একেএম আবদুর রহীম, ফেনী সংবাদদাতা

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী কোলাপাড়া ও বাঁশপদুয়া এলাকায় কহুয়া নদীর ভারতীয় অংশে দ্রুত গতিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে। তবে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ অংশে এখনো কোনো কাজ শুরু না হওয়ায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এখনো কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়নি, যার ফলে থমকে আছে বাঁধের কাজ। ভারতের অংশে কাজ চললেও মেলেনি বাংলাদেশের বরাদ্দ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারতের ২১৬৩ নম্বর সীমান্ত পিলারের উভয় পাশে কহুয়া নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে দুই দেশের বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ভারতের বিলোনিয়া সংলগ্ন আমজাদনগরে ২.৩ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের পরশুরাম বাজার সংলগ্ন উত্তর কোলাপাড়ায় ২৫০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর গত ১৫ দিন ধরে ভারত তাদের অংশে পুরোদমে বাঁধ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশ অংশে এখনো কোনো সংস্কার বা নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়নি।

২০২৪ সালে মুহুরী, কহুয়া, সিলোনীয়া ও ফেনী নদীর পানিতে সয়লাব হয়ে পড়েছিল সমগ্র জেলা। শতাব্দীর সেই ভয়াবহ বন্যার ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফেনীর লাখলাখ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ২৫ বছর ধরে উত্তর কোলাপাড়া গ্রামের রেললাইন সেতুর পূর্বপাশে

বেড়িবাঁধের ওপর হাজার হাজার সিসি ব্লক অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ২০০৩ সালে প্রায় ২৫ হাজার সিসি ব্লক তৈরি করে কাজ শুরু করা হলেও সে সময় বিএসএফের বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় বল্লামুখার বেড়িবাঁধ বিএস্এফ কেটে দিলে কিছু ব্লক সেখানে ফেলা হলেও, সিংহভাগ ব্লক এখনো অবহেলায় পড়ে রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় কহুয়া নদীর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অনেক জায়গায় বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়ে বাঁধটি বর্তমানে অত্যন্ত ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভারত তাদের অংশের বাঁধ উঁচু ও মজবুত করে ফেলায়, আসন্ন বর্ষায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে বা পাহাড়ি ঢল নামলে সমস্ত পানির চাপ এসে পড়বে বাংলাদেশের দুর্বল বাঁধের ওপর।

উত্তর কোলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা খোকন বলেন, ভারত যে বেড়িবাঁধটি দিচ্ছে, সেটি সম্পন্ন হয়ে গেলে আমাদের বাংলাদেশ অংশের বাঁধটি সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয়ে পড়বে। অতীতে সিসি ব্লক বসানোর জন্য টেন্ডার হলেও ভারতীয় বাধা এবং বাংলাদেশ সরকারের নতজানূ পররাষ্ট্র নীতির কারণে কাজ শেষ করা যায়নি। এখন ভারত ঠিকই তাদের কাজ করছে, কিন্তু আমরা পিছিয়ে আছি। এই বর্ষায় ভাঙন থেকে উত্তর কোলাপাড়া, দক্ষিণ কোলাপাড়া, বেড়াবাড়িয়া ও পরশুরাম বাজারসহ প্রায় ১০টি গ্রাম রক্ষা করতে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনুর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে এলাকাবাসী।

একই গ্রামের বাসিন্দা ইমরান ও সোহাগ তীব্র ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করে জানান, গত বন্যায় ফাটল ধরার পর গ্রামের মানুষ নিজেদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কোনোমতে বাঁধটি টিকিয়ে রেখেছিল। এবার পানি এলে এই বাঁধ আর টিকবে না। মানুষ থাকার ও খাওয়ার জায়গা পাবে না। তাই দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করা হলে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার মানুষ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

এই বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফেনী ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর বিল্লাল হোসেন জানান, দুই দেশের সম্মতিতে বাঁধ সংস্কার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বল্লামুখা বাঁধ ও নিজ কালিকাপুরে একটি কবরস্থানের সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। ভারত কহুয়া নদীর বাঁধে তাদের অংশটি সংস্কার করছে। বাংলাদেশ অংশে কাজ শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাঁধের নির্মাণকাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়ন করার কথা।

যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন,”বাঁধটি কীভাবে নির্মাণ করা হবে সে বিষয়ে বিজিবির অধিনায়কের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছি। স্থানীয় মানুষ যেভাবে উপকৃত হয়, সেভাবেই দ্রুত বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তবে ২৪ এর ভয়াবহ বন্যার পর থেকে ফেনীবাসী জোর দাবি জানিয়ে আসছিল যে, টেকসই বেড়ীবাঁধ নির্মাণের কাজটি যেন বিদেশী ঠিকাদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে নির্মিত হয়।

সীমান্ত এলাকার ভুক্তভোগী মানুষের জোর দাবি, বাংলাদেশ সরকার যদি এখনই কূটনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয় এবং অতি দ্রুত কহুয়া নদীর বেড়িবাঁধটি সংস্কার না করে, তবে ফেনীর একটি বড় অংশ এবারও ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যেন দ্রুত ভারতের কাজের সাথে সমন্বয় করে বাংলাদেশ অংশের কাজ শুরু করে, এটাই এখন পরশুরামবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।