সুমন রায়হান

তাজ ইসলাম রচিত “গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ জুলাই: কবিদের ভূমিকা” বইটি আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। সাহসী কবি, সাহিত্যসমালোচক ও গবেষক হিসেবে লেখক এখানে “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান”- এর প্রেক্ষাপটে কবিদের সক্রিয় ভূমিকা তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি বাংলা রিভিউ থেকে প্রকাশিত এই বইটি ইতোমধ্যেই সমকালীন সাহিত্যচর্চায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বাংলা সাহিত্যে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ভবিষ্যতে যে কোনো গবেষণার জন্য এই গ্রন্থটি একটি অপরিহার্য সূত্র হয়ে থাকবে। এটি শুধু একটি বই নয় বরং একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল।

গ্রন্থটিতে লেখক দেখিয়েছেন, গণআন্দোলন বা দমন-পীড়নের সময়ে কবিরা কীভাবে কবিতা, স্লোগান ও লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেন। সমাজ-সংকটের মুহূর্তে কবিদের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কী হওয়া উচিত, তাও এখানে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্য যে কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, বরং প্রতিরোধের শক্তিশালী হাতিয়ার এই উপলব্ধিও বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি শুধু সাহিত্য নয়, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরে। গণঅভ্যুত্থানের সময় বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের অবস্থান বোঝার জন্য বইটি গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণ পাঠকদের জন্য এটি একটি সমসাময়িক বাস্তবতা ও চিন্তার দিকনির্দেশনা দেয়। বইটি মূলত দেখায় যে, গণঅভ্যুত্থানের সময় কবিরা শুধু দর্শক নন তারা চিন্তার নেতৃত্ব দেন, মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করেন এবং আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।

কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়, তখন তা সমগ্র সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ছাত্রদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদে শামিল হয়। লেখক তার ভূমিকা বনাম কৈফিয়তে বলেন, ‘ এ যুদ্ধে সর্বশ্রেণি পেশার মানুষ ছিল একাত্ম। তারা হাসিনার জুলুম টিয়ারগ্যাস, লাঠিয়ালবাহিনী, বুলেট, বোমার সামনে দাঁড়িয়েছিল বুক চিতিয়ে। কতশত প্রাণ অকাতরে করেছে দান। তাদের সবার নাম সোনার হরফে লিখে রাখা দরকার। হয়তো একদিন লেখা হবে।

এই প্রেক্ষাপটে কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সত্য ও সুন্দরের সাধক হিসেবে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কবিতায়, স্ট্যাটাসে তারা প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি করেছেন। অনেকেই জেল-জুলুম ও প্রাণনাশের হুমকি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছেন, হাতে ব্যানার-পোস্টার নিয়ে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদী স্লোগান।

তবে এর বিপরীত চিত্রও ছিল, যা বেদনাদায়ক। কিছু কবি-লেখক ক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তারা ছিল স্বৈরাচারের দোসর।

ছাত্র জনতার এত রক্ত এত মৃত্যু দেখেও তারা ছাত্র জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে কবি নামে করেন কলঙ্ক লেপন। এ প্রসঙ্গে কবি ও সাংবাদিক পলিয়ার ওয়াহিদ ভূমিকার বদলে বলেছেন, শিল্পী মাত্রই সত্য সাধনার উজ্জ্বল রবি। এমনটাই আমরা জেনে এসেছি চিরকাল। এবং বিশ্বাস করতাম শিল্পীরা সমাজের সবচেয়ে মানবিক ও অনুভূতি প্রবল মানুষ। অথচ আমরা দেখতে পেলাম বিপরীত চিত্র। আমাদের অভিজ্ঞতা এমনই কদাকার ও কুৎসিত যে, অনেকের চেহারাও মনে করতেও ঘৃণা লাগে।

জুলাই জুড়ে তাজ ইসলাম নিজেও ছিলেন প্রতিবাদে সোচ্চারলেখায় ও রাজপথে। জেল জুলুম আর প্রাণনাশের হুমকি একপাশে রেখে প্রতিবাদ জারি রেখেছেন সাহসী সৈনিকের মত। গণঅভ্যুত্থানের “৩৬ জুলাই”-এ স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায়। এরপর লেখক পুনরায় গবেষণায় মনোনিবেশ করে এই আন্দোলনে কবিদের ভূমিকা নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। প্রতিটি নামের প্রতি সুবিচার করার চেষ্টা তার কাজকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে। এটি তার মৌলিক গবেষণা। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের আকর গ্রন্থ। কবি তাজ ইসলাম শুরু করেছেন, পথ দেখিয়েছেন। আশা করি এই পথ ধরে আরো অনেক গবেষণা হবে। সমৃদ্ধ হবে ইতিহাস ও সাহিত্য। তিনি লিখেছেন ৩৬ জুলাই কবিদের ভূমিকা। কেউ লিখবেন শিক্ষকদের ভূমিকা, কেউ লিখবেন শিল্পীদের ভূমিকা, কেউ লিখবেন ছাত্রদের ভূমিকা, কেউ লিখবেন রিক্সা চালকসহ শ্রমিকদের ভূমিকা।

তবে বইটির আরও সমৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। অতীতের আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটের তুলনা, আরও বেশি কবির অন্তর্ভুক্তি এবং একটি চিত্র-সংকলন সংযোজন করলে এটি আরও পূর্ণাঙ্গ হতে পারত। লেখক নিজেও এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে ভবিষ্যৎ সংস্করণে তা অন্তর্ভুক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। অনেক কবির কবিতার অংশবিশেষ স্থান পেয়েছে আলোচনায় আবার অনেকের স্থান পায়নি। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় হয়তো তা করা হয় নি। আশা করি সামনে হবে। লেখকের কৈফিয়ত স্পষ্ট ‘আমি আমার অক্ষমতা, ত্রুটির দায়ভার নিজ কাঁধে নিয়ে রাখলাম। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া ‘

এই গ্রন্থকে “লাল জুলাই”-এর একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রকাশক ও কবি সাজ্জাদ বিপ্লব। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বইটি দীর্ঘদিন ধরে পাঠকদের মনে প্রভাব বিস্তার করবে।

সবশেষে বলা যায়, এই বইটি শুধু সাহিত্য নয় রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এটি তরুণ প্রজন্মকে চিন্তা ও দিকনির্দেশনা দেয়, এবং প্রমাণ করে গণঅভ্যুত্থানের সময় কবিরা কেবল দর্শক নন; তারা আন্দোলনের চিন্তার নেতৃত্ব দেন এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির সমৃদ্ধ সংস্করণ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ ও কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি এখন সময়ের । বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি।