জুলাই বিপ্লব জাতীয় জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অর্জন। এ বিপ্লবের মাধ্যমেই দেশ ও জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা আওয়ামী জাহেলিয়াতের অপশাসন-দুঃশাসন থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতিকে এক নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে। আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। স্বপ্ন ছিলো জুলাই চেতনার আলোকে বাংলাদেশকে নতুন করে ঢেলে সাজানো। আমরা এমন এক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলাম যেখানে কোন ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপশাসন-দুঃশাসন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজী ও অনিয়ম থাকবে না বরং রাষ্ট্রই নাগরিকের সকল অধিকারের নিশ্চয়তা দেবে। সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই প্রণীত হয়েছিলো জুলাই ঘোষণা এবং পরবর্তীতে জুলাই সনদ। সে সনদকে সাংবিধানিক ভিত্তি দিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। দেশের সিংহভাগ মানুষ জুলাই সনদের অনুকূলে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রাষ্ট্রের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছিলেন। এ সনদের দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দল এমনকি বর্তমান ক্ষমতাসীনরাও স্বাক্ষর করেছিলেন।
আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, ক্ষমতাসীনদের উড়নচণ্ডী মনোভাব এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার হীন মানসিকতার কারণেই জুলাই চেতনা এবং জুলাই সনদ এখন কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। ১২ এপ্রিলের মধ্যে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপিত হওয়ার বাধ্যবাধ্যকতা থাকলেও সরকারি দল তা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি জারিকৃত জুলাই অধ্যাদেশ এখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মূলত, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই এখন ক্ষমতাসীনদের কূটযুক্তির যাতাকলে পিষ্ট। তারা জুলাই সনদকে সাংবিধানিক ভিত্তি এড়ানোর জন্য নানা ধরনের বাজে অজুহাত দাঁড় করাতে শুরু করেছেন। দেশের খ্যাতিমান সংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা তারা মানতেই চাচ্ছেন না বরং ক্ষমতাসীন কোন কোন নেতাই এখন স্বঘোষিত বিশ্বের সেরা সংবিধান বিশেষজ্ঞে পরিণত হয়েছেন। যেমনটি লক্ষ্য করা গিয়েছিলো বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে। এমতাবস্থায় দেশে নতুন করে স্বৈরাচারের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ফলে দেশ ও জাতির ভাগ্যাকাশে নতুন করে কালো মেঘের ঘনঘটা দৃশ্যমান।
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে জুলাই সনদ নিয়ে আমরা নাতিদীর্ঘ আলোচনা করবো। বস্তুত, জুলাই সনদ বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সনদ, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রস্তাবসমূহ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং বাংলাদেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে। এ সনদে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটিকে সংবিধান সংস্কার হিসেবেও অভিহিত করা হয়। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং সে সুপারিশসমূহ বিবেচনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাত সদস্যের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়; কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে।
কমিশন তিন দফায় মোট ৭২ দিন রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে আলোচনা চালায়। কমিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। প্রথম পর্যায়ের আলোচনায় উত্থাপিত ১৬৬টি বিষয়ে ৬৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়; পরবর্তী পর্যায়ে আরও আলোচনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়-এই ধাপভিত্তিক আলোচনার সময়সূচি ও সারাংশ জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সনদে মোট ২৮টি প্রতিশ্রুতি আছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর জুলাই সনদের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অশ্চিয়তা সৃষ্টি করেছে খোদ ক্ষমতাসীরাই। উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ সরকারি দল বিএনপি সংসদে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দলটি বলেছে, গণভোট হয়ে যাওয়ায় অধ্যাদেশটি আর সংসদে তোলার প্রয়োজন নেই। যদিও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের তোলা একটি প্রস্তাবের ওপর সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যরা বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সংস্কার দরকার তা সংবিধান সংশোধন করে হবে না বরং তাদের মতে এজন্য দরকার হবে সংবিধান সংস্কার। আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যরা বলেছেন, ‘জাতীয় জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ রাষ্ট্রপতি জারি করলেও সে এখতিয়ারই তার ছিল না। রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ বৈধ আইন নয় বলে দাবি করে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি দাবি করে বলেন, ‘এ আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল। এটি অবৈধ আদেশ। তবে আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ধারণ করি’। