এখন পুরোদস্তুর সাংবাদিক হলেও জীবনের শুরুতেই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলাম। একেবারে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসাবে। নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে। প্রথমে প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা হলেও মৌখিক পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছিলাম মাত্র ৩ জন।

ভাইভা বোর্ডে তেমন কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন না হলেও জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষায় বেশ বিব্রতই হয়েছিলাম। বিশেষ করে থানা নির্বাহী অফিসার জনাব আব্দুল খালেক ও থানা শিক্ষা অফিসার জনাব একরামুল হক আমাকে নিয়ে বেশ হাস্যরসে মেতে উঠেছিলেন। তাদের হাসাহাসির কারণ ছিলো আমার বয়স নিয়ে। হয়তো তারা একজন নবীনকে মৌখিক পরীক্ষায় অপদস্ত করতে চাননি, বিধায় তারা আমাকে সহজ ও চটুল প্রশ্নই করেছিলেন। আমি সাবলীলভাবে সেসব প্রশ্নের জবাব দিতে চেষ্টা করেছি। তবে কিছুটা বিব্রত হয়েছিলাম তাদের হাসাহাসি নিয়ে।

নির্বাহী অফিসার মহোদয় এক পর্যায়ে আমার কাছে জানতে চেয়ে বললেন, ‘আপনার জন্ম তারিখ কত?’ আমার স্বপ্রতিভ জবাব ছিলো, ‘১ মার্চ, ১৯৭১’। এবার কিন্তু তার মধ্যে ভাবান্তর লক্ষ্য করলাম। তিনি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করে বললেন, ‘পাকিস্তানের মাত্র কয়েকটা দিন পেয়েছ। তোমার তো শিক্ষকতা করার বয়স হয়নি। প্রতিষ্ঠান চালাবে কী করে’? আমি মাথা নিচু করে নিরুত্তরই থাকলাম। এরপর নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরা প্রত্যেকেই কিছু কিছু প্রশ্ন করলেন। নির্বাহী অফিসার ও শিক্ষা অফিসার করলেন বেশি। প্রশ্নগুলো আমার কাছে সাদামাটাই মনে হলো। সাধ্যমত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি সাহসিকতার সাথে।

প্রার্থীদের মধ্যে আমিই সর্বকনিষ্ঠ হলেও অন্যদের বয়সও খুব বেশি ছিলো না। নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় এবার কমিটির সহ-সভাপতি ও সচিব মহোদয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘এসব বাচ্চা মানুষদের কোথা থেকে নিয়ে আসলেন, কোন অভিজ্ঞ লোককে পেলেন না ? এরা কি প্রতিষ্ঠান চালানোর মত যোগ্য ?’

সহ-সভাপতি মহোদয় কিছু বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নির্বাহী অফিসার মহোদয় আশ্বস্ত হলেন না। তিনি কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করেই বললেন, ‘এসব ছেলেরা আমার অফিসের ‘ওএস’ (অফিস সুপার)-এর কাছে পাত্তাই পাবে না। প্রতিষ্ঠানও টিকবে না’। কথাগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রতি দরদমাখা কণ্ঠেই বলেছিলেন তিনি।

যাহোক ইন্টারভিউ শেষ হলো। আমি কোন স্বস্তি নিয়ে ফিরতে পারলাম না। কারণ, বয়সগত কারণে নির্বাহী অফিসার মহোদয় আমাকে কোন ভাবেই যোগ্য মনে করতে পারলেন না। এমনকি অন্যদেরও না। আমার মনে হলো, হয়তো সভাপতি মহোদয় কোন প্রার্থীকে যোগ্য মনে করলেন না। বিধায় এ নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ড বাতিল হওয়ার অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে হলো আমার কাছে। এছাড়াও আমার মনে হলো হয়তো প্রার্থীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠ কাউকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হবে। তাই আমার সম্ভবনা একেবারে নেই বললেই চলে।

যাহোক, প্রায় মাস খানেকের মধ্যেই সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটলো। স্রোতের সম্পূর্ণ প্রতিকূলে ডাকযোগে নিয়োগপত্র পেলাম। নিয়োগপত্রের নির্দেশনা মোতাবেক আমাকে অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট পদে যোগদান এবং এ নিয়োগ ম্যানেজিং কমিটির পরবর্তী অধিবেশনে অনুমোদের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।

আমার তো আর আহলাদের শেষ থাকলো না। মাত্র ২১ বছর বয়স। শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৫ জন। কাকতালীয়ভাবেই সকলের বস হয়ে গেলাম। স্টাফদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হলেও আমিই একেবারে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। বেতন নেই; তবুও তো আবু হোসেনের নবাবী। তাই নিয়োগপত্র পাওয়া মাত্র চাকরিতে যোগদানে কোন বিলম্বই করিনি।

