেছেন। দুর্ঘটনার কারণ ও ইয়ার্ডে নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।

দীর্ঘদিনের ঝুঁকি, ৯ বছর ৯ মাসে নিহত ১৩৭ : সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সেন্টার কো-অর্ডিনেটর এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ৯ বছর ৯ মাসে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় ১৩৭ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ২৩৯ জন।

তার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আরও তিনজন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্তকরণ, রাসায়নিক অপসারণ ও নিরাপত্তা যাচাই না করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। সর্বশেষ দুর্ঘটনাও শিপব্রেকিং শিল্পে নিরাপত্তাব্যবস্থা, শ্রমিক সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে।

এদিকে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং জাহাজ কাটার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও গ্যাসমুক্তকরণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না-তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর তা পরিষ্কার হবে।

জামায়াতের শোক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিক হয়ে শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু এবং ১০ থেকে ১৫ জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনায় তিনি গভীরভাবে শোকাহত।

তিনি নিহত শ্রমিকদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিকদের দ্রুত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই দুর্ঘটনা কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ঘটেছে কি না, তা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।

চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াত নেতৃবৃন্দের শোক

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ ইয়ার্ডে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ৮ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।