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গণভোটের অধ্যাদেশকে ‘জাতীয় প্রতারণার দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর আগে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সময় বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও জামায়াত জোটের সদস্যরা সে শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির অনাগ্রহে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আর হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে কাজ করার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার রাখেনি বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তাদের মতে এটি ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করবে। যদিও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে জুলাই সনদ হয়েছে সেটি তারা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু তার কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না দেশের আত্মসচেতন মানুষ। কারণ, তিনি এবং তার দল একেক সময় একক কথা বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্র্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একই বছরের ১৩ই নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। যার ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে 'হ্যাঁ' ভোট জয়ী হয়েছে।
সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপি কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট চাইছে না-জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীরা এমন প্রচারণাও চালানোর প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি জনসভায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু দলটি আগে থেকেই বলে আসছিল যে ঐকমত্য কমিশনের সভায় যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়নি বা যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট এসেছে সেগুলো দলগুলো তাদের মতো করে নির্বাচনী ইশতেহারে দেবে এবং ভোটারদের রায় পেলে তারা সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করবে।
‘বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত,’ জাতীয় সংসদে এমনটিই দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি এও বলেছেন যে, ‘সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে এবং এ কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দিতে পারে’। তবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান বিষয়ে আলোচনার জন্য সংসদের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। লিখিত বক্তব্যে বিরোধী দলীয় নেতা সংসদে বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ায় জনগণ এ বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আইনগতভাবে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ-উভয় হিসেবেই শপথ নিতে বাধ্য। সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রসঙ্গে সেদিন বলেছেন যে, এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হলেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধন করে না, ‘সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায়ই করতে হবে’। কিন্তু তার এমন বক্তব্য কোন ভাবেই হালে পানি পাচ্ছে না বরং বিরোধী দলীয় নেতার আহবানই সরকারি দল ছাড়া সকল মহলেই প্রশংসিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদে উত্থাপন করা হয়। নিয়মানুযায়ী, উত্থাপনের পরবর্তী ৩০ দিন, অর্থাৎ আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে এসব অধ্যাদেশের যেগুলো সংসদে অনুমোদিত হবে না সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে যাবে। সংসদে উত্থাপনের পর এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ওই কমিটির সভাতেই সরকারি দল জানিয়ে দিয়েছে যে, গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হচ্ছে না। এছাড়া মানবাধিকার কমিশন, বিচারপতি নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশসহ কয়েকটি অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনার কথা বলেছে বিএনপি। যদিও বিএনপির এমন অবস্থানের বিরুদ্ধে আপত্তি করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে জামায়াত। জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সংসদে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপি যাই করুক না কেন, তারা মনে করেন ‘গণভোট বৈধ এবং আইনগতভাবে তার বৈধতা কখনোই বাতিল করা যাবে না’। বিএনপির কয়েকজন নেতা ধারণা দিয়েছেন যে, গণভোট এবং সে ভোটের রায় বৈধ কিংবা অবৈধ-সে আলোচনায় তারা যেতে আগ্রহী নয়। বরং তাদের লক্ষ্য হলো, যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়েছিল এবং বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে যা বলেছিল তার ভিত্তিতে সামনে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা।
