যশোরে পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যশোরের গ্রামাঞ্চলে এখন কোরবানির পশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও কৃষকরা। খামারে খামারে বাড়তি যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে গরু, ছাগল ও ভেড়া। কয়েক মাসের শ্রম, বিনিয়োগ ও পরিকল্পনাকে ঘিরে এবারও কোরবানির বাজার নিয়ে বড় আশা দেখছেন তারা।তবে সেই আশার পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে রয়েছে গভীর শঙ্কাও।
গত বছরের কোরবানির বাজারে লোকসান, শেষ মুহূর্তে কম দামে পশু বিক্রি, অবিক্রিত গরু নিয়ে বাড়ি ফেরা এবং বাজার সিন্ডিকেটের অভিযোগ এখনো তাড়া করে ফিরছে অনেক খামারিকে।ফলে এবার পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও লাভজনক দামে বিক্রি করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আট উপজেলায় এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৩৬ হাজার ২৫৯টি, ছাগল ৮১ হাজার ২৭৬টি এবং ভেড়া ৪৪২টি।
জেলায় কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৮১২টি। সে হিসাবে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এবার কোরবানির পশু বিক্রিকে ঘিরে কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে যশোরের কোরবানির পশুর চামড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়ার মোকাম রাজারহাটের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, জেলার আট উপজেলায় নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৪০টি এবং গবাদিপশু চাষির সংখ্যা ১৪ হাজার ১৩৫ জন।খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে, যাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজা করা হয়।
তবে খামারিরা বলছেন, গরু মোটাতাজাকরণে হরমোন ব্যবহারের যে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে তার বেশিরভাগই ভিত্তিহীন। অধিকাংশ খামারেই এখন প্রাকৃতিক খাদ্যের মাধ্যমেই পশু লালন-পালন করা হচ্ছে।
যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের শাহাবাটি গ্রামের খামারি আব্দুর রউফ জানান, তার খামারে বর্তমানে ৩৬টি উন্নত জাতের ষাঁড় রয়েছে। প্রতিটির ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ কেজির মধ্যে। সবুজ ঘাস, ভুট্টা ও গমের ভুসি খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরুগুলো মোটাতাজা করা হয়েছে।
তবে গত বছরের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, শেষ সময়ে এসে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে কয়েকটি গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। এতে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে। হাটে ক্রেতা কম ছিল, আবার কিছু ব্যবসায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও অভিযোগ ছিল। এবার ভালো দাম পাব কিনা, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছি।
একই উপজেলার কিসমত নওয়াপাড়া গ্রামের খামারি সাইফুল ইসলামও একই ধরনের শঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, এবার ২০টি গরু প্রস্তুত করেছি। কয়েক মাস ধরে পরিচর্যা চলছে। কিন্তু গত বছর অনেক খামারি বিপাকে পড়েছিলেন। কেউ কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কারও গরু অবিক্রিত থেকেছে।
তার ভাষায়, বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। ছোট খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাননি। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা না হলে ক্ষুদ্র খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
খামারিদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে পশুখাদ্য, খড়, ভুসি, ভুট্টা ও ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে কোরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা ও তদারকি জোরদারের কথা জানিয়েছে প্রশাসন। জেলা পুলিশ সুপার সয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে কেনাবেচা করতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে অস্থায়ী হাট বসানোর বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান জানান, জেলার প্রতিটি পশুর হাটে ভেটেরিনারি টিম কাজ করবে। অসুস্থ পশু, পেটে বাচ্চাযুক্ত গাভী কিংবা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মোটাতাজাকরণ করা পশু যাতে বাজারে বিক্রি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।
উল্লেখ্য, একসময় যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোরবানির পশুর বাজার অনেকটাই ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে ২০১৬ সালে ভারত থেকে গরু আমদানি কার্যত বন্ধ হওয়ার পর এ অঞ্চলে দেশীয় খামার গড়ে ওঠে ব্যাপকভাবে। বর্তমানে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি যশোরের খামারিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় কোরবানির পশু সরবরাহ করতে পারবে।