বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ নির্বাচনই কোনো না কোনোভাবে বিতর্কিত, আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই। সে সময় কুমিল্লা-৯ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার মোশতাক আহমেদকে বিজয়ী করতে ব্যালট পেপার হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসার ঘটনাটি আজও ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। অথচ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা আওয়ামী লীগের জন্য এমন বিতর্কিত পন্থার কোনো আবশ্যকতা ছিল না। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে তারা জয়লাভ করেছিল। কোনো প্রকার অনিয়ম ছাড়াই তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা ছিল সুনিশ্চিত। কিন্তু তবুও সেই নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। একইভাবে ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি চরম কলঙ্কিত অধ্যায়। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এই আসনে তৎকালীন বিএনপি সরকার ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পেশীশক্তি ও নজিরবিহীন কারচুপির আশ্রয় নেয়। অথচ বিএনপির জন্য এই নির্বাচনকে বিতর্কিত করার কোনো রাজনৈতিক প্রয়োজনই ছিল না। স্মরণ করা প্রয়োজন, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করলেও এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ১৫১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে সে সময় দেশের স্বার্থে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ‘ত্রাণকর্তার’ ভূমিকা পালন করেছিল। তারা সে নির্বাচনে ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল এবং সরকার গঠনের জন্য বিএনপিকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছিল। মূলত জামায়াতের সেই সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। কিন্তু মাগুরা উপনির্বাচনে মাত্র একটি আসনের জন্য তারা পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

মাগুরার এই বিতর্কিত উপনির্বাচনের পর বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল। কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি একযোগে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। এর আগে তারা টানা ৯০ দিন সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তাঁদের সদস্যপদ বহাল থাকবে কি না এবং ওই সময়ের বেতন-ভাতা তাঁরা ভোগ করতে পারবেন কি না, তা চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী আনোয়ার হোসেন খান উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। মামলায় স্পিকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছিল যে, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বর্জন (Political Boycott)যা সাধারণ অনুপস্থিতির সমতুল্য নয়। তবে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ অভিমত দেন যে, সংসদ বর্জন বা এই ধরণের অনুপস্থিতিও সংবিধানের ৬৭ (১) (খ) অনুচ্ছেদের আওতাভুক্ত। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোট স্পেশাল রেফারেন্স নং-১, ১৯৯৫-এর মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট করেন। আদালত ঘোষণা করেন যে, সংসদ থেকে অনুপস্থিতির কারণ যাই হোক না কেন, তা গণনার ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা থাকবে না। একইসঙ্গে, অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি থাকাকালীন সময়ে সদস্যদের গৃহীত বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অবৈধ বলে ঘোষিত হয় (সূত্র: ৪৭ ডিএলআর, হাইকোর্ট, ৬৩৭)। মূলত মাগুরার সেই বিতর্কিত নির্বাচনই পরবর্তী সময়ে কেয়ারটেকা সরকার ব্যবস্থার দাবিকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং দেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকট তৈরি করেছিল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা না নিয়ে পরবর্তীতে আওয়ামী শাসনামলেও নির্বাচনের নামে কার্যত প্রহসন চালোনো হয়েছিল। মানুষ ভোট দেয়ার অধিকার প্রায় ভুলতেই বসেছিল। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার, স্কুল পরিচালনা পর্ষদ কিংবা আইনজীবীদের বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচন পর্যন্ত ভোটাধিকার উধাও ছিল। ফলে জনমনে পুঞ্জীভূত তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদের পতন হওয়ার মূল কারণ ছিল ভোটাধিকার হরণ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করার ইতিহাস। অথচ সে ইতিহাস থেকে বিএনপি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি।

২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল ইন্তিকাল করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র আট দিন আগে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে নির্বাচন কমিশন ওই আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী উক্ত আসনে মরহুম নুরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই মাসুদুর রহমানকে নতুন প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেন। ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে স্থগিত হওয়া আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নির্বাচনটি বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনকে ১৯৯৪ সালে মাগুরার সেই বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত উপনির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করছেন। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ থেকে এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচন যেমন একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে আছে, তেমনি শেরপুর ৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের ভোট জালিয়াতির ঘটনাটিও এক নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই প্রেক্ষপটে বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ছিল, তারা বিগত শাসনের ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি না ঘটিয়ে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার অল্প সময়ের মধ্যেই ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের উপনির্বাচন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাহাড়ঘেরা এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি উৎসবমুখর ভোট। কিন্তু বাস্তবে জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে দেখা গেছে একতরফা জয়ের এক নির্লজ্জ মহড়া। সুকৌশলে ভোট কারচুপি, ব্যালটে সিল মারার মহোৎসব, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার এবং বিরোধী প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের জোরপূর্বক কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করার এক নগ্ন চিত্র। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাসুদুর রহমান নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যালট বাক্স যখন তার পবিত্রতা হারায় তখন জনআস্থা স্বাভাবিকভাবেই ম্লান হয়ে যায়। অথচ এই আসনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারলে দলীয় সরকারের অধীনেও যে নিরপেক্ষ ভোট সম্ভব-তার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেশে স্থাপিত হতে পারত। কেবল একজন সংসদ সদস্য বৃদ্ধির নেশায় সরকার যে বিতর্কিত জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতি সংকটের বড় অনুঘটক হয়ে ওঠার প্রবল ঝুঁকি তৈরি করেছে। স্মরণ করা প্রয়োজন, ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনই পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের কেয়ারটেকার সরকার আন্দোলনের চূড়ান্ত রসদ জুগিয়েছিল। তাই আজ প্রশ্ন জাগে ২০২৬ সালের শেরপুর-৩ আসনের এই বির্তকিত নির্বাচনও কি নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবিতে নতুন কোনো আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করছে? ইতিহাস যেন নীরবে সেই সতর্ক সংকেতই উচ্চারণ করছে। মাগুরার সেই রাজনৈতিক অপকর্মটি সেদিন বিএনপি না করলে হয়তো আজ পুরো জাতিকে এমন চড়া খেসারত দিতে হতো না। কারণ, ভোট চুরির কলঙ্ক একটি জনপ্রিয় দলের নৈতিক ভিত্তিকেও ধসিয়ে দেয়। জালিয়াতির মাধ্যমে সাময়িকভাবে বিজয়ী হওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অনিবার্যভাবে জনরোষের জন্ম দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিলিপাইনের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, সাধারণ মানুষ যখন তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তখন সেই সংক্ষুব্ধ জনতাই শেষ পর্যন্ত যেকোনো অন্যায্য সরকারের পতনের প্রধান কারিগর হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, মাগুরা মডেলে অর্জিত যেকোনো জয় আসলে একটি রাজনৈতিক ‘টাইম বোমার মতো’ যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সুতরাং আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাব? শেরপুরের এই উপনির্বাচন সেই প্রশ্নটিকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।