জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) দ্বিতীয় ক্যাম্পাস–সংক্রান্ত তিন দফা দাবিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জকসু, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্রফ্রন্ট ও ইনকিলাব মঞ্চসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে জবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সংঘর্ষ ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত গড়িয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে।

হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন জকসু জিএস ও জবি শিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ। তাঁকে রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ছাড়া আরও আহত হয়েছেন জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জকসু এজিএস মাসুদ রানা, জকসু সদস্য আকিব, আব্দুল্লাহ, জবি ছাত্রশক্তি সভাপতি শাহিন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসিবসহ শতাধিক।

আহতদের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও কয়েক দফা হামলা করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। এ সময় জবি ছাত্রদলের সঙ্গে আরও অংশ নেয় কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া পুরান ঢাকার বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের সামনে শোডাউন দেন।

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার মকবুল হোসেন বলেন, সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনো অনেকেই আসছেন চিকিৎসা নিতে।

গুরুতর আহত কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে স্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন—এই তিন দাবিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্ল্যাকার্ড হাতে অডিটোরিয়ামের বাইরে অবস্থান নেন। পরে তাঁরা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রক্টরিয়াল টিম বাধা দেয়। এ সময় সেখানে থাকা শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বাক্‌বিতণ্ডা শুরু হয়।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জকসুর স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং তাঁর হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরে শহীদ মিনার এলাকাতেও উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের বিভিন্ন প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে তিন দফা দাবি শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরতেই তাঁরা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলের নেতৃত্বে প্রথমে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়, পরে পোস্টার ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ধারাবাহিকভাবে হামলা চালানো হয়।

জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন, স্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। তাঁর দাবি, হামলায় ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনের অবস্থা গুরুতর। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পরও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

রিয়াজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে গেলে টেন্ডার–সংশ্লিষ্ট স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে—এ কারণেই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠন গত ছয় মাসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদল এবং সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগে ক্যাম্পাসের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা হলে ছাত্রশিবির তা বাধাগ্রস্ত করতে চাইলে জবি ছাত্রদল তাঁদের প্রতিরোধ করে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা:

সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিকরা। আহত সাংবাদিকরা হলেন বাংলা ট্রিবিউনের জবি প্রতিনিধি সোহায়েল আহমেদ, আজকালের খবরের কায়েস মাহমুদ, আমার সংবাদের আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা স্ট্রীমের রজব আল ফাহিম, প্রাইম বাংলাদেশের মোহন খন্দকারসহ আরও বেশ কয়েকজন।

শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে গিয়ে অবরুদ্ধ শিক্ষক:

আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন এবং অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক। পরবর্তীতে হাসপাতালের ভেতরে ছাত্রদল হামলা চালালে তাঁরা অবরুদ্ধ হন ও কিচেনে অবস্থান নেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে যেতে বললে শিক্ষার্থীদের রেখে তারা হাসপাতাল থেকে বের হতে অস্বীকৃতি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন:

এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।