বেশ আনন্দ ও উৎসাহের মধ্য দিয়েই অত্যন্ত উপভোগ্য মনে করে চাকরিতে যোগদান করেছিলাম আমি। কিন্তু তা হরিষে-বিষাদে পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি। শুরুতে চাকরিটা আমার কাছে আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য মনে হলেও বাস্তবতা ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। চাকরিতে যোগদানের কয়েক দিনের মধ্যেই মনে হয়েছিলো আমি যেন এক অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছি। শান্তি ও স্বস্তির জীবন ছেড়ে বেছে নিয়েছি এক অনিশ্চিত ও গন্তব্যহীন জীবন। যে জীবনে পদে পদে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হওয়ার শঙ্কা প্রতিনিয়তই তাড়া করে ফিরছিলো আমাকে। এক সময় মনে হয়েছিলে একটা স্বর্গীয় বেষ্টনী থেকে নরকের অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছি আমি।

চাকরিতে যোগদানের আগে শুনেছিলাম প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে। নেই শুধুই এমপিও। সাহসী ও প্রত্যয়ী মানুষ হিসাবে এলাকায় আমার পরিচিতি ছিলো। আমিও চ্যালেঞ্জটা ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি ছাড়া আর কিছুই নেই। একাডেমিক স্বীকৃতি লাভের জন্য ছিলো না প্রয়োজনীয় শর্ত পূরুণ। বোর্ড অনুমোদিত কোন কমিটিও ছিলো না। কয়েক বছর পরীক্ষা দিয়ে বোর্ড পরীক্ষায় পাশ করেছিলো মাত্র ১ জন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিলাম আমি। বিষয়টি স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে কানাকানিও শুরু হয়েছিলো। কারণ, আমার আগে কয়েকজন প্রতিষ্ঠান প্রধান চাকরিতে ইস্তাফা দিয়ে চলে গেছেন। তারা প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করাতে পারেন নি। আমি রাত-দিন প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেছি। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি, দাতা সহ সকলের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। শিক্ষক-কর্মচারিদের মেধা, প্রজ্ঞা, সময় ও যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বেতন ছাড়া শিক্ষক-কর্মচারিদের কাজ করতে সমস্যা হলেও প্রতিষ্ঠান ও নিজেদের ভবিষ্যতের স্বার্থে তারা আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করে গেছেন। যা আমার কাজকে সহজ ও সাবলীল করেছে। এজন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ।

আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক ছিলো সরকারি অফিসগুলোতে লাগামহীন ঘুষ চর্চা। নতুন প্রতিষ্ঠান। তাই আমাকে বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন অফিসে প্রায়ই যেতে হতো। পকেটে তেমন পয়সাকড়ি থাকতো না। অনেক সময় পয়সার অভাবে না খেয়েই মলিন মুখে বাড়ি ফিরতে হতো। কিন্তু সরকারি অফিসের অর্বাচীন ভিখারীরা ওৎপেতে থাকতেন। ইয়াজুজ-মাজুজের মত চাটাচাটি করত খুব-পিপাসা নিয়ে। বেসরকারি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক গেলেই তাদের কাছে কিছু নেওয়ার জন্য একেবারে নাজেহাল করে ছাড়েন। আমাকেও একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো প্রতিনিয়তই।

তবে আমি একেবারে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিতাম না। চেষ্টা করতাম এসব উপেক্ষা করতে। সব সময় যে পেরেছি এমন নয়, তবে আমার আত্মরক্ষার কসরতের কোন কমতি ছিলো না। এ জন্য বিব্রতকর অবস্থার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। কখনো কখনো কারো কাছে হয়েছি বিরাগভাজন। অফিসগুলোতে আমাকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অফিসগুলোর ক্ষুদ্র একটা অংশের কাছে আমি ছিলাম ভালো মানুষ। অপর বৃহত অংশের কাছে জেলার সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান। কাউকে সম্মান দিই না বা ম্যানেজ করে চলি না। গোঁয়ার, একরোখা, অসামাজিক, অহংকারী ও অশিষ্টাচারী মানুষ। কিন্তু এসব নিয়ে আমি কখনো বিব্রত হইনি বা মাথা ঘামাইনি। নিজ কক্ষে পদচারণায় ছিলাম আমি অবিচল।

