মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় সিলেটেও চরম পর্যায়ে বিদ্যুতের সংকটে পড়েছেন প্রায় ১২ লক্ষাধিক গ্রাহক। নগরীর মার্কেটগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় ভূতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে। পেট্রোল না পাওয়ায় অনেক বিপণিবিতান, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর মার্কেটেও জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ক্রেতা বিক্রেতারা পড়েছেন চরম সংকটে। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিদিনই লস হওয়ায় খুবই বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের হাজারো মানুষ। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হাসপাতালগুলোতেও সিসিইউ ও আইসিইউতে দেখা দিয়েছে রোগীদের কষ্ট ও আর্তনাত। অনেক হাসপাতালে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে অপারেশন থিয়েটারেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।

প্রতিদিন সিলেট মহানগর এলাকায় অনেকবার বিদ্যুৎ যাতায়াত করছে। একবার গেলে মোটামুটি লম্বা বিরতি নিয়ে ফিরছে। আর গ্রামাঞ্চলের খবরতো আরও ভয়াবহ। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলা থেকে খবর আসছে, বিদ্যুতের যন্ত্রণায় জনজীবন অতিষ্ঠ। সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২ এর আওতায় মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা ১২ লাখ ২০ হাজার। অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগছেন সব গ্রাহক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সহসা এই দুরবস্থার অবসান হতে পারে, তেমন কোনো উপায়ও দেখছেন না কেউ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট, এবং সেকারণে উৎপাদন কমেছে। তাই সরবরাহও কম। যা সরবরাহ হচ্ছে তা তরা সঠিকভাবেই বিতরণ করছেন।

গতকাল সোমবার সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় সারাদিন বিদ্যুৎ বলতে গেলে আসা-যাওয়ার মধ্যেই ছিল। নগরীর প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার এর মতো এলাকায় দুপুরের দিকে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার বিদ্যুৎ গেছে। আর ফিরেছে কমপক্ষে প্রতিবার প্রায় ঘন্টাখানেক বিরতি দিয়ে।

পিডিবি সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মো. ইমাম হোসেন জানান, সোমবার পিক আওয়ারে তাদের চাহিদা ছিল ২২৫ মেঘাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ ছিল ১৮৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট করে না বললেও বলেছেন, আমরা সবাই জানি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। তার প্রভাবে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমছে- সবার মতো আমিও তাই মনে করছি।

সহকারী প্রকৌশলী জারজিসুর রহমান জানান, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ মিলে পিডিবির গ্রাহক সংখ্যা ৫ লাখ ৬৫ হাজার। পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত) সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ২৩০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং না থাকলে সম্পূর্ণ সাপ্লাই পাওয়া যায়। আর থাকলে সরবরাহ হয় ১৪০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট। আবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে পিডিবির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। পিক আওয়ারে চাহিদা থাকে ১৬০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং থাকলে সরবরা হয় ১০০ মেগাওয়াট আর না থাকলে বড়জোর ১২০ মেগাওয়াট। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও নাজুক। প্রায়ই বিভিন্ন উপজেলা থেকে খবর আসছে, বিদ্যুৎ বলতে গেলে সারাদিন থাকেই না। সিলেট পল্লী বিদ্যুতের দুই সমিতির কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ধারনা পাওয়া গেছে, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ প্রায় অর্ধেক।

সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার (চ.দা) মো. আব্দুর রশীদ জানান, তাদের গ্রাহক ৪ লাখ ২০ হাজার। পিক আওয়ারে তাদের চাহিদা ১০৫ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ ৭৩ মেগাওয়াটের মতো। মানে ঘাটতি ৩২ মেগাওয়াট। ঘাটতি খুব বেশী নয়। তবু প্রায়ই বিদ্যুতের আসা যাওয়া আর সারাদিন থাকা না থাকা নিয়ে গ্রাহদের অভিযোগ কেন- এই প্রশ্নের জবাব দেন নি তিনি।

সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর অবস্থা আরও খারাপ। জেনারেল ম্যানেজার মো. রবিউল হক জানান, তাদের গ্রাহক সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পিক আওয়ারে তাদের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ৪৫ থেকে ৫০ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১৮ থেকে ২৫ মেগাওয়াট। উৎপাদন ও সরবরাহে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হন নি।