তৌসিফ রেজা আশরাফী

৫৭ জন ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হন, তখন তা কেবল সংখ্যার হিসাব থাকে না, বরং একটি জাতির নৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

এর মাসিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর ও কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ মাসে মোট ১৯০ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যাটি বাস্তবে আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ অনেক ঘটনাই সামাজিক লজ্জা, ভয় বা আইনি জটিলতার কারণে প্রকাশ পায় না।

ধর্ষণের পরিসংখ্যান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ৫৭টি ঘটনার মধ্যে ১৪টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণ, যা সমাজে নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরে। আরও ভয়াবহ হলো, এই ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মধ্যে পাঁচজনকে হত্যাও করা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয় ছয়টি ধর্ষণচেষ্টা এবং ১২টি যৌন সহিংসতার ঘটনা। এই পরিসংখ্যান আমাদের ভাবিয়ে তোলে নারী কি আজও এই সমাজে নিরাপদ?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সহিংসতা শুধু অপরাধীর মানসিক বিকৃতির ফল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা কারণ। গবেষণা বলছে, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, নারীর প্রতি অবমূল্যায়ন, এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই সহিংসতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

এর এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকায় নারীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। একইভাবে, এ গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় পারিবারিক সহিংসতার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

মার্চ মাসের প্রতিবেদনে হত্যার ঘটনাও কম উদ্বেগজনক নয়। আটজন কন্যাসহ মোট ৪৭ জন নারী নিহত হয়েছেন। এছাড়া ১৭টি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তোলে এসব কি সত্যিই দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনেও রয়েছে সহিংসতার ছায়া?

সহিংসতার ধরনগুলোও বহুমাত্রিক। একজন নারী অ্যাসিডে দগ্ধ হয়েছেন, তিনজন অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাও থেমে নেই, পাঁচজন নির্যাতিত এবং তিনজন নিহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দুজন, এবং একটি গৃহকর্মীর হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

এই চিত্রটি কেবল শহরের নয়, বরং গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র একই রকম। এর ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭২ শতাংশ বিবাহিত নারী কোনো না কোনো সময়ে স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত সহিংসতার সংস্কৃতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মহত্যা। মার্চ মাসে ১৪ জন নারী ও কন্যা আত্মহত্যা করেছেন, যার মধ্যে পাঁচজন প্ররোচিত। এই সংখ্যা শুধু মানসিক চাপ বা হতাশার ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি একটি ব্যর্থ সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার বা সহায়তার আশার আলো দেখতে পান না।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের অবস্থান খুব স্বস্তিদায়ক নয়। এ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সহিংসতার শিকার হন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

এছাড়া -এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী?

প্রথমত, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। দ্রুত বিচার, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের আধুনিক পদ্ধতি এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। পরিবার থেকেই নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লিঙ্গসমতা, মানবাধিকার ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এসব সহজলভ্য করতে হবে। অনেক নারী সহিংসতার শিকার হয়েও কোথায় যাবেন, কীভাবে সাহায্য পাবেন তা জানেন না।

চতুর্থত, গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু ঘটনা প্রকাশ নয়, বরং এর পেছনের কারণ, প্রতিকার ও সামাজিক বার্তা তুলে ধরা জরুরি।

সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে। এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে এই সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আর তখন হয়তো আমরা শুধু সংখ্যা গুনব, কিন্তু হারিয়ে ফেলব আমাদের মানবিকতা, আমাদের সামাজিক ভিত্তি।

লেখক : শিক্ষার্থী, দিনাজপুর আইন কলেজ।