আমি আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য অসাধ্য সাধন করেছি এমন দাবি করা হবে মূর্খতার নামান্তর। তবে আমি দাবি করতেই পারি যে, নিজের বা সহকর্মীদের জীবন-জীবিকার কারণেই হোক বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই হোক আমি আমার করুণময়ের দেওয়া সকল যোগ্যতা, প্রতিভা, প্রজ্ঞা ও কর্মতৎপরতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। পেশাগত দায়িত্বপালনে পুরোপুরি সৎ ও মূল্যবোধ চর্চার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি আমার উপার্জনে হারাম ও অবৈধ কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটেনি।

যাহোক আমাকে এক অসাধ্য সাধনের মাধ্যমেই নিজের জীবন চলার গতিপথ ঠিক করে নিতে হয়েছে। সরকারি অফিসের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারির অবৈধ লিপ্সা আমাকে মাঝে মাঝে বিব্রত করলেও আমি কিন্তু সব সময় শ্রোতের প্রতিকূলেই চলেছি। এজন্য মাঝে মাঝে কারো কারো সাথে বসচার ঘটনাও ঘটেছে। তাদের ইচ্ছামত অবৈধ কামাই করতে ব্যর্থ হয়ে আমাকে খারাপ লোক হিসাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমি বিপথগামী হইনি। অন্যরা কাজ সহজেই করতে পারলেও আমাকে করতে হয়েছে কষ্টকর পদ্ধতিতেই। কিন্তু কোথাও যে একেবারে ঠেকে গেছি, এমনটা কখনো হয়নি বরং শেষ হাসিটা আমিই হাসতে সক্ষম হয়েছি। আমার হাতেই প্রতিষ্ঠানের পরপর তিন বছরের আকর্ষণীয় ফলাফল, পরবর্তীতে একাডেমিক স্বীকৃতি, এমপিওভুক্তিকরণ হয়েছে। এজন্য করতে হয়েছে আমাকে কঠোর পরিশ্রম। কিন্তু কখনো আদর্শচ্যুত হইনি বরং শ্রোতের বিপরীতে চলেছি খুব কষ্ট করে।

১৯৯৫ সালের কথা। জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে এমপিওভুক্তি মঞ্জুর করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পেলাম। চিঠিতে স্বাক্ষর করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মীর শওকত আলী। খবরটি শুধু আমার জন্য আনন্দের ছিলো না বরং আমি এভেবেই পুলকিত হয়েছিলাম যে, ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারির হাতে কিছু তুলে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, বিনা বেতনে কাজ করার কারণে কোন কোন সময় আমার সাথে তাদের ছোটখাট তিক্ততা হয়েছে। চাপ দিয়ে কাজ করিয়েছি। কিন্তু হাতে কিছু ধরিয়ে দিতে পারিনি। অন্তত সে অবস্থার অবসানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এবার শুরু হলো আমার নতুন যুদ্ধ। সাধারণত এমপিওভুক্তির আদেশ প্রাপ্তির পর শিক্ষা তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরো তথা ব্যানবেইসে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত, কাগজপত্র সহ শিক্ষক-কর্মচারিদের তালিকা প্রেরণ করতে হয়। এ কাজটা আমার জন্য মোটেই সহজসাধ্য ছিলো না। বিশেষ করে শিক্ষকদের নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে বড় ধরনের জটিলতার মুখোমুখী হতে হয়েছিলো। এতদসংক্রান্ত ফাইলপত্র তদানীন্তন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহজেই ছাড় করলেও বিপত্তি বেঁধেছিলো জেলা শিক্ষা অফিসে। তদানীন্তন জেলা শিক্ষা অফিসার ছিলেন জনাব শামসুল আলম। আমার কর্মজীবনে যতজন ভালো অফিসার পেয়েছিলাম জনাব শামসুল আলম ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি খুটিয়ে খুটিয়ে সব দেখে ফাইলটা নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। আর তার চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই আমার গলদগর্ম অবস্থা। আর এর সুযোগ গ্রহণ করছিলেন অফিসের সাধু কর্মচারিরা। যাহোক, প্রায় ৩ মাসের লড়াই-সংগ্রামের পর জেলা শিক্ষা অফিসার ফাইল ছাড় করেছিলেন।

এবার শুরু করলাম এমপিওভুক্তির শেষ লড়াইটা। কাগজপত্র রেডি করার পর যোগাযোগ করলাম একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে, যিনি মাত্র কয়েক মাস আগেই তার প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছেন। তিনি আমাকে জানালের ১ লাখ টাকা দিলে তিনি সবকিছু ঠিক করে দেবেন। আমি তার কাছে পরামর্শ চাইলাম। আর উনি আমার কাছে টাকা চেয়ে বসলেন।

