রেজাউল করিম রাসেল, কুমিল্লা অফিস:

তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কুমিল্লাবাসী। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাবে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) আওতাধীন কুমিল্লাসহ ছয় জেলার প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন। আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের পাশাপাশি সিএনজি চালিত যানবাহনের চালকরাও পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। গ্যাসের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে আয় কমছে চালকদের, অন্যদিকে যানবাহন সংকটে ভোগান্তি বাড়ছে যাত্রীদের।

‎বিজিডিসিএলের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অনাকাক্সিক্ষত পর্যায়ে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সারা দেশের মতো বিজিডিসিএলের বিতরণ এলাকাতেও গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। কোম্পানিটির আওতাধীন জেলাগুলো হলো—কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

‎গ্যাস সংকটের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। কুমিল্লা নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন স্টেশনে গ্যাস নিতে সকাল থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অটোরিকশা, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

‎সিএনজি অটোরিকশাচালক মো. শাহ আলম বলেন, ‘গ্যাস নেওয়ার জন্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দিনের বড় একটা সময় যদি লাইনে চলে যায়, তাহলে গাড়ি চালাব কখন? ট্রিপ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে।’

‎আরেক চালক মো পলাশ বলেন, ‘গ্যাসের সংকটে আমরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়ছেন। গ্যাস শেষ হলে আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। ফলে আগের মতো ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

রান্নায় দুর্ভোগ

‎গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার রান্নার সময়ে অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে চুলা জ্বললেও স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় গ্রাহকদের বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

‎নগরীর কাপ্তান বাজারে সালেহা বেগম নামে গৃহিণী বলেন, ‘সকালে ও সন্ধ্যায় রান্নার সময় গ্যাসের চাপ একেবারেই থাকে না। চুলা জ্বললেও আগুনের তীব্রতা কম। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

বাড়ছে সিলিন্ডার-লাকড়ির চাহিদা

‎গ্যাস সংকটের কারণে এলপিজি সিলিন্ডার ও লাকড়ির চাহিদা বেড়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, সংকটের সুযোগে কোথাও কোথাও বিকল্প জ্বালানির দামও বাড়ানো হচ্ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

‎এক গ্রাহক বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এখন আবার সিলিন্ডার ও লাকড়ির দামও বেশি। এতে সংসারের খরচ বেড়ে গেছে।’

‎গ্রাহকরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সংকটের সুযোগে সিলিন্ডার ও লাকড়ির অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকির দাবি জানিয়েছেন।

শিল্প-বাণিজ্যেও প্রভাব

‎গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে শিল্প ও বাণিজ্য খাতেও। গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও বাজারব্যবস্থায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

‎ভুক্তভোগীদের মতে, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও।

দ্রুত সমাধানের দাবি

‎বিজিডিসিএলের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) থেকে এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাহকদের সহযোগিতা কামনা করেছে কর্তৃপক্ষ।

‎তবে গ্রাহকদের দাবি, দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করে গ্যাসের চাপ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কার্যকর এবং বিকল্প জ্বালানির বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

‎বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনে গ্রাহকরা হটলাইন ১৬৫২৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।

‎প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহকের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি এখন কুমিল্লাসহ বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ এলাকার মানুষের।