রাজশাহীতে ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবসে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে উজানে অবস্থিত ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদীর পানিতে নায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশকে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন সমাবেশ, সেমিনার ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে।
শনিবার বিকেলে রাজশাহী মহানগরীর বড়কুঠি পদ্মা গার্ডেনে ফারাক্কা লং মার্চের ৫০তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আয়োজনে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী এড. এনামুল হক। সভায় বক্তারা গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও বিশ্ব ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে চীন, নেপাল, ভুটান, ভারত এবং বাংলাদেশকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক নদী কমিশন গঠন করার দাবি জানান। বক্তারা বলেন, নদী কমিশন গঠিত হলে এ অঞ্চলের নদী অববাহিকায় পানির সুষম বণ্টন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা যাবে। তাছাড়া নদী অববাহিকার দরিদ্র মানুষের আর্থিক উন্নতি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অবহেলিত নারী ও শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া বক্তব্য দেন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ম-ল, আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সভাপতি সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার, রিভারাইন পিপলের সেক্রেটারি জেনারেল শেখ রোকন, নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, ভাসানী পরিষদের সদস্যসচিব আজাদ খান ভাসানী, রাজশাহী স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সহসভাপতি সুলতান মাহমুদ সুমন প্রমুখ। বক্তারা বলেন, গঙ্গা নদীতে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা নদীতে বাঁধ এবং অন্যান্য নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে বাংলাদেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ভারত সরকারের কাছে প্রতিকার এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। নতুবা দ্বিপক্ষীয়ভাবেও এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাঁদের মতে, নেপালে জলাধার নির্মাণ করে হিমালয়ের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে শুকনো মৌসুমে ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ ১ লাখ ৩০ হাজার কিউসেক থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। তাতে সবাই লাভবান হবে। জলাধারের সাহায্যে নেপাল প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে, যা নেপাল বাংলাদেশেও রপ্তানি করতে পারবে।
হেরিটেজের সেমিনার
ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার সকালে “ফারাক্কা লংমার্চ ও গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি : বহুমাত্রিক অংশীজনের ভাবনা” শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে হেরিটেজ রাজশাহী। নদী বিশেষজ্ঞ ও হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী এতে সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর এম রফিকুল ইসলাম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর ড. মো. ফরিদ উদ্দিন খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির কর্মকর্তা শেখ মেহদি মোহাম্মদ। আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও গবেষক বেনজিন খান, নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-এর সভাপতি এ্যাড. এনামুল হক, রাজশাহী জেলা ড্যাব সভাপতি ডা. ওয়াসিম হোসেন, নাহিদ হাসান প্রমুখ। সেমিনারে বিভিন্ন স্তরের গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
নদী বাঁচাও আন্দোলন
ফারাক্কা লংমার্চ দিবসের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে এবং ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে শনিবার সকালে রাজশাহীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে এক মানববন্ধনের আয়োজন করে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন, রাজশাহী শাখা। মানববন্ধনে নদী রক্ষা, গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টন এবং ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে পদ্মা ও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। এর ফলে পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও নৌ-চলাচলে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। তারা গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো কার্যকর ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের রাজশাহী শাখার সভাপতি ও রাবি’র রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবীব। বক্তব্য দেন, নদী বাঁচাও আন্দোলন রাজশাহী শাখার উপদেষ্টা ডা. ওয়াসিম হোসেন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. তৌফিক পারভেজ জাহেদী, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মঈনউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, দৈনিক নতুন প্রভাতের সম্পাদক সোহেল মাহবুবসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।