গণবিরোধী বিলের দায় আমরা নিতে চাই না- ডা. শফিকুর রহমান

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের জন্য জারি করা অধ্যাদেশসহ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করা সংক্রান্ত বিলের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল। এসব বিলের উপর আলোচনায় দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছে সংসদ। যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তিসত্ত্বেও রহিতকরণ বিলগুলো জনমত যাচাইয়ের জন্য গ্রহণ না করে পাস করার প্রতিবাদে বিকেলে সংসদ থেকে ঘোষণা দিয়ে ওয়াক আউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। এর আগে অধ্যাদেশ রহিতকরণ সকল বিলেই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি দেয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার আছরের নামাযের বিরতির পর স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিল পাসের পর সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বিরোধীদলের যৌক্তিক বাধা স্বত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। তাই সংসদ থেকে ওয়াকাআউট করছি। তার নেতৃত্বে জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে অধিবেশন থেকে বের হয়ে যান। এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ কিছু বলার জন্য দাঁড়ালে ডেপুটি স্পিকার ফ্লোর দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি ধন্যবাদ জানানোর জন্য উঠছি। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ফাস্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং, থার্ড রিডিং, সব রিডিংয়ে উনারা সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ হাত তুলে সমর্থনও দিয়েছেন। সমস্ত প্রক্রিয়া অংশগ্রহণের পরে ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কিনা এটা জানার জন্য। সমস্ত প্রক্রিয়ায় তারা অংশগ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ। আশা করি মাগরিবের নামাযের পর তারা আবার অংশগ্রহণ করবেন।

মাগরিব নামাযের পর শুরু হওয়া অধিবেশনে ফের যোগ দেয় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ওয়াকআউট করা অপরাধ কিনা?

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের প্রতিবাদ

বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, এই বিলটি এখনো পাস হয়নি। বিবেচনার জন্য উঠেছে। এখনো আমাদের নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের অধীনে স্বাধীন বিচার বিভাগ হিসেবে কাজ করছে। তারপরও আমরা দেখেছি নিম্ন আদালতের বিচারকরা যখন স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আইন মন্ত্রণালয় থেকে তাদেরকে শোকজ করা হয়েছে। তারা আইন মন্ত্রণালয়ের আন্ডারে ম্যাজিস্ট্রেটকে নিম্ন আদালতকে নেওয়ার আগেই যদি এই আচরণ প্রকাশ করতে পারে, আমরা দেখেছি সেই ফ্যাসিবাদী আমলে কি হয়েছে, অতীতে কি হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটরা যদি আইন মন্ত্রণালয়ের কথা না শোনে, বিরোধী দল দমনের ক্ষেত্রে তারা যদি অস্বীকার করে, তখন তাদেরকে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হতো দিনের নোটিশে। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফে বদলি করা হতো। সেই দিন আবার ফিরিয়ে আনার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে। ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে আমরা সকলে নিষ্পেষিত হয়েছিলাম। আজকে আবার যদি আমাদেরকে সেই সিস্টেমে নিয়ে যাওয়া হয়... বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য শুধু আমরা নই, সরকারি দলীয় অনেক আইনজীবী আছেন তারাও সংগ্রাম করেছেন। তাদের সেই সংগ্রাম আজকে কোথায় গেল? তারা যদি আজকে চুপ থাকেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিভৃতে কাঁদবে।

তিনি বলেন, এই যে অধ্যাদেশটি আজকে বাতিলের জন্য, রহিত করার জন্য বিল উত্থাপিত হয়েছে, সেই ব্যাপারে হাইকোর্টের একটি রায় রয়েছে। সেই রায় বাস্তবায়নের জন্যই এই অধ্যাদেশটি আনা হয়েছিল। সেই রায়ে কি বলা হয়েছিল? সেই মাসদার হোসেন ভার্সেস বাংলাদেশ, সেখানে ১৯৭২ সালের অরিজিনাল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, যেটাকে বারংবার সংশোধন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়েছিল, সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এবং সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান ১১৬-এর অনুচ্ছেদটি সক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে বলা হয়েছে বিচার বিভাগের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি, বিচারিক কার্য সম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটের উপর নিয়ন্ত্রণÑ যার মধ্যে রয়েছে পদায়ন, পদোন্নতি এবং ছুটি মঞ্জুরের ক্ষমতা এবং শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকবে। এবং সেই রায়ে আরও বলা হয়েছিল বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা ২০১৭-কে আল্ট্রা ভাইরাস ঘোষণা করা হলো। কারণ এটি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং মাসদার হোসেন মামলার যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে সেটার পরিপন্থী। এখানে আরও বলা হয়েছে তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন সচিবালয়, বিচার বিভাগের সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই হাইকোর্টের রায়কে বাস্তবায়ন করার জন্যই এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল। সেই অধ্যাদেশ জারি করার পরে এই অধ্যাদেশকে কার্যকরও করা হয়েছিল। একটি স্বাধীন সচিবালয় আমরা দেখেছিলাম সুপ্রিম কোর্টে সেদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আইন মন্ত্রী সেদিন উপস্থিত ছিলেন সেখানে। আজকে তিনি কিভাবে আবার সেটাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রহিত করার জন্য বিল আনেন আমাদের বোধগম্য হয় না সেই রায় বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা এখানে অনেক কথা বলতে পারি। আমাদের ইনডেমনিটি আছে, আমাদের দায়মুক্তি আছে। কিন্তু এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই আমাদের এই সংবিধান সার্বভৌম। আমরা আদালতের রায় মানতে বাধ্য নইÑ এমন কথা কিন্তু এই সংসদে বলা হয়েছে। এই কথাটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অসত্য। এর মাধ্যমে জাতিকে মিসলিড করা হচ্ছে। আমার মাননীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত অনেক কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি বলতে পারেননি। তারপর যেই আইন মন্ত্রীকে সময় দিয়েছেন তিনি অনেক বিষয়ে মিসলিড করেছেন। যে বিষয়ে এর আগে মিসলিড করা হয়েছে তার একটি ছিল আমাদের সংসদের সার্বভৌমত্ব।

