আসিফ আরসালান
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বিএনপি আওয়ামী লীগের বয়ান ধার করে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। নির্বাচনের আগে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে শামসুল আলম দুদু পর্যন্ত জামায়াতকে সে বস্তাপচা গালিগুলো দিয়েছেন। জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী, জামায়াত পাকিস্তানের দালাল, জামায়াত বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না ইত্যাদি। তখন শিক্ষিত সচেতন মানুষ ভেবেছিলেন যে, ইলেকশনে জেতার জন্য রাজনৈতিক দলকে অনেক জনতুষ্টিমূলক এবং মুখরোচক বক্তৃতা করতে হয়। কিন্তু ইলেকশনের পরেও যখন দেখা গেলো সেগুলোর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে তখন এ সম্পর্কে সঠিক কথা না বলে পারা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেদিন বগুড়ার জনসভায় জামায়াত সম্পর্কে এতদূরও বলেছেন যে, জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী এবং তারা বাংলাদেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না।
বগুড়ার জনসভায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী জনসভায় বলেন, ‘এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্তের চেষ্টা করেছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৯৬ সালেও আমরা দেখেছি, স্বৈরাচারের সঙ্গে গিয়ে দেশের মানুষকে কীভাবে বিভ্রান্ত করেছিল। ২০০৮ সালেও আমরা দেখেছি, ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছিলেন, তারা গতানুগতিক অর্থে বিরোধী দল নয়। শুধুমাত্র বিরোধিতার কারণেই তারা সরকারের বিরোধিতা করবেন না। সরকার যেসব ভালো কাজ করবে সেসব কাজে তারা সমর্থন দেবেন। আর যেগুলো ভালো কাজ হবে না অবশ্যই সেগুলোর প্রতিবাদ করবেন। জামায়াতে ইসলামীর কথা এবং কাজে সামঞ্জস্য আছে। তার পরিচয় সেদিনও দেওয়া হয়েছে। দেশের মানুষ জ¦ালানি তেলের সঙ্কটে যখন জেরবার, তখন মানুষের দুঃখদুর্দশাকে পুঁজি করে সেটি সরকার বিরোধী রাজনীতি হিসাবে জামায়াত ব্যবহার করেনি। বরং আমীরে জামায়াত প্রস্তাব দিয়েছেন যে, এ সঙ্কট কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সে ব্যাপারে সরকারের সাথে জামায়াত আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী আমীরে জামায়াতের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। অথচ এর বিপরীতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার জনসভায় জামায়াতের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছেন সেগুলো মেঠো বক্তৃতার পর্যায়ে গেছে। ১৯৮৬ সালে জামায়াত কিভাবে বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে? বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী খোলাখুলি বলেননি। তার বলা উচিত ছিলো। নাহলে তার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে কিভাবে? ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় ‘স্বৈরাচারের’ সাথে গিয়ে জামায়াত কিভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে সেটিও তিনি স্পষ্ট করেননি। অনুরূপভাবে ২০০৮ সালেও ওয়ান ইলেভেনের সাথে যোগ দিয়ে জামায়াত কিভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে সেটিও তিনি পরিষ্কার করেননি।
১৯৯৬ সালে যে গণআন্দোলন হয়েছিলো সেটি ছিলো কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে। অনেকে কেয়ার টেকার সরকার প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব আওয়ামী লীগকে দেন। কিন্তু একথা বলতে গেলে মিডিয়াসহ সব রাজনৈতিক দলই চেপে গেছেন যে, কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে তৎকালীন জাতীয় সংসদে সর্বপ্রথম বিল উত্থাপন করে জামায়াতে ইসলামী। কেয়ারটেকার সরকার হলো জামায়াতের আমীর মরহুম অধ্যাপক গোলাম আজমের ব্রেন চাইল্ড। জাতীয় সংসদে জামায়াত এ বিল উত্থাপন করার পর তৎকালীন সরকার বিষয়টির ওপর আর আলোচনার সুযোগ দেয়নি। বিলটি তখন থেকে কোল্ডস্টোরেজে পড়ে থাকে।
মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে ছিলো। সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তারা কেয়ারটেকার ইস্যুটাকে সামনে নিয়ে আসে। এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী যে অরাজকতার সৃষ্টি করে তার সাথে জামায়াতের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিলো না। জামায়াত যেহেতু কেয়ারটেকার ফর্মুলার জনক তাই তারা কেয়ার টেকারের দাবিকে সমর্থন করে। কিন্তু সেই দাবি আদায়ের জন্য আওয়ামী লীগ যে সহিংস পথ বেছে নেয় তার সাথে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। বিএনপির তো একটি প্রেস উইং আছে। তারা ঐ সময়ের পত্রপত্রিকা নাড়াচাড়া করুক। দেখবেন যে, জামায়াত কোনো রকম উশৃঙ্খলা বা ভাঙচুরে অংশ নেয়নি। কিন্তু একথা তো ঠিক যে, বিএনপি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কেয়ারটেকারের দাবি সমর্থন করেনি। রুঢ় সত্যকে চেপে রাখতে নেই। সে রুঢ় সত্য হলো, কেয়ারটেকার আন্দোলনের কারণেই তৎকালীন বিএনপি সরকার ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। তারা সংসদ ভেঙে দেয় এবং একটি নির্বাচন করে যেখানে অন্য কোনো দল অংশ নেয়নি। বিএনপি যুক্তি দেয় যে, কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার। এজন্যই তারা নির্বাচন করছে।
