নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো

কয়েক দিন স্বস্তির পর আবারও তীব্র গ্যাস-সংকটে পড়েছে চট্টগ্রাম। গত মঙ্গলবার রাত থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকের চুলা জ্বলছে না। একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকেরা। সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাতেও। গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে চট্টগ্রামের ভারী শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ নেমে এসেছে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে আবাসিক, পরিবহন, শিল্প ও বাণিজ্যিক-সব খাতেই সংকটের প্রভাব পড়ছে।

গতকাল নগরের ষোলোশহর, টাইগারপাসসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মোহাম্মদ নোমান নামের এক অটোরিকশাচালক জানান, সকাল ৭টার দিকে ষোলোশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে লাইনে দাঁড়ান। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্তও গ্যাস পাননি। এর মধ্যে টাইগারপাসসহ কয়েকটি স্টেশনে ঘুরেও গ্যাসের সন্ধান পাননি তিনি।

নোমান বলেন, ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ থাকলেও চাপ খুবই কম। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। এ কারণে স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে।

বৈরী আবহাওয়ায় এলএনজি জাহাজ আটকা : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের সংকটের প্রধান কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন কার্গো জাহাজ ভিড়তে না পারা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল থাকায় নিরাপত্তার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে নেওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে একটি টার্মিনালের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব জানান, এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবে বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকলে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট হওয়ায় নিরাপত্তার কারণে জাহাজটি টার্মিনালে নেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি জানান, বর্তমানে মহেশখালীর টার্মিনালগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে।

ভারী শিল্পে উৎপাদন বন্ধ : গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিল্প খাতে। চট্টগ্রামের সিইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, কালুরঘাট, সীতাকুণ্ড, নাসিরাবাদ ও পতেঙ্গা শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ভারী শিল্পকারখানার অনেক মেশিন পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকট সামাল দিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারী শিল্পকারখানাগুলোকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকছে, অন্যদিকে শ্রমিক, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খাতে ব্যয় অব্যাহত থাকছে। দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চললে শিল্পকারখানার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে এবং রপ্তানি কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

আগের সংকট কাটতে না কাটতেই ফের ধাক্কা : এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে টার্মিনালের একটি বয়লার চালু করে আংশিক সরবরাহ শুরু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইনও ধীরে ধীরে কমে আসে।

কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। নতুন করে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় আবারও সরবরাহ কমে গেছে। ফলে কয়েক দিনের ব্যবধানেই চট্টগ্রামবাসীকে নতুন করে গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সংকট কাটাতে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আবহাওয়ার উন্নতি। বাতাসের গতি কমে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে পারলেই নতুন করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। তার আগে পর্যন্ত চট্টগ্রামকে চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

এদিকে আবাসিক গ্রাহকদের অভিযোগ : সকাল-বিকেল নির্ধারিত সময়ে রান্নার চুলায় গ্যাস না থাকায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের কারণে যাত্রী পরিবহনেও এর প্রভাব পড়ছে। সব মিলিয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানেই গ্যাস সংকট আবার চট্টগ্রামের জনজীবন ও শিল্প অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।