রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা হত্যাকা-ের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বাকি বিচারের দায়িত্ব আইন বিভাগের। আমরা আশা করি সম্ভাব্য কম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে রামিসা ও সাম্প্রতিক ইস্যুতে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা পেশাদার অনেক অপরাধী, যারা দীর্ঘদিন আইনের চোখে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করেছি।

বিভিন্ন আলোচিত মামলার অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা পেশাদার অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রামিসা হত্যাকা-ের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুত চার্জশিট দিয়ে অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শাস্তির বিষয়টি আদালত নিশ্চিত করবেন।

তিনি বলেন, রামিসা, আছিয়া, তনু হত্যাকা-, বগুড়ায় তরুণী ধর্ষণ এবং গাজীপুরের ফাইভ মার্ডারসহ সাম্প্রতিক আলোচিত সব হত্যাকা-ের তালিকা তৈরি করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও করা হবে। সরকার খুব বেশি সময় পায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে, এজন্য কিছুটা সময় দিতে হবে।

নাগরিকত্ব ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গে চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা তো চাই আইনগতভাবে শেখ হাসিনা ফিরে আসুক।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে সরকার।

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ভুক্তভোগী পরিবারের হতাশার জবাব হবে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সম্প্রতি আলোচিত আসিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় কার্যকর না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে সাংবাদিকরা জানতে চান, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করছে কি না? জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আসিয়ার বাবার হতাশা তার ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে এসেছে। তবে সরকার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, আসিয়ার ঘটনায় সাত দিনের মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে বিচারও শেষ হয়েছিল। এর চেয়ে দ্রুত বিচার করতে গেলে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মৃত্যুদ- কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, মৃত্যুদ-ের রায় কার্যকরের আগে ডেথ রেফারেন্স সুপ্রিম কোর্টে অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। হাইকোর্ট বিভাগে পেপার বুক প্রস্তুতের একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা অনেক সময় বিলম্বের কারণ হয়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ব্যতিক্রম করার নজির রয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, মেজর সিনহা হত্যা মামলা ও আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি নিয়ে দ্রুত পেপার বুক করা হয়েছিল। রামিসা ও আসিয়ার মামলাতেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, আজ অফিসে এসে প্রথমেই পুলিশ কমিশনারকে ফোন করেছি। বলেছি, এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। সুতরাং রামিসার বাবার জবাব উনি যেটা হতাশা ব্যক্ত করেছেন সেটার একমাত্র উত্তর হবে যদি আমরা এই বিচার প্রক্রিয়াটাকে প্রত্যাশিতভাবে অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে পারি, সেটাই হবে আমাদের জবাব। এর বাইরে এই বিষয়ে আমাদের কোনো রিঅ্যাকশন দেখানোর কিছু নাই। আমরা যদি না করতে পারি তখন উনার কথাটা সত্য প্রমাণিত হবে, দ্যাট ইজ আওয়ার আনসার।

সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আসিয়ার মামলাটা আমাদের কাছে একটা এক্সাম্পল। ওটা এক মাসের মধ্যে শেষ করেছিলাম। ওই এক্সাম্পল ধরে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি, চিন্তা করব।

কতদিনের মধ্যে কার্যকর হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কার্যকরের বিষয়টা আমাদের হাতে না। এটা সুপ্রিম কোর্টের হাতে এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচার প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এখানে যেহেতু পেপার বুক করার একটা এম্বারগো আছে। আর ট্রায়াল কোর্টে পেপার বুক করা এম্বারগো না। আমি আমার পাবলিক প্রসিকিউটরকে বলতে পারি এটা ফাস্টট্র্যাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, জজ সাহেব বাকিটা দেখবেন।

তিনি আরও বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে সরকার পাবলিক প্রসিকিউটরদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারে, তবে আদালতের বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই মামলাটির বিচার হবে বলে জানান তিনি।

দেশে বিচার জটের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। এত বিপুল মামলা রাতারাতি নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তবে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ধর্ষণ মামলা কোনোভাবেই রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচনায় এনে প্রত্যাহারের তালিকায় রাখা হবে না।

শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলায় বিশেষ বেঞ্চ চাইলেন আইনজীবীরা

শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলো থেকে উদ্ভূত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনে প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন করেছেন আইনজীবীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার তারা এ আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, আমরা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করছি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরুপ প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন সময়ে অধস্তন আদালতে চাঞ্চল্যকর, নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের দ্রুত বিচার হলেও হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল এবং আপিল বিভাগের আপিল শুনানি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।

মাগুরার শিশু আসিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামির ফাঁসি হলেও ডেথ রেফারেন্স কবে শুনানি হবে অনিশ্চিত। ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলাসহ বহু মামলা এভাবে অপেক্ষমাণ অবস্থায় আছে। ফলে সর্বশেষ মিরপরে নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের শিকার শিশু রামিসার বাবা বলেই বসলেন আপনারা বিচার করতে পারবেন না।

আবেদনে বলা আরও হয়, বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে আপনাদের ও আমাদের সবার এই দায় এড়ানোর উপায় নেই। তবে জুডিসিয়ারির সীমাবদ্ধতা আমরা বুঝি। তবুও সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতেও শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যাকা-ের ঘটনাগুলো আলাদা করে এতদসংক্রান্ত মামলাগুলো (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল), বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।