তিনি বলেন, এই যে রহিতকরণ বিলটি আনা হলো, এখানে আমাদের বিচার বিভাগের উপরে তাদের স্বাধীনতার উপরে নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এই ব্যাপারে ষোড়শ সংশোধনীর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে কথাগুলো বলেছিল আমি সেই কথাগুলো একটু কোট করতে চাই। সেখানে বলা হয়েছিল বাংলাদেশের গণপ্রজাতন্ত্রী সংবিধানের কাঠামোর অধীনে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গÑ সংসদ, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ সমান গুরুত্ব এবং মর্যাদার অধিকারী। কোনো অঙ্গই কোনটির অধীনস্থ নয়। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে অন্যান্য অঙ্গের অধীনস্থ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে এটিই প্রতীয়মান হয়েছে যে, পার্লামেন্টের কোনো ক্ষমতা নেই কোনো বিচারককে অপসারণ করার। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যেটা ১৯৭২ সালের সংবিধানে ছিল না, পরবর্তীতে যেটা ইনকর্পোরেট করা হয়েছিল, উচ্চ আদালত সেটাকেই বহাল রেখেছে। অর্থাৎ বিচারকদের জবাবদিহিতা এবং তাদের শৃঙ্খলার বিষয়টি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। আজকে যে বিলটি আনা হয়েছে, এটি সরাসরি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূলে কুঠারাঘাত। আমরা দেখেছি অতীতে কিভাবে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিচারকদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, বদলি করে বা অন্য কোনো উপায়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ধরনের বিল পাস হলে বিচারকরা আর স্বাধীনভাবে তাদের রায় দিতে পারবেন না। তারা সবসময় সরকারের বা নির্বাহী বিভাগের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবেন। আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে আইনের শাসন বা 'রুল অফ ল' থাকবে। আর আইনের শাসনের প্রধান শর্তই হলো একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ। যদি বিচার বিভাগই স্বাধীন না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। আমি অনুরোধ করব এই বিলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক এবং উচ্চ আদালতের যে রায় রয়েছে, সেই রায় অনুযায়ী একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় যেন কার্যকর থাকে সেই ব্যবস্থা করা হোক। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এবং একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

স্পিকার-বিরোধী নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতণ্ডা : ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’ পাসের পর সংসদে কথা বলার সময় বরাদ্দকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতণ্ডা দেখা দেয়। বিরোধী দল দুই মিনিট সময়কে ‘অপ্রতুল’ উল্লেখ করে বাড়ানোর দাবি জানায়।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, বিলে তাদের দেয়া ভিন্নমত (ডিসেন্ডিং অপিনিয়ন) নিয়ে যথাযথ আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মাত্র দুই মিনিটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, অথচ ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা দীর্ঘ সময় পাচ্ছেন। পর্যাপ্ত সময় না দিলে সংসদীয় বিতর্ক অর্থহীন হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জবাবে স্পিকার বলেন, তিনি সংসদের পূর্ববর্তী নজির অনুসরণ করছেন। আগে আপত্তি উত্থাপনে দুই মিনিট সময় দেয়া হলেও এবার ছয় মিনিট দেয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আপত্তি উত্থাপনকারীদের জন্য সময় কিছুটা বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি।

এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিধি মোতাবেকই আলোচনা চলছে এবং আপত্তি উত্থাপনকারীদের জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সেকেন্ড বা থার্ড রিডিংয়ে কার্যপ্রণালী বিধি অনুসরণ করে বিরোধী দল চাইলে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পেতে পারে।

জামুকা বিলে আপত্তি

জামায়াতে ইসলামীর আপত্তি সত্ত্বেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশ সংশোধন করে আইনে রূপ দিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বিলটি উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।

বিলের ওপর আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে বলেন, এই বিলে যা প্রস্তাবনা করা হয়েছে, স্বাধীনতার পরে তখনকার শাসকও সেটা আনেননি। মরুহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও আনেননি। তিনবারের অতি সম্মানীয় প্রধানমন্ত্রী (খালেদা জিয়া) আনেননি। এ জিনিসটা নিয়ে আসলেন সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করে ফ্যাসিস্টের বিকৃত একজন প্রতিভূ শেখ হাসিনা এবং পরবর্তী পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে সামান্য পরিবর্তনসহ। কী আছে এখানে? তৎকালীন তিনটা সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছেÑ তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি পাক সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরও কিছু অক্সিসিলারি ফোর্সের সঙ্গে তিনটা রাজনৈতিক দলের নাম এসেছে।