আমি সাধারণত এ ধরনের লেনদেন বিরোধী। এজন্য আমাকে অনেক লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। চলতে হয়েছে শ্রোতের পুরোপরি বিপরীতে। এজন্য অনেক মূল্যও দিয়েছি। আমি তার কথায় রাজী না হয়ে সহকর্মীদের সাথে পরামর্শ করে নিলাম এক দুঃশাহসী ও অভিনব সিদ্ধান্ত। আমি আমার প্রস্তুতকৃত কাগজপত্রগুলো ডাকযোগে শিক্ষাতথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরো (বেনবেইস) পাঠিয়ে দিলাম। প্রায় মাসখানেক পর একজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে খোঁজ নেওয়ার জন্য গেলাম।

পত্রগ্রহণ শাখা বাবু গৌরঙ্গ দাসের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন। আমার মনে হলো বাবু দাস আমার কাছে কত টাকা চেয়ে বসেন। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমার এক সহকর্মীকে নিয়ে অফিসের দোতলায় বাবু গৌরঙ্গ দাসের কাছে হাজির হলাম। তিনি আমাদেরকে সম্মানেই তার সামনে বসালেন। বয়স ৩৫/৩৬ এর বেশি মনে হলো না। শ্যামবর্ণের এক তরতাজা যুবা। বেশ সদালাপী মানুষই ছিলেন বাবু সাহেব। কিছুটা খুনসুঁটিও চললো আমাদের সাথে। সীমান্ত ঘেষা জেলায় বাড়ি হওয়ায় আমরা তাকে ভারতে পার হয়ে যেতে সহযোগিতা করতে পারবো কি না তাও জানতে চাইলেন। বেশ জমে উঠেছিলো আমার মধ্যে আলাপচারিতা। কিন্তু আমার মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছিলো, না জানি তিনি আমার কাছে কতটা চেয়ে বসেন। ঘুষখোর লোকেরা এমন সদালাপীই হয়ে থাকেন।

এরপর আলাপচারিতার যবনিকা ঘটলো। তিনি আমাদের ফাইল খোঁজা শুরু করলেন। কিন্তু কোন ভাবেই খুঁজে পেলেন না। কিছুক্ষণ মাথাটা নিচু করে চুপ করে থাকলেন। এরপর নিজে নিজেই বলে উঠলেন, ফাইলটা মেজবাহ সাহেবের কাছে থাকতে পারে। তিনি আমাদেরকে সাথে নিয়ে মেজবাহ সাহেবের রুমে গেলেন। ফাইলও পাওয়া গেলো। দু’জন মিলে ফাইলটা কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখলেন। আমরা কিছু দেখতে পেলাম না। এরপর বললেন, আপনার প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়ে গেছে। মে মাসের বেতনের সাথে ৫ মাসের বকেয়া সহ পাবেন। আপনারা এখন আসতে পারেন। এখানে বেশি দেরি করবেন না বিপদ হতে পারে।

আমি মনে করেছিলাম, সব জায়গায় তো আর ঝগড়াঝাটি করে পার পাওয়া যাবে না। তাই এ কাজে কিছু দেওয়ার একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ঢাকা এসেছিলাম। কিন্তু আমার কাছে কেউ কিছু চাইলোও না, আমি কাউকে কিছু দেওয়ার সুযোগও পেলাম না।

আশা-নিরাশায় দোলাচলেই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম। পরের দিন শিক্ষকদের কাছে ঢাকা সফরের ফলাফল বর্ণনা করলাম আমরা। চিচার্স কমন রূমে তো হাসাহাসির রোল পড়ে গেলো। কোন প্রকার ঘুষ ছাড়াই প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে ফিৎনার জানামায় একথা কেউ বিশ্বাসই করতে চাইলেন না। তাদের দেওয়া টাকা আমাদের দিতে কার্পণ্য কেন এ প্রশ্নও তুললেন কেউ কেউ।

কয়েকদিন পর আরেক শিক্ষককে সাথে নিয়ে ঢাকার নীলক্ষেতের বেনবেইস অফিসে এসে দোতলায় ঘোরা ফেরা করছিলাম। বাবু গৌরঙ্গ দাসের কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। বিষয়টি বাবু সাহেবের নজরে পড়েছিলো। তিনি চেয়ার ছেড়ে ওঠে আসলেন। আমাদেরকে কঠিনভাবে ধমক দিয়ে বললেন, ‘বলেছি না এমপিও হয়ে গেছে। আপনাদের সমস্যা হলো কাউকে টাকা দিতে পারেন নি। এখনই এখান থেকে বের হোন.....’!

তার কথার প্রতিফলন ঘটেছিলো মে মাসের বেতনে। হয়তো তিনি এতোদিনে অবসরে গেছেন। কিন্তু হয়ে আছেন আমার জীবনের স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তি; বাবু গৌরঙ্গ দাস!

www.syedmasud.com