গণভোট অধ্যাদেশটি যখন জারি হয় তখন সেখানে বলা হয়েছিল, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত এ অধ্যাদেশ। সে কারণে অনেকের মধ্যে এ প্রশ্ন আসছে যে, গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদিত না হলে এর অধীনে হওয়া গণভোট এবং সে ভোটের ফল বাতিল হয়ে যাবে কি না। অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন যে, ‘গণভোট আয়োজনে একটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। গণভোট হয়েছে। এ অধ্যাদেশের ব্যবহার হয়েছে। এর কোনো বিরোধিতা নেই। এ অধ্যাদেশকে সংসদে ধারণ করে ভবিষ্যতে ব্যবহার করার আর কিছু নেই’। তার এমন বক্তব্যকে দায়িত্বহীনতা ও গণভোট অস্বীকারের নামান্তর বলেই মনে করা হচ্ছে। যা সময়ের ব্যবধানে সরকারের জন্যই আত্মঘাতি হবে।
উল্লেখ্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে নির্বাচিত এমপিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য করার কথা বলা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, ভোটের ফল সরকারি দল বাস্তবায়ন না করলে সেটি এমনিই অকার্যকর হয়ে যায় এবং সে কারণে অধ্যাদেশ অনুমোদিত না হলে ভোটের ফল কী হলো তার কোনো গুরুত্ব থাকে না। আবার অনেকে মনে করেন, সরকারের একটি আইন বা অধ্যাদেশের আওতায় এর মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাওয়া কোনো রায় বা জনমতের বৈধতা অকার্যকর হয়ে যায় না। ফলে সরকার বাস্তবায়ন না করলেও এর একটি আইনি ভিত্তি থেকেই যাবে।
আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপি জাতীয় সনদের স্বাক্ষর করেছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে। বিএনপি এখন মনে করছে দু’টি নির্বাচনের একটির মূল্য নেই। সেজন্য তারা সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। কিন্তু এটা সংশোধনের অযোগ্য। সংস্কার মানে সংশোধনী না। সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় সংকটের জন্ম দেবে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আর সংবিধান সংস্কারে ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন করে তাতে ভোটারদের সামনে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-তে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন বদিউল আলম মজুমদার। এ বিষয়ে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘গণভোটে মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে। গণভোট সংবিধানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখন যা হচ্ছে সেটি হলো জনরায় উপেক্ষা করা। এর ফলে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে এবং এর মাধ্যমে আমরা মানুষের আত্মত্যাগ অস্বীকার করছি, যা গ্রহণযোগ্য নয়’।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীনরা স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে প্রস্তুত নয় বরং তারা অতীতের অশুভ বৃত্তেই থেকে যেতে চাচ্ছেন। মূলত, তারা আবারো স্বৈরচারি হয়ে ওঠার এক অনৈতিক কসরত শুরু করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও তারা জনগণের দেয়া রায়কে অস্বীকারের মাধ্যমে তা অস্বীকার করছেন। মূলত, তারা সংবিধানের একেক সময় একেক ব্যাংখ্যা দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত এবং বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে শুরু করেছেন। শুরুর দিকে তারা গণভোট অধ্যাদেশ ও গণভোটকে অবৈধ বললেও এখন তারা গণভোটের বৈধতা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু তারা তা বাস্তবায়ন করতে রাজী নন। তারা তাদের কথামালার ফুলঝুড়িতে অতীতের অশুভ বৃত্তে থেকে যেতে চাচ্ছেন। যা তাদের জন্যই আত্মঘাতি হওয়ার সম্ভবনা বেশি। যেমনটি হয়েছে পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে।
যাহোক শেষ পর্যন্ত সরকার পক্ষ গণভোটের বৈধতা স্বীকার করে নিয়েছে। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো গণরায় অনুযায়ি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা ডেকে জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। কিন্তু সরকারি দলের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, মুখে যে কথাই বলুক, গণরায় মেনে নিয়ে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে না বরং তা উপেক্ষা করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। যা তাদের জন্যই হবে আত্মঘাতি। বিএনপির পক্ষে আওয়ামী লীগ হওয়ার সুযোগ নেই। আর ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ি নয়। তাই ইতিহাস থেকে ক্ষমতাসীনদের অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে।
www.syedmasud.com