বগুড়ার সোনাতলা রেলওয়ে স্টেশনের শতগজ দূরে রেলওয়ের জমিতে জোরপূর্বক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বর্বরোচিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা। রেল কর্তৃপক্ষ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পরই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মী ও অনুসারীরা। সোনাতলা রেল কর্মকর্তারা অবৈধ স্থাপনার নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতনদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন এই ‘অপরাধে’ স্টেশনে ঢুকে তাণ্ডব চালায় হামলাকারীরা। এতে দুই স্টেশন মাস্টারসহ অন্তত ৭ জন রেল কর্মচারীকে অবরুদ্ধ করে বেদম মারধর করা হয়। পরে স্টেশন মাস্টারের কক্ষে তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর করা হয় আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সোনাতলা রেল স্টেশনটি সাময়িকভাবে ‘ক্লোজড ডাউন’ (কার্যক্রম স্থগিত) ঘোষণা করেছে। এর ফলে স্টেশনটিতে সাময়িকভাবে সব ধরনের টিকিট বিক্রি, ক্রসিং ব্যবস্থা এবং অফিশিয়াল সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে; কেবল নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ট্রেনগুলো এসে থামছে ও ছেড়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, সোনাতলা রেল স্টেশন সংলগ্ন হরিজন পাড়ার দুর্গা মন্দির ও সড়কের পশ্চিম পাশের রেলওয়ের ফাঁকা জায়গায় স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী গর্ত খুঁড়ে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি কোনো বৈধ অনুমোদন বা রেলওয়ের ছাড়পত্র ছাড়াই সরকারি ওই জমিতে পাবলিক টয়লেট ও দোকান জাতীয় একটি স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেন সোনাতলা উপজেলা বিএনপির নামধারী কিছু নেতাকর্মী। কর্মচারীদের দাবি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের কথা বলে তড়িঘড়ি করে অবকাঠামো গড়ার চেষ্টা চলছিল, যাতে পরবর্তীতে তা ভাড়া দিয়ে ইজারা বাণিজ্য চালানো যায়। বিষয়টি নজরে এলে বগুড়া এবং লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগীয় আইডব্লিউ (ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) অফিস থেকে সোনাতলা স্টেশনের কর্তব্যরত স্টেশন মাস্টার রবিউল ইসলামকে খোঁজ নিতে বলা হয়। নির্দেশ পেয়ে স্টেশন মাস্টার ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজের সত্যতা পান এবং অবৈধ এই দখলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বগুড়া জিআরপি (রেলওয়ে পুলিশ) ও আরএনবি (রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী) কার্যালয়ে লিখিত বার্তা (মেসেজ) হিসেবে পাঠান। মেসেজের সূত্র ধরে সকালে বগুড়া থেকে জিআরপি ও আরএনবি পুলিশের একটি দল সোনাতলায় এসে অভিযান চালায়। অভিযানে তারা নির্মাণাধীন অবৈধ ঘরের নবনির্মিত ৩টি খুঁটি ও পাইলিং ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। আরএনবি ও জিআরপি টিম স্থান ত্যাগ করতেই চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দখলদার চক্রটি। স্টেশন মাস্টার রবিউল ইসলাম জানান, অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই তিনি প্ল্যাটফর্ম হয়ে নিজ কক্ষে প্রবেশ করছিলেন। এমন সময় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ‘কৌটো বাবু’ ও তার সহযোগী পারভেজ, শহিদুল, নয়নসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল অতর্কিত হামলা চালায়। তারা স্টেশন মাস্টারের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। স্টেশন মাস্টার আরো বলেন, “ওরা আমাকে ও সহকর্মীদের ধরে ধরে আটকে ফেলে বেদম মারধর শুরু করে। তারা চড়-থাপ্পড় আর ঘুষি মারতে মারতে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তুই বার্তা পাঠালি কেন? তোর বার্তা পাঠানোর কারণে আমাদের ক্ষতি হলো। তোকে মেরে ফেলা হবে, আজ রাতে তুই এখানে ডিউটি করতে পারবি না, এরপর ওরা স্টেশনের কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম ভেঙে তছনছ করে।”

হামলায় গুরুতর আহত ও লাঞ্ছিত হন কর্তব্যরত দুই স্টেশন মাস্টার রবিউল ইসলাম ও আব্দুল মাজেদ, পয়েন্টসম্যান আব্দুর রহমান ও মোঃ সাজ্জাদুর রহমান, বুকিং সহকারী মাসুম পারভেজ এবং পোর্টার দুলাল হোসেন। এছাড়া আইডব্লিউ অফিসের কর্মচারী মোঃ শামীম হোসেন ছবি তোলার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তার কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকেও মারধর করে।

ঘটনার পরপরই পুরো সোনাতলা স্টেশন এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেখানে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের নিরাপত্তা পুরোপুরি বিঘ্নিত হওয়ায় রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগীয় সদর দপ্তর ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সোনাতলা রেল স্টেশনটি ‘ক্লোজড ডাউন’ ঘোষণা করা হয়। স্টেশন মাস্টার রবিউল ইসলাম জানান, বর্তমানে তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। এই পরিস্থিতিতে স্টেশনের অফিশিয়াল কাজ চালানো অসম্ভব। তিনি স্থানীয় সোনাতলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং বগুড়া জিআরপি থানায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সরকারি কাজে বাধা, রেলওয়ের জমিতে অবৈধ দখল চেষ্টা এবং রেলওয়ের সম্পত্তি ধ্বংস ও কর্মচারীদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

বগুড়া রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী আসলাম হোসেন জানান, স্টেশন মাস্টারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার জেরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। উচ্ছেদ অভিযানের পর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ‘বাবু’ ও তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে দলবল নিয়ে স্টেশনের ভেতরে ঢুকে স্টেশন মাস্টারকে বেদম মারধর করে। এ সময় হামলাকারীরা প্রকৌশলী আসলাম হোসেনের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে উচ্ছেদের ছবি ও ভিডিও মুছে দেয় এবং জিআরপি ইনচার্জকে লাঞ্ছিত করে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে সোনাতলা রেল স্টেশনের সব ধরনের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লোজড ডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।