আহসানুল হক জুয়েল, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) : কিশোরগঞ্জ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা। এই জেলাটি ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এরমধ্যে চারটি উপজেলা হাওর উপজেলা নামে পরিচিত। উপজেলাগুলো হলো- নিকলী, ইটনা, মিঠামইন,ও অষ্টগ্রাম। জেলার হাওরবাসীর জন্য ২০০১ সালের দিকে সাবমারসিবল রোড বা ডুবো সড়ক নির্মাণ করা হয় হাওর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এই ডুবো সড়ক গুলো দিয়ে হাওড় অঞ্চলের জনগণ তাদের কৃষি পণ্য যেমন বোরো ধানসহ কৃষিজাত অন্যান্য পণ্য সহজে পরিবহন করতে পারে। এই সকল রাস্তার কারণে বর্ষাকালে পানি প্রবাহে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কারণ এই ডুবো সড়ক গুলো বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকে। এল জি আর ডির অধীনে সর্বপ্রথম এই সড়ক নির্মাণ করা হয় কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায় পরবর্তীতে। বেশ কিছু উপজেলায় এই ডুবো সড়ক নির্মাণ করা হয়। হাওর অঞ্চলবাসী এই সড়ক নির্মাণের ফলে বেশ উপকৃত হচ্ছিলো। বর্ষা মৌসুম ছাড়া এই সকল ডুবো সড়ক সারা বছরই এলাকার মানুষ ব্যবহার করছে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালে হাওর উন্নয়নের নামে বিশাল বড় মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় হাওরের তিনটি উপজেলা কে সারা বছর যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনতে অল ওয়েদার রোড সড়ক নামে একটি সড়ক নির্মাণ করা হয়। ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অল ওয়েদার সড়কটি অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনা এই তিন উপজেলা কে সারা বছর যোগাযোগের আওতায় আনা হয়েছে। তবে জেলা সদরের সাথে শুকনো মৌসুম ছাড়া হাওরের এই তিনটি উপজেলার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যায় না। বর্ষাকালে এই তিনটি উপজেলার সাথে নৌকা ট্রলার অথবা ছোট ছোট লঞ্চে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। মেগা প্রকল্পের নামে হয়েছে লুটপাট এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনেকেই হয়েছেন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ।
এই অল ওয়েদার সড়কটি গত সরকারের আমলে ‘উন্নয়নের প্রতীক’ হিসেবে প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই সেই সড়ক এখন স্থানীয় কৃষক, জেলে, গবেষক ও পরিবেশবিদদের কাছে পরিণত হয়েছে বিতর্কিত সড়ক হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আবদুল হামিদের রাজনৈতিক প্রভাব এর মাধ্যমে তদানীন্তন সরকার এই অল ওয়েদার রাস্তাটি নির্মাণ করতে সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না করে এই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ। হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, মাছের বিচরণ, কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন ডেকে এনেছে এই অল ওয়েদার সড়ক।
স্থানীয়দের ভাষ্য অপরিকল্পিতভাবে সরকার এই রাস্তাটি নির্মাণ করেছে। এই সড়কটি নির্মাণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অতিরিক্ত টাকা খরচ করেছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেছে। হাওর অঞ্চলে এত বড় মেগা প্রকল্পের কি দরকার ছিল এটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন? কেউ কেউ বলেছেন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিগত সরকার ঐ এলাকার অনেককেই কোটিপতি করে তুলেছেন।
ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম উপজেলার অলওয়েদার সড়ক এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং বর্ষা মৌসুমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ানো এক বিশাল বাঁধের নাম।
যদিও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করছেন। ফলে উন্নয়ন বনাম পরিবেশ এই পুরনো বিতর্ক আবারো নতুন করে সামনে এসেছে।
হাওরের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত
হাওরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বর্ষাকালে উন্মুক্ত পানি প্রবাহ। বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এসে দ্রুত বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে নদীপথে নেমে যায়। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় ২৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উঁচু অল ওয়েদার সড়ক অনেকাংশে সেই প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে অনেকে মনে করছেন।
অলওয়েদার সড়ক নির্মাণে ব্যয়
২০২০ সালে প্রায় ৮৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অল ওয়েদার সড়কটি নির্মাণ করা হয়। নির্মিত সড়কটিতে রয়েছে মাত্র তিনটি পিসি গার্ডার ব্রিজ, ৬২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট এবং ১১টি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ। বিশেষজ্ঞদের দাবি, হাওরের মতো এইবিশাল পানি প্রবাহের জন্য এ অবকাঠামো যথেষ্ট নয়।
জানা গেছে ‘হাওরের মধ্যে এমন সড়ক নির্মাণের আগে অন্তত ৩০ শতাংশ অংশ এলিভেটেড বা উড়ালপথ রাখার দরকার ছিল। কিন্তু তা আমলে নেয়া হয়নি। এখন এর প্রভাব কৃষি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
‘উন্নয়ন মানেই শুধু রাস্তা নয়; উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশ-সহনশীল এবং পরিকল্পিত। এই সড়ক ভবিষ্যতে আরো বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
অসময়ে বন্যার পানিতে আটকে যায় হাওর