১৯৯৬ সালে বস্তুত দু’বার নির্বাচন হয়। প্রথম বার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনে দু’তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার কেয়ারটেকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তভর্’ক্ত করতে বাধ্য হয়। এটিই ত্রয়োদশ সংশোধনী নামে পরিচিত। ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর আওয়ামী লীগ আবার আন্দোলনে নামে। তখন বিএনপি পুনরায় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। সেই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মরহুম হাবিবুর রহমানের কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনে মেজরিটি পেয়ে শেখ হাসিনা তার পিতার মৃত্যুর ১৯ বছর পর প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেন। এটি হলো ইতিহাসের সঠিক পাঠ। এখানে জামায়াতকে দোষারোপ করা ইতিহাস বিচ্যুতির সমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০০৮ সালেও জামায়াত নাকি ওয়ান ইলেভেনে যোগ দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিলো। এখানেও ঘটেছে এক বিরাট ইতিহাস বিচ্যুতি। ওয়ান ইলেভেন সম্পর্কে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং ঐ সময়কার ডিজিএফআই প্রধান লে. জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা এখন কারাগারে এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সাধারণত বন্দীদেরকে যখন রিমান্ডে নেওয়া হয় তখন রিমান্ডে তারা যেসব স্বীকারোক্তি দেন সেগুলো সাধারণত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। জেনারেল মাসুদ এবং জেনারেল মামুন অনেক কথাই বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের কথাগুলো যাচাই করুন। দেখুন তো ওয়ান ইলেভেনের সাথে জামায়াতের দূরতম কোনো সম্পর্কও পাওয়া যায় কিনা। আমার কাছে ওয়ান ইলেভেনের ঐ সময়কার ঘটনাবলীসমূহ রোজ নামচার মতো সংরক্ষণ করা আছে। আমার কাছে আছে এ সম্পর্কে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উদ্দিনের বই। আছে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজুদ্দিনের প্রেস সচিব মোখলেসুর রহমানের বক্তব্য। এসব দলিল এবং আরো অন্যান্য ডকুমেন্ট থেকে দেখা যায় যে, কোনো পর্যায়েই জামায়াত ওয়ান ইলেভেনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো না।
এবার জামায়াত সম্পর্কে সে বহুল চর্চিত অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন যে, জামায়াত নাকি বাংলাদেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না। এব্যাপারে সঠিক চিত্র পাওয়ার জন্য একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সরকার গঠন করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের ছিলো না। এ সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিগারটি হলো, ১৫১। তখন আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো ৮৮ টি আসন, এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিলো ১৮টি আসন।
আওয়ামী লীগ চেষ্টা করেছিলো জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতকে নিয়ে সরকার গঠন করতে। কিন্তু তাতেও সরকার গঠনের মতো মেজরিটি হয় না। কিন্তু জামায়াতের প্রধান টার্গেট ছিলো আওয়ামী লীগকে ঠেকানো। তাই তারা নিঃশর্তভাবে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সমর্থন দেয়। ফলে সংসদে বিএনপি এবং জামায়াত মিলে হয় মোট ১৫৮টি আসন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও ৭টি আসন বেশি। জামায়াতের এ উদারতা দেখে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতকে দু’টি মন্ত্রীর পদ অফার করেন। জামায়াত অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সে অফার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। জামায়াত বলে যে, তাদের লক্ষ্য মন্ত্রীত্ব নয়। তাদের লক্ষ্য আওয়ামী লীগকে ঠেকানো। জামায়াত যদি দেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাস না করে তাহলে সেদিন তাদেরকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মাতা বেগম জিয়া তাঁর কোয়ালিশন পার্টনার করতে চেয়েছিলেন কোন যুক্তিতে?
শুধু ১৯৯১ সাল নয়, ২০০১ সালে কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পায়। এর ফলে সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও দু’তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিলো না। তখন জামায়াতের ছিলো ১৭টি আসন। জামায়াত বেগম জিয়াকে সমর্থন দেয়। এবারও ঐ সমর্থনের কারণে বেগম জিয়া জামায়াতকে দুইটি মন্ত্রীত্বের অফার দেন। জামায়াতের তরফ থেকে দু’জন মন্ত্রী সভায় যোগদান করেন। এরা হলেন, তৎকালীন আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউরি রহমান নিজামী এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ। ফলে বিএনপি জামায়াত কোয়ালিশনের আসন সংখ্যা হয় ২১০ এবং এর ফলে সংসদে তাদের দুই তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত হয়।
তার পর ৫ বছর কেটে যায়। ৫ বছর মাওলানা নিজামী এবং জনাব মুজাহিদ মন্ত্রীত্ব করেন। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা ইঙ্গ-মার্কিন মঈন উদ্দিন চক্রান্তে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসে ৫ বছর তিনি মাওলানা নিজামী এবং জনাব মুজাহিদের মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি ফাইল তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করেন। উদ্দেশ্য ছিলো, কোথাও তাদের দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু ৫ বছর ধরে অনুসন্ধান করেও জামায়াতের এই দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুই পয়সারও দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু না পেয়ে ভারতের ইঙ্গিতে অবশেষে যুদ্ধাপরাধের বানোয়াট অভিযোগ তোলা হয়। সকলেই জানেন, শাস্তি পূর্ব নির্ধারিত ছিলো। দু’জন নিরপরাধ আদম সন্তানকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে বিচারের নামে বিচারিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। জামায়াত সম্পর্কে বর্তমান বিএনপি আওয়ামী লীগের বয়ানে যেসব অভিযোগ তুলছে সেগুলো কোনো দিন বিএনপির প্রতিষ্ঠতা শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়া তোলেননি।
জুলাই বিপ্লবের পর জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপি আওয়ামী লীগের সুরে যেসব অভিযোগ তুলছে সেগুলো নেহায়েতই রাজনৈতিক। সমীকরণটি এ রকমÑÑ আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো বিএনপি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি । অনুরূপভাবে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির বিকল্প জামায়াত। তাই রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপির এ ভিত্তিহীন অপপ্রচার।
Email:[email protected]