ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় মশার প্রজননস্থলেই আঘাত হানতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (গাসিক) এবার ব্যবহার করছে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড বিটিআই (Bacillus thuringiensis israelensis)। মশার লার্ভা ধ্বংসের মাধ্যমে বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে নতুন এ প্রযুক্তির প্রয়োগকে নগরীর মশক নিধন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বিটিআই প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকার। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দ্বিতীয় দিনের মতো বিভিন্ন মশার প্রজননস্থলে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা হয়।
এ সময় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মাদ রহমত উল্লাহ ও সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব-যান্ত্রিক) আমজাদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মশার লার্ভাতেই ‘টার্গেট’
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি মশার বংশবিস্তারস্থল ধ্বংসে বিটিআই ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকারের নির্দেশনায় বিশেষায়িত হ্যান্ড স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে নালা, ড্রেনসহ যেসব স্থানে মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে সেখানে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে শক্তিশালী ইঞ্জিনচালিত প্রফেশনাল গ্রেড স্প্রে মেশিন। প্রতিটি মেশিনে ১৩ লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংক রয়েছে এবং প্রায় দুই মিটার দূরত্ব পর্যন্ত লার্ভিসাইড ছিটানো যায়। অ্যান্টি-ভাইব্রেশন প্রযুক্তি ও কাঁধে বহনের উপযোগী বেল্ট থাকায় দীর্ঘসময় কাজ করতেও অপারেটরদের সুবিধা হচ্ছে।
‘মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি করে না’
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মাদ রহমত উল্লাহ বলেন, বিটিআই নির্দিষ্ট মাত্রায় পানিতে মিশিয়ে মশার প্রজননস্থল ও নালায় প্রয়োগ করা হয়। এটি মূলত মশার লার্ভাকে লক্ষ্য করে কাজ করে। ফলে মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, মশা নিধনে শুধু উড়ন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করে সেখানে বিটিআই প্রয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও জমে থাকা পানি অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রথমে ৯ ডেঞ্জার জোন, পর্যায়ক্রমে ৫৭ ওয়ার্ড
আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন বলেন, নগরীর যেসব এলাকায় মশার প্রজননকেন্দ্র ও লার্ভার উপস্থিতি বেশি, সেসব স্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিটিআই প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ ৯টি ডেঞ্জার জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডেই এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি বলেন, 'এ মুহূর্তে মশার উপদ্রব বেড়েছে। তাই প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশনায় পরীক্ষিত ও কার্যকর লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। একবার প্রয়োগের পর সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত কার্যকারিতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিটিআই ব্যবহারের পাশাপাশি ড্রেন ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।'
সালমা খাতুন আরও বলেন, পুরো নগরীতে পরিকল্পিতভাবে বিটিআই প্রয়োগ করা গেলে মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ফল পাওয়ার আশা রয়েছে। তবে সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এ কাজে নগরবাসীকেও সম্পৃক্ত হতে হবে।
নগরবাসীর সচেতনতায় জোর
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন ও নালায় জমে থাকা পানি মশার বংশবিস্তারের অন্যতম উৎস। তাই সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও নতুন এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে বিটিআই প্রয়োগ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে গাজীপুরে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, মশা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি উৎসস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিক সচেতনতা-এই তিনটি কার্যক্রম একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হলেই টেকসই সুফল পাওয়া সম্ভব।