স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের অভিযোগ, ভারীবর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় এবং আসাম থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের পানি এখন আগের মতো দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে পানি দীর্ঘসময় আটকে থাকছে হাওরে, বাড়ছে অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতা, ফলে বোর মৌসুমে ধান সংগ্রহ করতে অনেক বেগ পেতে হয়। চলতি বছর বোর মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় বৃষ্টি জনিত কারণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক পরিবার। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক তিনশত কোটি টাকা।
স্থানীয়দের দাবি, মাঝপথে নির্মিত উঁচু অলওয়েদার সড়ক পানি নিষ্কাশনের গতি মন্থর করে দিচ্ছে। জোয়ানশাহী হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘অল ওয়েদার সড়ক হওয়ার পর কয়েকবার ভর্তুকির মুখে পড়েছি। এ বছরও আমার ৩৬ একর জমির প্রায় ৭০ শতাংশ তলিয়ে গেছে। পানি নামতে দেরি হওয়ায় এতে আমার বোর ধানের ক্ষতি হয়েছে।’
মাছের বিচরণ কমেছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলে সম্প্রদায়
শুধু কৃষিই নয়, মাছের প্রজনন ও বিচরণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, আগে যেসব মাছ অবাধে হাওরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচল করত, এখন তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিকলীর সদর ইউনিয়নের আব্দুল করিম, কফিল উদ্দিন কৃষক ও মৌসুমি জেলে বলেন, ‘সড়ক হওয়ার পর নিকলী হাওরের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ কমে গেছে। আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের প্রাকৃতিক জলপথ সংকুচিত হলে মাছের প্রজনন ক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছের বিচরণ সীমিত হয়ে পড়ে।
শুধুমাত্র সড়ক নয়, নদী ভরাটও দায়ী
সড়ক ও জনপথ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, শুধু অলওয়েদার সড়ককে পানি প্রবাহের জন্য দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। আবার এসকল ক্ষেত্রে সবাই এক মত নয়।
বিশেজ্ঞদের দাবি, দীর্ঘদিন হাওরাঞ্চলে উপর দিয়ে প্রবাহিত নদী-নদীর খনন না হওয়ায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদী দখল এসবও সমানভাবে দায়ী।
কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘সিলেট বা কিশোরগঞ্জের বন্যার জন্য এককভাবে অলওয়েদার সড়ককে দায়ী করা যাবে না। নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। খণ্ড খণ্ড খননে সমাধান হবে না, প্রয়োজন সমন্বিত খনন।’
সরেজমিন দেখা গেছে, মেঘনা নদীর বিভিন্ন অংশে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। কোথাও কোথাও নদীর তীর দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ভৈরব-আশুগঞ্জ এলাকায় একাধিক সেতু ও রেলসংযোগও পানিপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে বলে অনেকে মনে করেন।
কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর মাধ্যমে পানি সুনামগঞ্জ হয়ে কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রার নিকটবর্তী হাওর এলাকায় প্রবেশ করে। সেই অঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, সারি ও ধলাই নদী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল প্রথমে যাদুকাটা, সারি ও ধলাইসহ ছোট-বড় অসংখ্য নদীতে এসে নামে। এগুলো গিয়ে মিশে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে। পরবর্তীতে এ দুই প্রধান নদীর শাখা ও প্রশাখা দিয়ে পানি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসে কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওরে। বিশেষ করে ধনু নদী হয়ে ঘোড়াউত্রা দিয়েই কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রবেশ করে। যা শেষ পর্যন্ত মেঘনা নদী অববাহিকায় গিয়ে মিশেছে।
অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, শুধু ইটনা-মিঠামইন সড়ক নয়; হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়কও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বহুমুখী সংকটে পড়েছে হাওরের কৃষকেরা
গত এপ্রিল ২০২৬ মাসে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এবং প্রবল বর্ষণ সৃষ্ট বন্যায় হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা নানামুখী সঙ্কটে পড়েছেন। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঅঞ্চলে ১২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে। কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ হাজার কৃষক। সরকারি হিসাবে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। পাকা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে; ধানের গুণগত মান এবং ধানের রং নষ্ট হয়েছে। পানির কারণে হারভেস্টার ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়েছে; শ্রমিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ কমেছে গবাদিপশুর খাদ্য ও ঘাসের সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর হাওরাঅঞ্চলে একই সঙ্কট দেখা দিলেও এখনো নেওয়া হয়নি কোনো সমন্বিত পরিবেশগত ও জনবান্ধব প্রকল্প।
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নির্মিত অলওয়েদার সড়ক পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে কি না, তদন্তে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ।
গত শনিবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার মেদির হাওর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কোনো সমস্যা চিহ্নিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।