বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দিল্লির সঙ্গে আঁতাতেই আওয়ামী লীগ মিছিলের সুযোগ পাচ্ছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৩টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রমনীতি: শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অনন্য আদর্শ” জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিশ্বের দুঃখী, অনাহারী ও নিপীড়িত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) যে মানবিক ও কল্যাণভিত্তিক নীতি-আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষ রাসুল (সা.)-এর নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করলে শ্রমক্ষেত্রে ন্যায়, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদ গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে গণভোটের জনগণের মতামত অগ্রাহ্য এবং জুলাইয়ের চেতনা ও প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করা হলে তা জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।
তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে জনগণ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। জুলাই সনদের ওয়াদা ভঙ্গ করে দেশকে আবার পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা জনগণ মেনে নেবে না। মদিনার সনদের কথা বলে আবার কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন প্রণয়ন করে জাতির সাথে তামাশা করছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, দিল্লির সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো চক্রান্ত হচ্ছে কি না, জনগণের সামনে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন করেন, রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত একটি দল কীভাবে সারা দেশে মিছিল-মিটিং করার সুযোগ পাচ্ছে?
তিনি বলেন, দেশের জনগণ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহি চায়। যারা জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা করা যাবে না। এ সর্বনাশা পথ থেকে ফিরে এসে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আসুন, আমরা জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলি, অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকের অধিকার, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার—সবকিছুকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে বৈষম্য দূর হবে না। শ্রমিক-মালিক, কৃষক-জনতা এবং দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে ইসলামি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একজন প্রকৃত নেতা হতে হলে তাকে রহমদিল, সহনশীল, বিনয়ী ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁর জীবন ও শ্রমনীতি অনুসরণ করেই শ্রমিক-মালিকের মধ্যে সৌহার্দ্য, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, শ্রমিক ও মালিককে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের যে মতবাদ প্রচার করা হয়েছে, তা মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারেনি। কারখানা বন্ধ করা, লালপতাকার রাজনীতি এবং শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে তিনি নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, একসময় একশ্রেণির শ্রমিক নেতা ট্রেড ইউনিয়নকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ‘স্কুল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাদের রাজনীতিতে ধর্মবিরোধী স্লোগানও ছিল। এর বিপরীতে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের নীতি-আদর্শকে সামনে রেখে ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও বলেন, রাসুলপ্রণীত শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। ইসলাম শ্রমিক ও মালিককে পরস্পরের ভাই হিসেবে বিবেচনা করে। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং তার শ্রমের যথাযথ মূল্য দেওয়া মালিকের দায়িত্ব। একইভাবে শ্রমিককেও দায়িত্বশীলতা, সততা ও আমানতদারিতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিককে শুধু উৎপাদনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখলে চলবে না। তার পরিবার, জীবনযাপন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকের শ্রমের সুফলে তার ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামী শ্রমনীতির লক্ষ্য হলো মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করা নয়, বরং ন্যায় ও দায়িত্বের ভিত্তিতে উভয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান এর সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক লসকর মোঃ তসলিম এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানিত হয়।
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাওলানা আব্দুস সামাদ।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আব্দুর রব, বিশিষ্ট আইনজীবী ও ইসলামী চিন্তাবিদ ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ড. আবুল কালাম আজাদ (বাশার), বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মুফতি আলী হাসান ওসামা, বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজসেবক অধ্যাপক ডা. কর্নেল (অব.) জেহাদ খান।
এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গীর অধ্যক্ষ ড. মাওলানা হিফজুর রহমান, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ।