কুড়িগ্রাম থেকে মোস্তাফিজুর রহমান : চলতি বছরে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে বাস্তবতার আলোকে চলমান আমন মৌসুমে কৃষকের প্রকৃত সারের চাহিদা আমলে না নেওয়ায় সারের জন্য কৃষকগণ কিছুটা হতাশ হচ্ছেন বলে মনে করেন সচেতন কৃষক ও গবেষকগণ। পুরোনো ছকেই চলছে সারসংক্রান্ত সরকারের সব কার্যক্রম। অঞ্চলভিত্তিক সারের যে বরাদ্দ ছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন না এনে একই ধাঁচে চলছে এর বিলি-বণ্টন। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে সংকটে পড়ছেন কৃষক। এতে অনেকটা বাধ্য হয়ে সার লুটপাট করছেন তারা। চলতি ফসলের আবাদ ও চাহিদা অনুযায়ী জরিপ করে বরাদ্দ না বাড়ালে এ সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সারের চাহিদা অনেক বেড়েছে। কারণ, এখন একই জমিতে কয়েকবার ফসল হচ্ছে। তাছাড়া দেশে মাছ চাষও বেড়েছে। এজন্য প্রচুর সারের প্রয়োজন।
সার সংকটের বিষয়টি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংসদে বক্তব্য রাখেন ২৭ কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের সংসদ সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণমুখী সংগঠন, উলিপুর উন্নয়ন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী এমপি।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, কুড়িগ্রামের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেছেন, সারের কোনো সংকট নেই। যেটা দেখা যাচ্ছে, এটা কৃষকদের বাড়তি চাহিদা। এখানে বৃষ্টি না হওয়ায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানক্ষেত শুকিয়ে রোপা আমনের চারা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ায় বাড়তি সার দিয়ে আবাদ সচল রাখতে কৃষকগণ বাড়তি সার প্রয়োগের চিন্তা মাথায় নিয়ে সার সংগ্রহের আগ্রহ থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটা আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যেই বাড়তি চাহিদা থাকবে না। এখনই বৃষ্টি হলে আবাদ ফিরে আসবে এবং কৃষকের মুখে হাসি আসবে। তিনি আরও বলেন, অনেকে আগাম আলু ও ভুট্টা চাষের জন্য সার সংগ্রহ করছেন। সে কারণেও বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষি আবাদের ক্ষেত্র বাড়লেও সারের বরাদ্দ বাড়েনি—এ অভিযোগ শুধু কৃষকের একার নয়, এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও সারসংক্রান্ত সংগঠনগুলোর বক্তব্যেও একই তথ্য উঠে এসেছে। তবে এ দাবি মানতে রাজি নয় সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) যুক্তি, এখন পর্যন্ত দেশের মানচিত্রে নতুন কোনো ভূখণ্ড বা দ্বীপাঞ্চল যুক্ত হয়নি। তাই জমি ও আবাদের পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে।
কৃষি ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে গড়ে আনুমানিক ১১০ থেকে ১১৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। এর মধ্যে আমন চাষ হয় প্রায় ৫৭ থেকে ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে, বোরো প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর এবং আউশ ধান হয় ১০ থেকে ১৩ লাখ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ বোরো ও আমন প্রধান দুটি ধান হলেও আউশের আবাদ তুলনামূলক কম জমিতে হয়। এর বাইরে শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ বাড়ায় সারের চাহিদা বেড়েছে, যা গণনায় আনছে না কৃষি মন্ত্রণালয়। সার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান কৃষি সচিব বিষয়টি অনুভব করলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহের কারণে তিনিও খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) কুড়িগ্রাম জেলা কমিটির সেক্রেটারি বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, সার আমরা যা পাই, তাই বিতরণ করি। বিশেষ কোনো সংকট নেই। তবে কৃষকের বাড়তি চাহিদা থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, মাঠপর্যায়ে সারের চাহিদা যে বেড়েছে, তা নীতিনির্ধারকরা মানতেই চান না। দেশে শুধু ধান নয়, অন্যান্য ফসল ও শাকসবজির আবাদও বেড়েছে। সেটাও তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। মান্ধাতার আমলের বরাদ্দ দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফসলের আবাদ ও চাহিদা অনুযায়ী জরিপ করে বরাদ্দ না বাড়ালে এ সংকট কাটবে না।
এদিকে, সার বিক্রি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিলার পয়েন্টগুলোয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা।
এছাড়া বিভিন্ন স্থানে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মূল্যতালিকা না টাঙানো ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির দায়ে ডিলার/খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়। তা সত্ত্বেও সার সংকট ও ক্ষোভ থামানো যাচ্ছে না বলেও দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় বাজারে মধ্যরাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে প্রায় শতাধিক বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান বলে খবর পাওয়া গেছে। এর আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে ডিলারের গুদাম ভেঙে প্রায় দেড় শতাধিক বস্তা সার নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সারের দাবিতে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, লালমনিরহাট ও রাজশাহীতে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের মতো ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রশাসন সরাসরি ‘লুটপাট’ অস্বীকার করে দাবি করেছে, অতিরিক্ত ভিড় ও গুজবের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় কিছু সার খোয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ১ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৩৯৬ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৯৭ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮৫৭ টন মজুত রয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ে এমওপির মজুত ছিল দুই লাখ ৮২৬ টন, যা এবার প্রায় অর্ধেক।
এছাড়াও আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে ইউরিয়া ১৪.৯৬ লাখ টন, টিএসপি ৪.৬৮ লাখ টন, ডিএপি ১০.২৩ লাখ টন এবং এমওপি ছয় লাখ টনসহ মোট ৩৫.৮৭ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে এই সময়ে ৩৬.৭৬ লাখ টন সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, জেলায় চলতি মাসে ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ৩৭৪৪ মেট্রিক টন। যা গত ২৭-০৮-২০২৬ থেকে ০৯-০৯-২০২৬ ইং পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ৩২৫৪ মেট্রিক টন। বাকিটা আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম বাফার কর্তৃপক্ষ।
২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলাভিত্তিক বিভিন্ন রাসায়নিক সারের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সার সংকটের মধ্যেও কিছু জেলায় সামান্য বাড়লেও বেশিরভাগ জেলায় বরাদ্দ আগের মতোই রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো জেলায় গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ কমানোও হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান বলেন, দেশে সারের সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে শাস্তি ও জরিমানা আদায় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ থেকে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এ ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে না।