উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এতে উপজেলার চরাঞ্চলের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুর্গত এলাকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বন্যার পানির সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। ঘরবাড়ি ও বসতভিটার আশপাশে সাপের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন পানিবন্দি মানুষ। বিশেষ করে রাতের বেলায় সাপের ভয়ে অনেকে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি বাড়ার এ প্রবণতা শুরু হয়। এক সপ্তাহে ওই পয়েন্টে নদীর পানি প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপৎসীমার ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ পয়েন্টে নদীর বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। বর্তমানে পানি ১৩ মিটারের আশপাশে রয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল জানান, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় নৌকার মাধ্যমে মানুষকে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় ডিঙি ও ছোট নৌকা এখন চলাচলের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান উদ্দিন জানান, তাঁর ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। এতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বুধবার দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ জানান, রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে দুর্গত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা রাখা হয়েছে। বিকল্প উপায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখারও চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে কৃষি অফিস জানিয়েছে, পদ্মার পানিতে দুই ইউনিয়নের প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্গত মানুষের দাবি, দ্রুত পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।